গ্রীষ্মের কাঠফাটা রোদ। সেইসঙ্গে অসহনীয় গরমে আব্দুস ছাত্তারের সারা শরীর ভিজে জবজব করছে। তবুও থেমে নেই কাজ। বয়স সত্তরের কাছাকাছি। বয়সের ভারে শরীরে চামড়ায় ভাঁজ পড়েছে। প্রচণ্ড গরমে শরীর থেকে ঘাম ঝরছে। দুপুরে রোদে সারা গা চিকচিক করছে। ক্লান্তি যেন তাকে কিছুতেই ছুঁতে পারছে না। ক্লান্তিহীনভাবে কাজ করেই চলছেন। মে দিবসের দিন গত বুধবার। দুপুরে কুড়িগ্রামের উলিপুরে একটি নির্মাণাধীন ইট ভাটায় গিয়ে কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি জানেন না মে দিবস কি। কেন ঘটা করে পালন করা হয় দিবসটি। তিনি বলেন, কাজ করলে টাকা পাই, না করলে পাই না। পরের দিন কি খামো সেটা নিয়ে চিন্তায় থাকি। হামার কিসের দিবস। সারাদিন খাটে নিয়েও কাইও ১০ টাকা বেশি দেয় না। আব্দুস ছাত্তারের মতো গ্রামের বেশিরভাগ শ্রমিকই মে দিবস বোঝেন না। শ্রমিক অধিকার নিয়ে শ্রমিক সংগঠনগুলো কাজ করলেও গ্রামের হাজারও কৃষি শ্রমিক আজও রয়ে গেছে অধিকার বঞ্চিত। বিশেষ করে নারী শ্রমিকরা পুরুষের সমান কাজ করেও ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত রয়েছে।
ভাটায় কর্মরত নির্মাণ শ্রমিক এন্তাদুল (২৮) বলেন, শ্রমিক দিবস ‘হামার নোয়ায়, এগলে নেতাদের। হামরা কাম করি খাই। সেই জন্যে ওগলেত হামরা যাই নে।
ভাটায় শ্রমিকদের সর্দার রিয়াজুল ইসলাম (৪৫) বলেন, দিবসের কথা বলে নেতারা ট্যাকা কামায় ওমার চলে। হামাক কাম না করলে কাইও ট্যাকা দিবের নয়’।
উপজেলার মলাতি পাড়া গ্রামের কাঠমিস্ত্রি কল্যান চন্দ্র বর্মন হাতুর বাটাল নিয়ে কাজে যাচ্ছেন। কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি জানান, আমার একার আয় দিয়ে ছয় সদস্যের পরিবার চলে। ছেলে মেয়েদের পড়াশুনা, ভরণ পোষণ সব কিছু একায় সামলাতে হয়। একদিন কাজ না করলে পরের দিন উপোস থাকতে হয়। কাজে না গিয়ে উপায় নেই। তাই কাজে যাচ্ছি।
শুধু আব্দুর ছাত্তার কিংবা এন্তাদুলরা নয় দিনমজুর, রিকশাচালক, ভ্যানচালক, দোকান কর্মচারীসহ গ্রামের খেটে খাওয়া শ্রমিকদের মাঝে মে দিবসের কোনো উচ্ছ্বাস নেই। মে দিবস কিংবা শ্রমিক দিবস কিছুই জানেন না তারা। জানার আগ্রহও নেই তাদের। তারা এতটুকুই বোঝেন কাজ করলেই পেট ভরবে। কালের বিবর্তনে সব কিছু পাল্টে গেলেও শুধু পাল্টায়নি গ্রামীণ শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন। তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠান এগিয়ে আসেনি কোনো শ্রমিক সংগঠন। এখনও তাদের কাজ করতে হয় দিনভর। শ্রমিক অধিকার আদায়ের এ দিনে গ্রামীণ শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠা আজও অধরাই থেকে যাচ্ছে।