আবদুশ শাকুরের গল্প

নিঃসঙ্গ পথিকের কথকতা

জীবন থেকে আবেগ অনেকটাই হারিয়ে গেছে। এই মহানগরে মৃত্যু ব্যাপারটি এতই স্বাভাবিক ও প্রায়-নৈমিত্তিক যে, আমাদের চৈতন্যের একটি জানালা খুলে রাখি মৃত্যুর দিকে। রবীন্দ্রনাথের কবিতায় পেয়েছি, ‘মরণ যেদিন দিনের শেষে আসবে তোমার দুয়ারে, সেদিন তুমি কী ধন দিবে উহারে।’ আমাদের হয়তো কোনো ধন নেই দেবার মতো কিন্তু, কারও কারও থাকে। যেমনটি ছিল সদ্যপ্রয়াত শিল্পী আবদুশ শাকুরের। একটি বিশেষ সংখ্যা ‘গল্পকথা’ বেরোবে তাঁকে নিয়ে, মোটামুটি দীর্ঘ একটি লেখাও লিখেছি তাঁর গল্পের ওপর। সেটি বেরোনোর আগেই শেষের খেয়ায় পাড়ি জমালেন তিনি। আক্ষেপ ও অভিযোগ ছিল তাঁর পাঠকদের প্রতি—নিজের গল্প যথাযথ সমাদর পেল না বলে। মুক্তিযুদ্ধের গল্প নাকি তিনি লেখেননি, না পড়েই অনেকে এ অভিযোগ করেছেন। গত এক দশকে চিন্তাধারা পাল্টেছে, আবদুস শাকুরের গল্প নিয়ে মূল্যায়নেও এসেছে পরিবর্তন। প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে লিখেছেন আবদুশ শাকুর। ‘ক্ষীয়মাণ’ (১৯৬১) গল্পগ্রন্থ দিয়ে তাঁর মেধাকরোজ্জ্বল যাত্রা। তারপর একে একে বেরিয়েছে ‘ক্রাইসিস’ (১৯৭৬), ধস (১৯৮৪), বিচলিত প্রার্থনা (১৯৮৫), গল্পসমগ্র (২০০২), শরীর (২০১১)—প্রভৃতি রচনা। এই ভূ-খণ্ডের ছোটগল্পে যে জীবনের দেখা মেলে, তার নেপথ্যে মুখ্য হয়ে উঠেছে সামন্ত চেতনাকেন্দ্রিক আবহমান গ্রামীণ সমাজের ছায়া। অস্ফুট নগরায়ণের কারণে অনেকের গল্পে নাগরিক জীবনকেও মনে হয় আধা-গ্রামীণ। এক অন্তর্গত নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে এগিয়েছে আমাদের ছোটগল্প। ষাটের দশকে গল্পে এসেছে ব্যক্তিজীবনের সূক্ষ্ম ব্যবচ্ছেদ, সত্তরের মাঝামাঝি পর্যায়ে সামরিক অন্ধকার গ্রাস করে বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থাকে, আশির দশকে বিশ্বগল্পতরু থেকে গল্পকাররা নিয়ে আসেন বিচিত্র পরীক্ষাবীজ। পরাবাস্তবের জগত্ ছেড়ে আমাদের গল্প প্রবেশ করে জাদুবাস্তবতার মায়াবি লোকে। প্রথাগত প্রতীকও মেধার শুশ্রূষায় নতুন ব্যঞ্জনা লাভ করে। আশি-নব্বইয়ের নিরন্তর নিরীক্ষায় বাংলাদেশের ছোটগল্প নতুন তটে এসে পৌঁছায়। গল্পের শরীরে তথা আখ্যানে তৈরি হয় এক বা একাধিক কেন্দ্র, সেই কেন্দ্র সম্প্রসারিত হতে হতে পরিধিতে গিয়ে মিলেছে। এ যেন আলোকের এক অবিরল ঝর্ণাধারা জীবনের অন্তর্জাল ছড়িয়ে পড়ার কথকতা। আবদুশ শাকুর বাংলাদেশের ছোটগল্পের জগতে স্বল্পোচ্চারিত একটি নাম। নানা গুণে গুণান্বিত এই লেখকের গল্পপাঠকের সংখ্যা হয়তো আরও কম। জীবনে ও সাহিত্যে এ রকম কেউ কেউ থাকেন, সকলের মধ্যে থেকেও যিনি কারও মতো নন, তিনি নিজের মতো একাকী ও স্বতন্ত্র। গল্প লেখার ক্ষেত্রে আবদুশ শাকুরের কোনো পূর্বসূরি নেই। কারও উত্তরসাধকও তিনি নন। অথচ বিষয়ের বৈচিত্র্যে ও ভাষার দ্যুতিতে তাঁর গল্প অন্যদের থেকে কতই না আলাদা! পিছিয়ে পড়া নিম্নবর্গীয় মানুষদের নিয়ে ষাটের দশকেই শুরু হয়েছিল শাকুরের ছোটগাল্পিক যাত্রা। ‘ক্ষীয়মাণ’ গল্প তার অনবদ্য দৃষ্টান্ত। লড়াই করে টিকে থাকা প্রাত্যহিক ও রোজকার মানুষদের প্রতি তাঁর নিবিড় জীবনপ্রেমের উদ্ভাসন ঘটেছে এ গল্পে। মতু চৌকিদারের মধ্যে জ্বলজ্বল করে ওঠে সামন্তপ্রভুর ছায়া, অন্যদিকে মেনু, তার মা সুরমা ও বড় বুবুর মধ্যে রূপ লাভ করে বিপন্ন-অস্তিত্ব তৃণমূল মানুষের নিরন্তর সংগ্রামের অভিজ্ঞতা। কন্যাতুল্য সুরমাকে মতুজান গাজীর ছলে-বলে বিয়ে করতে চাওয়ার মধ্যে ফিরে ফিরে আসে সামন্ত-নিপীড়নের পৌরাণিক ছায়া— ‘সুরমারে বিয়া করবার চায় তার বাপের বয়েসী মতুজান গাজী। ক্যান, বিবি তার অকুলান অয় নাকি, এক হালিতে চলে না? দোষ কি বুন, গা আছে, গরু আছে। গোলা আছে, ঘর আছে। বেদীন-বেশারিয়তী ত নয় মতুজান-বড়টারে ছাইরা দিয়া শরিয়ত মতেই কবুল করব।’ নাগরিকজীবনে ও আমলাতান্ত্রিক পেশায় জীবন কাটালেও আমাদের আবহমান গ্রামজীবন তার সমস্ত ক্ষুদ্রতা, শোষণ, নিপীড়ন, বৈষম্য ও অনটন নিয়ে তাঁর গল্পে দেখা দিয়েছে। গ্রামীণজীবন রূপায়ণে শাকুর সূক্ষ্মদর্শী ও জীবনপ্রেমী। আবাল্যের পিতৃভিটে থেকে উন্মূল নিরাশ্রয় মানুষের অনবদ্য লড়াইয়ের কথকতা তাঁর ‘ধস’ গল্পটি মানবিক অনুভূমির নিবিড় পরিচর্যায় গল্পটিতে উঠে এসেছে মুক্তিযুদ্ধের গৌরবগাথা, সেই সঙ্গে স্ফুট হয়েছে এই জনপদের বহমান সমাজসত্য। এ গল্পে আবদুর রহমান মুন্সী হলেন সেরকম একজন পোড়খাওয়া সূক্ষ্মদর্শী মানুষ, যার বাস্তব অবলোকনে বিধৃত হয়েছে এ অঞ্চল তথা উপমহাদেশের রাজনৈতিক স্বপ্নভঙ্গের ইতিহাস— ‘আমরাও লড়কে লইছিলাম পাকিস্তান—আমগো কিছু অয় নাই। তরা তো মরকে লইছস বাংলাদেশ— তগোও কিচ্ছু অইব না। পয়সাওয়ালার পয়সা বারাইয়া তর আমার কী কাম রে বেকুব?’ গোড়ালিতে গুলিবিদ্ধ হয়েও আহত হাবুর অহংকার ছিল মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়ে। যুদ্ধোত্তর স্বদেশ বাস্তুভিটে ছেড়ে নাবু পাড়ি জমায় বৈরী শহরে ভিক্ষুক পরিচয়ে। ‘ধস’ নামটির মধ্যে গল্পকার এক ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্ন ও বিপন্নতার আভাস ফুটিয়ে তুলেছেন। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ভিন্ন স্বাদের বেশকিছু গল্প লেখার কৃতিত্ব রয়েছে আবদুশ শাকুরের। তাঁর গল্পে মুক্তিযুদ্ধ কেবল সম্মুখ লড়াইয়ের বর্ণনা নয়। মুক্তিযুদ্ধ তাঁর গল্পে সামগ্রিক, দৈহিক, মনস্তাত্ত্বিকও বটে। ‘অস্বস্তি’, ‘ধস’, ‘ত্যাগ’, ‘ইশু’ ‘সকরুণ প্রহসন’ প্রভৃতি গল্পে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ নানা রূপে ও অভিজ্ঞতায় চিত্রিত হয়েছে। যুদ্ধকালীন সময়ে পাকিস্তানি জান্তা কর্তৃক ইসলামকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা এবং ভিন্ন ধর্মের বিশেষ করে হিন্দুসম্প্রদায়ের নরনারীদের জোরপূর্বক মুসলমান বানানোর লোমহর্ষক অভিজ্ঞতা শাকুরের গল্পে অন্য মাত্রা লাভ করেছে। ‘ত্যাগ’ গল্পটি তাঁর নিপুণ দৃষ্টান্ত। এ গল্পে মুক্তিযুদ্ধকালে বান্দরবান, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম প্রভৃতি অঞ্চলে নওমুসলিম বানানোর এক মহোত্সব শুরু হয় এবং এই মুসলমানিকরণ কেবল কলেমা পড়ে নয়, খত্নাসহ। গল্পকথক পাকিস্তানি কর্নেলকে যখন বয়স্ক এবং যুবকদের খত্না করানোর কষ্ট ও ঝুঁকির কথা বলেছেন, তখন কর্নেলের জবাব— ‘কষ্ট? বলুন ত্যাগ-আত্মত্যাগ। ইসলামের মত একটা মহান ধর্ম অত সহজে গ্র্যাব করার বদলে বাড়তি একটু বাহুল্যও ত্যাগ করতে পারবে না তারা? এত বড় ধর্মের জন্যে এতটুকু ত্যাগ?’ গল্পের শেষে প্রকাশ পেয়েছে হরিমোহন মুদির ম্যাট্রিক পরীক্ষার্থিনী কন্যা মাধুরী নন্দীর দুঃসাহসিকতা ও জীবনযুদ্ধের অপরাজেয়তার কথা— ‘পরের দিন নয়, পরের ভোরেই হায়বাত খানকে জান নিয়ে ছুটতে হয়েছিল চাটগাঁর মিলিটারী হাসপাতালে, ইসলামের জন্যে নওমুসলিমের শিশ্নমুণ্ডের ত্বকের চেয়ে একটু বেশী ত্যাগ স্বীকার করেই-বাংলার ডানপিটে মেয়েটি তার শিশ্নমন্ডুই কেটে ফেলে দিয়েছে।’ ভাষার এই তীক্ষ্নতা শাকুরের গল্পকে দিয়েছে রম্য-আমেজ। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধকালীন নৃসংশতার পরিচয় দানই গল্পকারের শেষ কথা নয়, বরং এই বর্বরতার মূল হোতাদের উপযুক্ত শাস্তি প্রদানের তীব্র তাগিদটিও ধ্বনিত হয়েছে তাঁর গল্পে— ‘নান্দনিক কবরগামী চৌধুরী সাহেবের অমন অমানবিক কবরগামী হওয়ার কথা ভাবা যায় না বিধায়, এসডিও সাহেব এখনো ভাবেন—তাঁর সহমুক্তিযোদ্ধা শওকত চৌধুরীদের খুঁজে না পেলেও তাঁদের ঘাতকদের খুঁজে বের করে তাদের পাপের শাস্তিবিধান না করা পর্যন্ত বাঙালি জাতির পাপমোচন হবে না।’ গ্রামীণ অভিজ্ঞতার আন্তরিক উদ্ভাসন সত্ত্বেও বলতে হয়, আবদুশ শাকুর নাগরিক জীবন ও নাগরিক রুচির গল্পকার। তাঁর গল্পভাষায় মননের যে হিরণ্য-ছোঁয়া, তা-ও তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক নাগরিকতার প্রকাশ। এই জনপদের গল্পে প্রধান অংশজুড়ে রয়েছে শাশ্বত গ্রাম। গ্রামীণ জীবনপ্রবাহের বৈচিত্র্যময় প্রকাশে স্পন্দিত আমাদের ছোটগল্প। স্বাধীনতা-উত্তর অসম সমাজবিকাশের কারণে আমাদের ভূ-খণ্ডে নগরায়ণটি সমতাভিত্তিক হয়নি। রাজধানী শহরটি মহাদানবের মতো স্ফীত হলেও দেশের অধিকাংশ জায়গাই নগরায়ণের সুবিধা থেকে বঞ্চিত। ফলে আমাদের কথাসাহিত্যে গ্রামীণ নরনারীর সুখ-দুঃখ, প্রেম-বিরহ এবং তাদের জীবনযাপনের জটিলতা আমাদের বুকে ঝড় তোলে। আমরা কাতর হই। এই বিষাদ ও কাতরতা নিয়ে নাগরিক রুচির গল্প পড়তে আমাদের মন সাড়া দেয় না। ফলে ওই জাতীয় গল্পের সঙ্গে আমাদের এক ধরনের দূরত্ব তৈরি হয়। বিচ্ছিন্নতা জেগে ওঠে। তা ছাড়া তৃণমূল জনগোষ্ঠীর মুখের ভাষা তাদের জীবনযাপনের মতোই প্রাকৃত, সরল ও অকপট। অথচ আবদুশ শাকুর জীবনের প্রয়োজনেও শিল্পকে ছাড় দিতে নারাজ ছিলেন। গাঁও-গেরামের মানুষের কথা স্বল্পায়তনে এসেছে তাঁর গল্পে। সেখানে তিনি তাদের মতোই প্রাকৃতপ্রায় কিন্তু তাঁর গল্পের প্রধান ভূ-ভাগজুড়ে নাগরিক জীবন ও উচ্চবর্গীয় সংস্কৃতির যে রূপায়ণ ঘটেছে, সেখানে তান্ত্রিক ঋষির মতোই তিনি নিষ্ঠাপরায়ণ। বৌদ্ধিক রিচুয়ালসের ক্ষেত্রে তিনি নিরাপোস। ফলে মেট্রোপলিটন জীবনের অনন্য রূপকার হয়ে ওঠেন শাকুর। তাঁর অধিকাংশ গল্পের নরনারী চিন্তায়-আচরণে মননে ও বচনে হয়ে ওঠে বিদগ্ধ মেট্রোপলিটন। এই মেট্রোপলিটানিজমের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্যুরোক্রেসি বা আমলাতন্ত্র। পেশাসূত্রে আমলা হবার কারণে শাকুরের গল্পে আমলাতান্ত্রিক জীবন ও সংস্কৃতির বর্ণাঢ্য পরিচয় পাওয়া যায়। সরকারি আমলার প্রমোদভ্রমণ, বিদেশযাত্রা, বিদেশে পাঁচ তারকা হোটেলে অবস্থান, সরকারি ও রাষ্ট্রীয় নানা উদ্যোগ, তার বিচিত্র রূপ শাকুরের গল্পে যেমন অনায়াসে তৈরি করে একটি অর্থোডক্স এলিট আবহ, তেমনি গুলশান-বনানী, ধানমন্ডির আত্মকেন্দ্রিক জীবন, ধানমন্ডি পার্কে নগরবাসীদের প্রাতঃভ্রমণ কিংবা বৈকালিক আড্ডা, তরুণ-তরুণীর জমজমাট প্রেম, মহানগরের শপিংমল, তার অফুরন্ত আলোর রোশনাই তাঁর গল্পে নিয়ে আসে মহানাগরিক জৌলুস। কিন্তু শাকুরের গল্পে কেবল কংক্রিটের মহানগর নয়, তার নিচে চাপা পড়ে থাকা ধোপ-দুরস্ত নরনারীর বিষাদময় অভিজ্ঞানও আন্তরিক মাত্রা পেয়েছে। এই মহানগরে কেবল বাসন্তী বাতাস নয়, কখনও কখনও আসে ঝড়ো হাওয়া এবং সেই ঝড়ো হাওয়ায় ভেঙে চুরমার হয়ে যায় জীবনের সাজানো আদলটি। ‘জননজাল’ গল্পে সুধীর বাগচী ও হুমায়রার প্রেম ও রোমান্টিকতার আড়ালে তৈরি হয়েছিল ভয়ংকর শূন্যতা। ক্যান্সারের নির্দয় দংশনে সুধীর হারিয়ে যায় হুমায়রার জীবন থেকে। রেখে যায় একমাত্র আত্মজকে। সেই আত্মজকে নিয়ে হুমায়রা বেঁচে থাকার শক্তি খোঁজে ভালোবাসার নতুন সহযাত্রী খালেদের মধ্যে। জিনোমিক্সের কল্যাণে হুমায়রা জেনে যায়, ‘ভালবাসা একটা জেনেটিক ট্র্যাপ’ মাত্র। হূদয়-অভিজ্ঞানের সঙ্গে আবদুশ শাকুর জড়িয়ে দেন বিজ্ঞানের সর্বশেষ জিজ্ঞাসা ও অন্বেষাকে এবং এভাবেই তাঁর গল্প ধারণ করে আধুনিকতার অন্তর্নিহিত স্পৃহাকে। আবদুশ শাকুর গল্পের জীবনরূপায়ণে কসমোপলিটনও বটে। সময় ও বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রা গল্প রচনায় তাঁকে প্রণোদনা জুগিয়েছে। বিজ্ঞাননিষ্ঠ বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি না থাকলে আবদুশ শাকুর ‘আঘাত’ গল্পটি লিখতে পারতেন না। গল্পটি সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে। ‘আঘাত’ গল্পের জিজ্ঞাসা মূলত বিজ্ঞানেরই জিজ্ঞাসা। মানসিক ডিফরমিটি নিয়ে রোকেয়া বারির গর্ভে যে শিশুটির ভ্রূণ বেড়ে উঠতে থাকে, সে যে স্টিফেন হকিন্সের মতো অসামান্য মেধা নিয়ে পৃথিবীতে জন্ম নেবে না, তা কে জানে। বিজ্ঞান-নির্ভর মানব চৈতন্যের এক নতুন ধারণা গল্পটিতে রূপ লাভ করেছে— ‘একটি সম্পূর্ণ নিউ ডিজাইনের ব্রেনের প্রমোটারের ভূমিকা নিয়েই এসেছিল সে স্বয়ং প্রমোশনাল স্যাম্পলটি হয়ে। মাতা-পিতার দুয়ারে দুয়ারে করাঘাত করেও যখন প্রমোট করতে ব্যর্থ হয়েছে তখন তো নিজেই চলে যাবে সে দেবদূত। সেজন্যেই তো করাঘাত থেমে গেছে।’ বিষয়বৈচিত্র্যের সঙ্গে শাণিত মননদীপ্ত ভাষার রসায়নে এভাবেই আবদুশ শাকুর গল্পের স্বতন্ত্র বুনন তৈরি করেন। কসমোপলিটন বিশ্ব ও জীবন সম্পর্কে সম্যক ধারণা নিয়েই গল্পকার এই আপাতবিরল বিষয়কে গল্পের উপজীব্য করে তুলেছেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভাষার বৌদ্ধিক উত্কর্ষ। প্রাচ্যের আবেগধর্মিতা এবং পাশ্চত্যের বস্তুমুখ্যতার সমন্বয়ে শাকুর জীবনের ছবি এঁকেছেন। রম্যরচনার স্বাদ ও অনায়াস কৌতুকময়তা তাঁর মননশীল গদ্যকে পৌঁছে দেয় পাঠকের চৈতন্যে ও হূদয়বৃত্তিতে। আবদুশ শাকুর নগরজীবন ও সংস্কৃতির প্রধান রূপকার হলেও তিনি বস্তুত জীবনেরই অনুসন্ধান করেছেন গল্পে। তাঁর গল্প-বিধৃত জীবন অনেকের কাছে অজানা বা স্বল্প জানা বলেই তিনি গৌণ লেখক হয়ে পড়েন না। মেটাল্যাংগুয়েজ বা অধিভাষা নয়, জীবনের ভাষায়-ই তিনি গল্প লিখেছেন। তাঁর গল্পের স্বাদ ও রস পেতে তাই আমাদের প্রস্তুতি দরকার হয়, অভিজ্ঞতার পুঁজি লাগে। সেই পুঁজি নেই বলে আবদুশ শাকুরের মতো একজন গল্পকার হয়ে ওঠেন আগন্তুক ও অধরা। বিষয়গৌরবে ও ভাষার অনন্য মননে আবদুস শাকুর বাংলা ছোটগল্পের নিঃসঙ্গ পথিক।