হাসান আজিজুল হক
কথাসাহিত্যের নান্দনিক স্রষ্টা
প্রকাশ : ৩১ জানুয়ারি ২০১৩, ১৭:১৫
হাসান আজিজুল হকের শুরু ১৯৬৪ সালে, ‘সমুদ্রের স্বপ্ন শীতের অরণ্য’র মধ্য দিয়ে। এর চার বছরের মাথায় তাঁর ‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ’ গল্পগ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। কালের হিসেব কষলে সেটা ষাটের দশকের ঘটনা। এ দশকেই বাংলা সাহিত্যে বিশেষত, বাংলা ছোটগল্পে ঘটে এক মৌলিক রূপান্তর। চল্লিশ কিংবা পঞ্চাশের দশকের লেখকদের লেখার আবেগ আর রোমান্টিকতার ভাবালু অনুষঙ্গ এবং সেই সঙ্গে চিরাচরিত মঙ্গলময়তা থেকে সরে এসে সৃষ্টি হয় বাংলা ছোটগল্পের এক স্বতন্ত্র শিল্পভুবন। তাতে প্রাধান্য পায় দেশভাগের যন্ত্রণা এবং সেই সঙ্গে বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পূর্ব অস্থিরতাও বেশ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ষাটের সে শিল্পপ্রবণতায় যাঁরা একীভূত হয়েছিলেন, হাসান আজিজুল হক তাঁদের মধ্যে নেতৃস্থানীয়। হাসান আজিজুল হকের বিশিষ্টতা এই যে, তিনি গল্পে দেশভাগের অনুষঙ্গ যেভাবে শিল্পীত করেছেন, সে-কালের অনেকের লেখায় তা প্রায় অনুপস্থিত। এরই মধ্যে তিনি একে একে লিখলেন ‘শকুন’, ‘তৃষ্ণা’ ‘আবর্তের সন্মুখে’, ‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ’, ‘সন্মুখে শান্তি পারাবার’-প্রভৃতি গল্প।
দেশভাগের নির্মম অভিজ্ঞতা হাসান আজিজুল হককে গোপনে রক্তাক্ত করেছে আর তাঁর গল্পের মানুষকে করেছে নিঃশিকড়, উত্পীড়িত। তাঁর এ শিল্পসফলতার পেছনে আরও একটি বিষয় খেয়াল করার মতো, দেশভাগের কারণে যেসব শিল্পীকে দেশান্তরিত হতে হয়েছিল, হাসান আজিজুল হক তাদের মধ্যে একজন। ১৯৩৯ সালে পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার যবগ্রামে জন্ম নেওয়া এই শিল্পী দেশবিভাগের কারণে স্থায়ী হন আজকের বাংলাদেশে। ফলে দেশভাগের যন্ত্রণা তাঁর উপলব্ধিজাত এবং সে ঘটনাই তাঁর সৃষ্টিকে সিদ্ধি দিয়েছে—অনুমান করা যায়। অবশ্য শুধু দেশান্তরের বিষয়টি বিবেচনা করে শিল্পস্বার্থকতা খোঁজা হলে লেখকের কৃতিত্বকে খাটোই করা হয়। লেখক নিজেই বলেছেন—‘আমার জন্ম পশ্চিমবঙ্গে। এ বিষয়টা আমি অন্যভাবে দেখি। আমার লেখায় নানাভাবে উঠে এসেছে।
এটাকে নস্টালজিয়া না-বলে ব্যক্তিগত পর্যায়ে রেখে দিয়েছি। ভারতবর্ষের রাজনীতি একটু হলেও বোঝার
চেষ্টা করেছি।’ (উন্মোচিত হাসান, সম্পাদনা:হায়াত্ মামুদ, পৃষ্ঠা-২০৭)।
তবে বিষয়টি কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে একজন মানুষ তাঁর শেকড় ছেড়ে ভিন্ন ভূ-ভাগের বাসিন্দা হলেন। অস্বীকার করার জো নেই, দেশভাগের সে ঘটনা লেখকের এ সৃষ্টির মর্মমূলে কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। বলা যায়, হাসান আজিজুল হকের গল্পের মৌল সুর হলো দেশভাগ। দেশভাগের যন্ত্রণা তাঁর গল্পে কাতর হয়ে দেখা দিয়েছে। দেশভাগের যন্ত্রণা বুকে নিয়ে লেখা ‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ’ গল্পটির মতো শিল্পসফল গল্প বাংলা সাহিত্যে খুব কমই সৃষ্টি হয়েছে। বস্তুতপক্ষে, বক্ষ্যমাণ গল্পে কোনো কাহিনি নেই। উদ্বাস্তু ছন্নছাড়া এক শরণার্থী বৃদ্ধের জীবনযাপনের মর্মভেদী এক বৃত্তান্ত ‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ’। সময়কে তিনি গল্পের ফ্রেমে বেঁধেছেন। সে বাঁধন যেমন শিল্পিত, তেমনি মর্মস্পর্শী। ‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ’ সে সময়-কালেরই একটি উত্কৃষ্ট উদাহরণ।
দেশভাগ-ছিন্নমূল মানুষের হাহাকার তাঁর গল্পের অন্যতম সুর হলেও হাসান আজিজুল হকের লেখার ভান্ডার বিচিত্র ও বহুমুখী। ‘আমরা অপেক্ষা করছি’ গল্পে লেখক যে অপেক্ষার কথা বললেন, সেটি আসলে কিসের অপেক্ষা? জীর্ণ-দীর্ণ মানুষের ব্যবচ্ছেদের অপেক্ষা? না কি সব সীমাবদ্ধতাকে ডিঙিয়ে সুদিনের অপেক্ষা? গল্পে বিকারগ্রস্ত আধুনিক কিম্ভুত সময়ের এই সময়চক্রে পিষ্ট বহুরূপী মানুষের শতচ্ছিন্ন অস্তিত্ব ও তার অন্তর্জাগতিক বাস্তবতার উন্মোচনই লেখকের মূল অন্বিষ্ট। সাতচল্লিশের দেশভাগের যন্ত্রণা মনে থাকলেও তত দিনে বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। বিপ্লবের নামে লাল নিশান ওড়ালেও তা ছিল স্বার্থসিদ্ধিরই নামান্তর। গল্পে কমিউনিস্টের তথাকথিত সেইসব নেতাকে তিরস্কার করেছেন, লেখক যারা বিপ্লবের নামে ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধারে ব্যস্ত। স্বার্থের প্রয়োজনে যারা সাপের মতো খোলস পাল্টায়। বহুচারী এসব নেতারা স্বাধীনতা-উত্তর দেশে ধনে-মানে বড় হয়েছে, বয়ে গেছে তাদের শুভদিন। কিন্তু প্রকৃত দেশপ্রেমিক বিপ্লবী যারা তারা বারবার কচুরিপানার মতো এ ঘাট থেকে সে ঘাটে ভেসে বেড়িয়েছে শুধু নেতাদের আদর্শহীনতার কারণে।
হাসান আজিজুল হকের গল্পগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি বাংলাদেশের সাধারণ নরনারীর ম্লান ও তুচ্ছ জীবনকেই উপাদান হিসেবে গ্রহণ করেছেন। তাতে বঙ্কিম-রবীন্দ্রনাথ-শরত্চন্দ্রের কল্পলোকচারী প্রেম ও রোমান্সের বিপুল ঐশ্বর্য নেই বললেই চলে। চরিত্রগুলিতে বাইরের দিক থেকে কোনো অভাবনীয়ত্বের চমক নেই, প্রচণ্ড ‘প্যাসন’ নেই, বিপুল আবেগ নেই, আকাশস্পর্শী আদর্শ নেই, আছে বাস্তবজীবনের উত্তাপ। সমাজজীবন সমন্ধেও তিনি মৌলিক কোনো তত্ত্ববাদের অবতারণা করেননি।
সত্তরের দশকে প্রকাশিত জীবন ঘষে আগুন (১৯৭৩), নামহীন গোত্রহীন (১৯৭৫), আশির দশকে প্রকাশিত পাতালে হাসপাতালে (১৯৮১), আমরা অপেক্ষা করছি (১৯৮৯), নব্বইয়ের দশকে প্রকাশিত রোদে যাবো (১৯৯৫), মা মেয়ের সংসার (১৯৯৭)—প্রভৃতি গ্রন্থে গল্পের কাহিনি ও আঙ্গিক বিশ্লেষণে হাসান আজিজুল হক নিরীক্ষাপ্রবণ। ‘রোদে যাবো’ গল্পগ্রন্থের ‘নবজাতক’ গল্পটির কথাই ধরা যাক। দু-পৃষ্ঠারও কিছু কম গল্পটিতে কাহিনি বলতে তেমন কিছু নেই। কিন্তু গল্পের যে প্রস্তাবনা, তাতে কাহিনির চেয়ে বড় কাহিনি আমাদের মনের মাঝে দোলা দেয়, চোখের সামনে ভেসে ওঠে প্রসবকাতর এক মায়ের মুখ। বোমারু বিমান মাথার ওপর চক্কর দিচ্ছে, জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে মানুষ, শত্রুর একটি বোমার আঘাত যখন-তখন শেষ করে দিতে পারে সবকিছু। লেখক এ সময় জীবনের গান শোনালেন। যুদ্ধের সে দামামার মাঝে তিনি জানালেন নতুন জীবনের আহ্বান। বোধকরি, এখানেই হাসান আজিজুল হকের নান্দনিকতা, তাঁর শাশ্বত মানবিকতা।
তবে কিছু কিছু গল্পে তিনি দারুণভাবে বিষয়-অনুগামী, বক্তব্যে কোনো রাখঢাক নেই। ঘটনার অনুপুঙ্খ বর্ণনা অনেক সময় কাহিনিকে গতি দিয়েছে। ‘সন্মুখে শান্তি পারাবার’ গল্পে দেখা যাচ্ছে, বাপ-ছেলে বসে আছে গোয়ালঘরের দাওয়ায়। কিন্তু সে বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বললেন, ‘গোয়ালের ভিতর দু’তিনটি গরুর চোখে প্রচণ্ড পিচুটি।’ গোয়ালে বাঁধা গরুর চোখের পিঁচুটিও দেখাতে হয় লেখককে? হয়তো প্রয়োজীয় ছিল না। কিন্তু হাসান দেখালেন। এই হলো হাসান আজিজুল হক। এমন সব ছোট ছোট শিল্পপরিচর্যা তাঁর গল্পের ভিত মজবুত করেছে। আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার লক্ষ্য করার মতো—‘হামিদের বাপটো দু’একদিনের ভিতেরই মরবে। আজ সারা বৈকালি কি করচে জানিস?
জানি-খালি হাঁফিয়েছে-এই শালোর মতুন।
জামু বলল, সব শালোর হাঁফানির ব্যায়রাম। ওরে শালা, পালাইতে চাও, শালা শিকুনি,
শালা সুদখোর অঘোর বোষ্টম।’ (শকুন, পৃষ্ঠা-১৬)।
সমালোচনা সাহিত্যেও হাসান আজিজুল হক কম যান না। উদাহরণের জন্য বেশি দূর না যাই, শুধু ‘কথাসাহিত্যের কথকথা’ বইটির দিকেই আলো ফেলব। বইটির প্রবন্ধগুলোর গদ্যভাষা একেবারে ঝরঝরে, সরল, তাতে পড়ার স্বাদ পাওয়া যায়। একবার পড়লে মন ভরে না। স্বাদের তরকারি দিয়ে ভাত খেয়ে যেমন আঙুল চাটতে ইচ্ছে হয়, ঠিক তেমন। তাই ‘কথাসাহিত্যের কথকথা’ পড়তে হয় বারবার। বিভিন্ন বিষয়ে প্রবন্ধগুলোতে প্রায় কড়া সমালোচনাই আছে কোথাও কোথাও। তবে তা যেন ঠিক গায়ে ব্যথা ধরায় না।
সমালোচনার ভাষা বেশ তীর্যক হলেও কাউকে রূঢ় কথার জালে জড়াননি। হাসান তাঁর প্রবন্ধে বিভিন্ন লেখকের সীমাবদ্ধতা ধরিয়ে দিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু সেই সাথে পিঠ চাপড়ে দিতে ভোলেননি কিছুতেই। যেন খাঁটি জহুরির চোখ। বাদ দেননি কিছুই কিন্তু স্বল্পবাক। ‘রবীন্দ্র-উপন্যাসে স্বদেশ ভাবনা:গোরা’ প্রবন্ধে মহিমের আর্থিক অবস্থার অসঙ্গতি দেখালেন তিনি। কিন্তু রবীন্দ্রনাথে শ্রদ্ধা রেখেই বললেন, ‘মনে হয় রবীন্দ্রনাথ এটা লক্ষ করেননি।’ চমত্কার সমালোচনার ভাষাই বলতে হয়।
প্রায় অর্ধশতাব্দীর সাহিত্যসাধানা হলেও আশ্চর্যজনকভাবে হাসান আজিজুল হকের উপন্যাসের সংখ্যা কম। অন্তত তাঁর ছোটগল্পের তুলনায় তো অবশ্যই কম। তবে কী লেখক সচেতনভাবে উপন্যাসকে পাশ কাটিয়ে চলেছেন? শিল্পের এ মাধ্যমে লেখকের স্বস্তি কম? মীমাংসা দেওয়া গেল না। দেখা যাচ্ছে, নান্দনিক এই শিল্পী বেশ দেরিতে এসে উপন্যাস রচনায় হাত দিয়েছেন। হাসান তাঁর ৬৫ বছর বয়সে এসে লিখলেন দ্বিতীয় উপন্যাস ‘আগুনপাখি’। এর আগে লেখকের মাত্র একটি উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে। ‘বিধবাদের কথা’ নামের সে উপন্যাসটি আবার স্বল্পদৈর্ঘ্যের, মাত্র ৩৬ পৃষ্ঠার। এ ছাড়া তিনি ‘মাটি ও মানুষ’ (১৯৫৪) ‘শামুক’ (১৯৫৭) ‘এই সব দিনরাত্রি’ (১৯৬৩) নামে তিনটি উপন্যাস লিখেছেন বটে; তবে তাঁর কোনোটিই গ্রন্থরূপ পায়নি। এর মধ্যে ‘শামুক’ উপন্যাসটি পূর্বমেঘ পত্রিকার তিন সংখ্যায় (১৯৬৩) এবং ‘এইসব দিন রাত্রি’ উপন্যাসটি সন্দীপন পত্রিকায় অংশত প্রকশিত হয়েছে।
হাসান আজিজুল হকের সৃষ্টিভান্ডারে কিশোর উপন্যাস ও নভেলা আছে একটি করে; নামগুলো যথাক্রমে, ‘লালঘোড়া আমি’ (১৯৮৪) এবং ‘বৃত্তায়ন’। এ ছাড়া সমপ্রতি প্রকাশিত হয়েছে তিনটি ঔপন্যাসিকা। ২০০৬ সালে প্রকাশিত ‘আগুনপাখি’ উপন্যাসটি দেশবিভাগের পটভূমিতে এক নারীর বাস্তুর প্রতি মমত্ববোধের মানবিক আখ্যান। এক নারীর জবানিতে বর্ণনা করা উপন্যাসটিকে বলা হয়ে থাকে—এটি লেখকের আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস। এতে নস্টালজিয়ার উপস্থিতি প্রবল। বক্তা নিজের জবানিতে নিজের অভিজ্ঞতা প্রকাশ করতে গিয়ে দেশভাগ ও তার প্রতিক্রিয়ায় দেশত্যাগে অনিচ্ছুক নিজের জীবনকথা বর্ণনা করেছেন।
হাসান আজিজুল হকের সাহিত্যবিচারের দায় ঘাড়ে নেওয়া সহজ কথা নয়। ষাটের এই মহান শিল্পীর উত্তরণকাল ছিল যেমন অস্থির তেমনি নানা ঘটনায় পরিপূর্ণ। আমরা জানি বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনৈতিক ইতিহাসে বারবার রূপান্তর ঘটেছে। হাসান আজিজুল হকের লেখায় ধরা পড়েছে রূপান্তরের সেই চমকপ্রদ ছবি। তাতে শিল্পের নান্দনিকতাবোধ যেমন উপস্থিত, তেমনি তাঁর ব্যক্তিক যন্ত্রণাবোধও প্রবল।