মিটফোর্ডের নকল ও ভেজাল ওষুধ যাচ্ছে সারাদেশে

ওষুধের পাইকারি বাজার মিটফোর্ড থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার কার্টন নকল ও ভেজাল ওষুধ যাচ্ছে সারাদেশে। আবার সরকারি হাসপাতালে সরবরাহকৃত ওষুধ অবৈধভাবে এনে বিক্রি করা হয় মিটফোর্ডে। এগুলো বন্ধে ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। মাঝে মাঝে দু’একটি অভিযান পরিচালনা করেই তাদের দায়িত্ব শেষ। গর্ভবতী মায়েদের প্রয়োজনীয় ইনজেকশন নকল করাসহ সবধরনের দরকারি ওষুধই নকল করা হয় এখানে। এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা বলেছেন, নকল ইনজেকশন গর্ভবতী মা ও শিশুর জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। ভেজাল ও নকল ওষুধ সেবনে প্রতিদিন নীরবে কত রোগী মারা যাচ্ছে তার খবর কেউ রাখে না। জানা গেছে, এই ওষুধের মার্কেট থেকে নিয়মিত মাসোহারা শীর্ষ কর্মকর্তা এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর এক শ্রেণির কর্মকর্তার পকেটে যায়। এ কারণে প্রকাশ্যে নকল, ভেজাল এবং সরকারি (বিক্রি নিষিদ্ধ) ওষুধ পাইকারি বাজারে বিক্রি হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদফতর, ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর ও মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা এর সত্যতা স্বীকার করে বলেছেন, যারা নকল ও ভেজাল প্রতিরোধ করবেন তারাই কোটি কোটি টাকার বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত। গত সোমবার মোবাইল কোর্ট মিটফোর্ড পাইকারি মার্কেট থেকে বিপুল পরিমাণ নকল ও ভেজাল এবং সরকারি ওষুধ জব্দ করে। এ সময় ৩ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে জেল দিয়ে কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠিয়ে দেয় মোবাইল কোর্ট। গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. আ.ফ.ম রুহুল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে মন্ত্রী বলেন, যদি কেউ নকল ও ভেজাল ওষুধ উত্পাদন ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত থাকে তাহলে সঙ্গে সঙ্গে সেই দোকানের লাইসেন্স বাতিল করা হবে। পাশাপাশি থাকছে জেল ও জরিমানা। একইসঙ্গে নকল, ভেজাল এবং সরকারি ওষুধ বিক্রি প্রতিরোধে নিয়মিত মনিটরিংসহ মোবাইল কোর্ট পরিচালনার জন্য মন্ত্রী ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরকে নির্দেশ দিয়েছেন। বৈঠকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মুহাম্মদ হুমায়ুন কবীর, স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. খন্দকার মো. সিফায়েত উল্লাহ, ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল জাহাঙ্গীর হোসেন মল্লিকসহ শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সরকারি ওষুধ বাইরে বিক্রির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে মন্ত্রী নির্দেশ দেন। তিন মাস অনুসন্ধানের পর র্যাব নিশ্চিত হয়ে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে গত সোমবার মিটফোর্ড এলাকায় নায়না মেডিসিন মার্কেটের মেডিসিন কর্নার নামের দোকানে অভিযান চালায়। সেখানে গর্ভবতী নারীদের জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন কোম্পানির নামিদামি বিপুল পরিমাণ নকল ইনজেকশন, প্রসবকালীন সময় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ বন্ধের ইনজেকশন, ব্যথানাশক ইনজেকশনসহ বিভিন্ন ধরনের এন্টিবায়োটিক ও সরকারি হাসপাতালে সরবরাহকৃত এন্টিবায়োটিকসহ নানা ধরনের ওষুধ মোবাইল কোর্ট জব্দ করে। মেডিসিন কর্নারের মালিক ত্রিদেব কুমার সরকার অপু এবং অপর দুই দোকান মালিক বাবুল ও অপু রহমানকে আটক করে মোবাইল কোর্ট। তারা মোবাইল কোর্টকে জানায় যে, ৫ বছর যাবত্ তারা নকল ইনজেকশনসহ বিভিন্ন ধরনের ওষুধ এবং চোরাইপথে ক্রয় করা সরকারি ওষুধ পাইকারি বিক্রি করে আসছিল। তারা ১০ টাকার ওষুধ ১০০ টাকা মূল্যে বিক্রি করেছে। বিভিন্ন নামিদামি দেশি ও বিদেশি কোম্পানির ওষুধ নকল করে পাইকারি বিক্রি করে আসছে। বাবুল নকল করার ওস্তাদ। সে ইনজেকশন তৈরি করে অপু রহমান দোকানে সরবরাহ করে থাকে বলে মোবাইল কোর্টের কাছে স্বীকার করে। তেজগাঁও সরকারি কেন্দ্রীয় ওষুধাগার থেকে বিভিন্ন জেলার সিভিল সার্জনের দফতরে সরবরাহকৃত ওষুধ সামগ্রীর অর্ধেক মিটফোর্ডের উক্ত মার্কেটসহ বিভিন্ন দোকানে চোরাইপথে বিক্রি করা হয়ে থাকে। বহু বছর ধরে ওষুধাগারে একশ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারী ও বিভিন্ন জেলা থেকে ওষুধ নিতে আগত কর্মকর্তা-কর্মচারীর সমন্বয়ে একটি সিন্ডিকেট কোটি কোটি টাকার ওষুধ চোরাইপথে বিক্রি করে আসছে বলে তারা মোবাইল কোর্টের কাছে স্বীকার করেছে। মোবাইল কোর্টের ম্যাজিস্ট্রেট এএইচএম আনোয়ার পাশা ত্রিদেব কুমার সরকার অপুকে ২ বছর, মো. বাবুলকে ২ বছর ও অপু রহমানকে ৩ মাস কারাদণ্ড দিয়ে জেলখানায় পাঠিয়ে দেন। সরকারি ওষুধ চোরাইপথে ক্রয় করে বিক্রির অপরাধে তাদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা করা হয়। অভিযানে র্যাব-৪ এর উপ-পরিচালক স্কোয়াড্রন লিডার মিরান ও ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের সুপার শৈকত কুমার কর অংশগ্রহণ করেন। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, মিটফোর্ড হাসপাতাল, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল, জাতীয় হূদরোগ ইনস্টিটিউট, পঙ্গু হাসপাতাল, বক্ষব্যাধি হাসপাতাল ও ক্যান্সার ইনস্টিটিউটের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলাপকালে তারা জানান, এ ধরনের ভেজাল ইনজেকশন দেয়ার পর তাত্ক্ষণিক অনেক রোগীর মৃত্যু কিংবা রোগী সুস্থ না হয়ে অনেক সময় শরীরে নানা উপসর্গ দেখা দেয়। পাঁচটি বেসরকারি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ একই মতামত দিয়েছেন। ১০ জন বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক জানান, ভেজাল ওষুধ সেবনের পর রোগীরা তাদের কাছে অভিযোগ করে, স্যার ওষুধে কাজ হয় না। রোগ যন্ত্রণা বেড়ে যাচ্ছে। কোন কোন রোগীর ব্যবস্থাপত্র কয়েক দফা পরিবর্তন করতে হয় বলে বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা জানান। স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক বলেন, কেন্দ্রীয় ওষুধাগার থেকে ওষুধ পাচারের তথ্য পাওয়া গেছে। জড়িতদের শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে বলে তিনি জানান।