বগুড়ায় সংঘর্ষে শিবিরের দুই নেতা-কর্মীসহ নিহত ৩

জামায়াতের ডাকা গতকাল সকাল-সন্ধ্যা হরতালে ও সরকার দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে জামায়াত-শিবিরের সংঘর্ষে শিবিরের দুই নেতাকর্মীসহ তিনজন নিহত হয়েছেন। শহরের দুটি স্থানে হরতাল বিরোধীদের হামলায় সরকারি আযিযুল হক কলেজ পুরাতন ভবনের ছাত্রশিবিরের সভাপতি আবু রোহানী ও মিজানুর রহমান নামের এক ব্যবসায়ী নিহত হন। ছাত্রবাসে হামলার সময় শিবিরের গুলিবিদ্ধ কর্মী রব্বানী (২৮) বিকালে হাসপাতালে মারা যান। নিহত ব্যবসায়ীকে জামায়াত তাদের কর্মী বলে দাবি করেছে। এ ঘটনায় বিকালে জামায়াত-শিবির সংগঠিত হয়ে শহরের সাতমাথা এলাকায় এসে তাণ্ডব শুরু করলে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ শুরু হয়। শহরের কেন্দ স্থল সাতমাথা চত্বর রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। এদিকে হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে কাল শনিবার সকাল-সন্ধ্যা হরতাল আহবান করেছে জামায়াত। গতকাল রাতেও শহরের বিভিন্ন এলাকায় চোরাগুপ্তা ককটেল হামলা করে জামায়াত-শিবির কর্মীরা। ফলে পুরো শহরে বিরাজ করে আতংকময় পরিস্থিতি। শহরে র্যাব পুলিশকে সহায়তা করতে নওগাঁ থেকে দুই প্লাটুন বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। নিহত ছাত্রশিবির নেতা আবু রোহানী (২২) আযিযুল হক কলেজের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ও শহরতলীর এরুলিয়া মন্ডলপাড়ার আবু বক্করের ছেলে। হরতাল চলাকালে বেলা ১২টার দিকে শহরের ফুলবাড়ি এলাকায় ছাত্রলীগের সঙ্গে ছাত্রশিবিরের সংঘর্ষ হয়। এ সময় রোহানীসহ শিবিরের পাঁচ নেতাকর্মী আহত হন। তাদের হাসপাতালে নেয়ার পর আড়াইটার দিকে চিকিত্সাধীন অবস্থায় মারা যান রোহানী। প্রায় একই সময়ে শহরতলীর সাবগ্রামে হরতাল বিরোধীদের হামলায় নিহত হন মিজানুর রহমান মিজান (২৮) নামের স্থানীয় বাজারের মুরগী হ্যাচারির মালিক। নিহত মিজানের বাড়ি কুমিল্লায়। তিনি বগুড়ার সাবগ্রামে অবস্থিত ভাই ভাই পোল্ট্রি ও হ্যাচারি ফার্ম প্রতিষ্ঠা করে দীর্ঘদিন থেকে এখানে ব্যবসা করে আসছিলেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। তবে স্থানীয় কেউ তার রাজনৈতিক কোন পরিচয় আছে এমনটা নিশ্চিত করেনি। তবে বগুড়া শহর জামায়াতের সেক্রেটারি মাজেদুর রহমান জুয়েল দাবি করেছেন নিহত মিজান তাদের কর্মী। নিহতের ঘটনায় কাল শনিবার সকাল-সন্ধ্যা হরতাল আহবান করেছে জামায়াত। বগুড়ার সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মোকবুল হোসেন জানান, নিহত মিজান কোন রাজনৈতিক দলের কর্মী এমন তথ্য পুলিশের কাছে নেই। তিনি একজন ব্যবসায়ী। তবে হরতাল বিরোধীদের নামে কারা এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে সে ব্যাপারে তদন্ত না করে কোন কিছু বলা সম্ভব নয় । বিকালে জামায়াত-শিবির সংগঠিত হয়ে শহরের সাতমাথা এলাকায় এসে তাণ্ডব শুরু করলে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ শুরু হয়। শহরের কেন্দ্রস্থল সাতমাথা চত্বর রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। সাতমাথা চত্বরে অতিরিক্ত পুলিশ ও র্যাব মোতায়েন করা হলে শহর থেকে পিছু হটে শিবির নেতাকর্মীরা আযিযুল হক কলেজের নতুন ভবন এলাকায় গিয়ে ব্যাপক ভাংচুর চালায়। এক পর্যায়ে তারা ছাত্রলীগ নিয়ন্ত্রিত জুয়েল ভিলা-২ নামে এক ছাত্রাবাসে হামলা চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। পুলিশ ও র্যাব সদস্যরা সেখানে পৌঁছলে আবারো গুলি বিনিময় ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে দলের নেতাকর্মীরা সংগঠিত হয়ে বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে শহরে প্রবেশ করতে গেলে গোহাইল রোডে পুলিশ তাদের বাধা দেয়। বাধা অতিক্রম করতে গেলে পুলিশের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ বাধে। এ সময় উভয়পক্ষের মধ্যে উপর্যুপরি গুলি বিনিময়, কাঁদানে গ্যাস সেল নিক্ষেপ ও ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। এক পর্যায়ে পুলিশ পিছু হটলে সাতমাথা চত্বর জামায়াত-শিবিরের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। জামায়াত-শিবির কর্মীরা সেখানকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সাতমাথা চত্বরে থাকা চ্যানেল আই-এর জেলা প্রতিনিধি রউফ জালালসহ পাঁচ জনের মোটর সাইকেল ভাংচুর করে আগুন ধরিয়ে দেয়। এরপর অতিরিক্ত পুলিশ এসে গুলি ও কাঁদানে গ্যাস সেল নিক্ষেপ করতে করতে ধাওয়া করলে জামায়াত-শিবির কর্মীরা ছত্রভঙ্গ হয়। তারা সেখান থেকে আযিযুল হক কলেজ নতুন ভবনের সামনে গিয়ে ব্যাপক ভাংচুর শুরু করে। এক পর্যায়ে তারা কলেজের দক্ষিণ পাশে অবস্থিত ছাত্রলীগ নিয়ন্ত্রিত জুয়েল ভিলা-২ নামের এক ছাত্রাবাসে হামলা চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। খবর পেয়ে পুলিশ ও র্যাব সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে হামলাকারীদের ধাওয়া করতে গেলে পুনরায় সংঘর্ষ বাধে। এসময় উভয়পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও গুলি বিনিময় হয়। সকালে পুলিশের সাথে জামায়াত-শিবির কর্মীদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ায় পুলিশের দুই সদস্য আহত হয়। এ সময় পুলিশ এক জামায়াত কর্মীকে আটক করলে তাকে ছিনিয়ে নেয় শিবির কর্মীরা। সকাল সাড়ে ৭টায় উপশহর এলাকায় হরতালের সমর্থনে মিছিল বের করে শিবির। এ সময় পুলিশ দুই শিবির কর্মীকে আটক করে। তাদের শিবির কর্মীরা পুলিশের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয়ার সময় পুলিশের দুই সদস্য আহত হন। এ সময় এক পুলিশ সদস্য বাধা দিলে তার কাছ থেকে অস্ত্র ছিনিয়ে নেয় শিবির কর্মীরা। পরে পুলিশ সদস্যরা এগিয়ে আসলে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। তখন ছিনিয়ে নেয়া অস্ত্র ফেলে পালিয়ে যায় হরতালকারীরা। সকাল ৭টায় কলেজের সামনে জামায়াত-শিবির কর্মীরা লাঠিসোটা নিয়ে বিক্ষোভ করে। পরে তারা রাস্তা অবরোধ করে টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ দেখায়। অতিরিক্ত পুলিশ ঘটনাস্থলে এলে তারা চলে যায়। এছাড়া শহরের কলোনী ও ফুলতলা এলাকায় ১০/১২টি গাড়ি ভাংচুর করে জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা। দিনভর বিভিন্নস্থানে মিছিল-পাল্টা মিছিল, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের কারণে পুরো শহরজুড়ে আতংকময় পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। সারা শহরে পুলিশের উপস্থিতিতেই প্রকাশ্যে লাঠিসোঠা হাতে মিছিল করে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা। রাতে শহরের সেউজগাড়ী, শিবির অধ্যুষিত জামিলনগর, এরুলিয়া ও ফুলবাড়ি এলাকায় চোরাগুপ্তা ককটেল হামলা করে শিবির কর্মীরা। র্যাব, পুলিশ ও আর্মড পুলিশ সদস্যরা শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে টহল দেয়। রাত থেকেই বিজিবি সদস্যরা তাদের সাথে শহরে টহল দিতে শুরু করেছে। বগুড়ার পুলিশ সুপার মোজাম্মেল হক জানান, শহরে দুটি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে । যারা এর সাথে জড়িত তদন্তের মাধ্যমে তাদের চিহ্নিত করে অবশ্যই গ্রেফতার করা হবে। তাই বলে কাউকে বিশৃংখল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে দেয়া হবে না। তিনি আরো জানান, জামায়াত-শিবিরের লোকজন পুলিশের উপর ককটেল নিক্ষেপ করে বিশৃংখল পরিবেশ সৃষ্টি করার অপচেষ্টা করেছে। তাদের বেআইনি কর্মকাণ্ড কঠোরভাবে দমন করবে আইন- শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী।