ভোর বেলাতেই সলতে পাকানো

পহেলা ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২। সে বছর ঢাকায় মাঘের শীতটা বেশি মাত্রায় এসেছিল। মাঘের সে শীত বাঘের গায়ে লাগতে পারে, কিন্তু ঢাকার ছাত্রদের গায়ে তেমন লাগেনি। কারণ একটাই—সাতাশে জানুয়ারি পল্টন ময়দানে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীন তার দীর্ঘ বক্তৃতায় রাষ্ট্রভাষা প্রসঙ্গে বলেন যে, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দুই হতে যাচ্ছে। এটুকু বলেই তিনি থামেননি। প্রসঙ্গক্রমে তাদের কায়েদে আজমের ভাষা বিষয়ক মতামত, প্রাদেশিকতা, এক রাষ্ট্রে এক রাষ্ট্রভাষা ইত্যাদি বিষয়েও কথা বলেন তিনি এবং উর্দু বিরোধীদের ‘পাকিস্তানের দুশমন’ বলে ঘোষণা করেন। যেমনটা করেছিলেন, পাকিস্তানের প্রথম গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ১৯৪৮ মার্চে ঢাকা সফরে এসে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বাঙালি মুসলমানের মধ্যে যে রাজনৈতিক আবেগ মূলত ১৯৪৫ সালের পর থেকে বিশেষ করে ১৯৪৬-৪৭ এ দেখা গিয়েছিল সম্ভবত সেই ঘটনার ওপর ভিত্তি করে পাকিস্তানের শীর্ষ নেতাদের (বাঙালি-অবাঙালি) মনে এ বিশ্বাস জন্মেছিল, তারা রাজনীতি ক্ষেত্রে ন্যায়-অন্যায় যাই করুন না কেন বাঙালি মুসলমান তাতে বাধা দেবে না। সর্বোপরি মাথার ওপর বিরাট ছাতা ‘কায়েদে আজম’ যার নামে পাকিস্তানবাদী মানুষ মন্ত্রমুগ্ধ। আর এ বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে মুসলিম লীগের বড় বড় নেতা এবং তাদের পরিচালিত শাসনতন্ত্র শুরু থেকেই তাদের যে স্বার্থ পালনের চেষ্টা করেছেন তা ছিল পশ্চিম পাকিস্তানি এলিট শ্রেণীর—তারা ভারত থেকে আগত উচ্চবর্গীয়গণ এবং পাঞ্জাবি-সিন্ধি-এলিটগোষ্ঠী। ভূস্বামী-প্রধান পশ্চিম পাকিস্তান, নব্য-শিল্পপতি প্রধান পশ্চিম পাকিস্তানের স্বার্থরক্ষার প্রশ্নটাই ছিল সবচাইতে বড়। সেই সঙ্গে ছিল সামরিকখাতের স্বার্থ যেখানে প্রধানত পাঞ্জাবি প্রাধান্য। পরবর্তী সময়ে এই সামরিক গোষ্ঠীই অধিকাংশ সময় পাকিস্তান শাসন করেছে। পর্দার আড়ালে কথিত বাইশ পরিবার সবসময় নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করতে পারেনি। এমন এক অগণতান্ত্রিক বিশ্বাসের পুঁজি নিয়ে জিন্নাহসহ মুসলিম লীগ নেতাদের রাজনৈতিক যাত্রা, যখন মোটামুটি নিশ্চিত হওয়া গেছে যে ভারত বিভাগের মধ্য দিয়ে পাকিস্তান ডোমিনিয়ন জন্ম নিতে যাচ্ছে। বাংলা ও বাঙালিকে শীর্ষ লীগ নেতারা কী চোখে দেখেন তা যেমন আগে তেমনি তখনো বিশেষ বিশেষ ঘটনায় বোঝা গেছে। কিন্তু পাকিস্তানের স্বপ্নে মুগ্ধ বাঙালি মুসলমান তা সহজে বুঝতে চায়নি, বুঝতে পারেনি। কিন্তু সব কিছুরই ব্যতিক্রম থাকে। এক্ষেত্রেও তাই ছিল। বিভাগ পূর্ব ভারতীয় মুসলিম রাজনীতিতে অনুগ্র ও সহিষ্ণু নেতা হিসাবে পরিচিত মুক্তপ্রদেশের বাসিন্দা চৌধুরী খালিকুজ্জামানের মতো একজন রাজনীতিকও হবু পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষার প্রসঙ্গে বলেন যে, উর্দুই পাকিস্তানের জাতীয় ভাষা হবে। তখনো পাকিস্তান জন্ম নেয়নি—জন্মের আগেই রামায়ণ লেখা শুরু করেছিলেন মুসলিম লীগ নেতৃবৃন্দ। তবে ঐ যে ব্যতিক্রম বলে কথা। পাকিস্তান নিয়ে মুগ্ধ জাতি বাঙালি মুসলমানের মধ্যে গণতন্ত্রী, সমাজবাদী বা ভিন্নমতাবলম্বী মানুষও ছিলেন—মূলত শিক্ষিত শ্রেণীতে। বাঙালির মাতৃভাষা বাংলার অধিকার ও তার গুরুত্ব সম্পর্কে তারা যথেষ্ট সচেতন ছিলেন। বলতে হয়, হিন্দির বিরুদ্ধে উর্দুর অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে উর্দুভাষী খালিকুজ্জামান ১৯৪৭ সালের ১৭ই মে তার বক্তৃতায় দাবি তোলেন ভাবী পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা প্রসঙ্গে। একই দাবি তুলতে হয়েছে ভাবী পাকিস্তানে উর্দুর বিপক্ষে বাংলার অধিকার নিয়ে বাঙালি ভাষাপ্রেমীদের। বিষয়টা অনেকখানি সন্ধ্যেবেলার সলতে পাকানোর কাজ ভোর বেলায় শুরু করার মতো। উর্দুর দাবি প্রসঙ্গে তাই প্রাদেশিক রাজধানী কলকাতায় কয়েকজন বাঙালি মুসলমান মূলত লেখক, কবি, সাংবাদিক বাংলাভাষার অধিকার নিয়ে কলম ধরেন। তাদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য লেখক ও সাংবাদিক আবদুল হক যিনি জুন মাসে ‘ইত্তেহাদ’ ও ‘আজাদ’ পত্রিকায় প্রবন্ধ লিখে রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে গ্রহণযোগ্য যুক্তিতথ্য তুলে ধরেন। এ বিষয়ে লেখেন আরো কয়েকজন। সাপ্তাহিক ‘মিল্লাত’ পত্রিকা লেখে বাংলার পক্ষে সম্পাদকীয়। আর জুলাই মাসে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ‘আজাদ’ পত্রিকায় লেখেন প্রবন্ধ। এ প্রবন্ধের লক্ষ্য আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. জিয়াউদ্দিন আহমদের প্রকাশ্য বিবৃতি হবু পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দুর পক্ষে। এভাবে পাকিস্তান সৃষ্টি হওয়ার আগেই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়ে যায়। আর একথাও সত্য যে তখন, সেই মুহূর্তে উর্দুর পক্ষেই সমর্থন ছিল বেশি। যেমন—কবি গোলাম মোস্তফা বা সাংবাদিক মুজীবুর রহমান খাঁ’র মতো অনেক শিক্ষিত মুসলমান। তাদের কারো কারো বোধোদয় হতে সময় লেগেছে, আবার কারোর একেবারেই হয়নি। আর মুসলিম লীগের রাজনৈতিক নেতা সবাই তখন উর্দুর পক্ষে, হয়তো জিন্নাহ সাহেবকে মান্য করে। এখানে ব্যতিক্রম হাতেগোনা দু’চারজন বিশিষ্ট রাজনীতিক। যেমন—ঢাকার কামরুদ্দীন আহমদ যিনি ১৯৪৭ সালের জুলাইয়ে ঢাকায় ‘গণআজাদী লীগ’ নামে একটি অসাম্প্রদায়িক গণতন্ত্রী রাজনৈতিক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। আবদুল হকরা কি তখন ১৯৪৭ সালের জুন-জুলাইয়ে ভাবতে পেরেছিলেন যে রাষ্ট্রভাষার প্রশ্ন নিয়ে ভোরবেলায় সলতে পাকানোর কাজ অনেক বেলা অবধি চালিয়ে যেতে হবে? চালিয়ে যাবেন বাংলা ভাষাপ্রেমী অধ্যাপক, শিক্ষক, ছাত্র ও অনেকে? হয়তো ভাবতে পারেননি তারা। কারণ এমনটা তারা আশা করেননি। বিশেষ করে জননন্দিত নেতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর কাছ থেকে যিনি ১৯৪৮ সালে মার্চে ঢাকা সফরে এসে কঠোর দৃঢ়তায় ঘোষণা করেন যে উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা, অন্য কোনো ভাষা নয়। ভাষা আন্দোলনের ঘটকদের তিনি চিহ্নিত করেছিলেন ‘পাকিস্তানের দুশমন’ দেশদ্রোহী হিসাবে। ইতিহাস অবশ্য তার জন্য ভিন্ন কথাই লিখেছে। কারণ বাঙালির শরীরে কিছু ‘মীর জাফরি বদরক্ত’ থাকলেও ভিন্নগ্রুপের রক্তও কম ছিল না। তা—না হলে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দু’তিন মাসের মধ্যে বাংলা রাষ্ট্রভাষার পক্ষে তাত্ত্বিক সমর্থন, এমনকি রাজপথে বিক্ষোভ দেখা দেবে কেন? বিশেষ করে যখন পাকিস্তান নিয়ে ব্যাপক মুসলমান জনসমাজে এক ধরনের উন্মাদনা বিরাজ করছে? এমনকি সংখ্যাগরিষ্ঠ শিক্ষিত শ্রেণীতেও। এ অবস্থায়ও দু’চারজন শিক্ষক অধ্যাপক বাংলা রাষ্ট্রভাষার পক্ষে কলম ধরেছেন। যেমন—ড. মুহম্মদ এনামুল হক নারায়ণগঞ্জ থেকে প্রকাশিত মাসিকপত্র ‘কৃষ্টি’তে (১৩৫৪) বাংলার পক্ষে প্রবন্ধ লেখেন। লেখেন ড. কাজী মোতাহার হোসেন, আবুল মনসুর আহমদ, অধ্যাপক আবুল কাসেম প্রমুখ। কিছু কিছু রূঢ় সত্যের উচ্চারণ ছিল কোনো কোনো প্রবন্ধের মধ্যে। ব্যাপক বাংলা-বিরোধিতার মধ্যেই এই ছোট্ট বাংলাপ্রেমী ধারাটি ক্রমশ শক্তি অর্জন করতে থাকে। বায়ান্ন ফেব্রুয়ারির প্রথম দিনটি এই মাতৃভাষা—রাষ্ট্রভাষার ধারাবাহিকতার ফসল। সে দিনটিও ছিল ঐ সলতে পাকানোর মতই একটি দিন। ছাত্রাবাসের বাসিন্দাদের মনে ধিকিধিকি জ্বলা ক্ষোভ। ঐ দিনটিতে বিশেষ কিছু না ঘটলেও কিছু ঘটানোর প্রস্তুতি ছিল মনে। ছিল ধারাবাহিকতার দিনপঞ্জিতে পুরনো পাতাগুলো উল্টে দেখার। সবার না হলেও কারো কারো মনে এমন ভাবনারই উথাল-পাতাল চলেছে তখন। কারো মনে পড়েছে সাতচল্লিশের বিক্ষোভ পেরিয়ে আটচল্লিশের মার্চে রাজপথে নামা দিনগুলো। পহেলা ফেব্রুয়ারির দিনলিপিতে ভুক্তির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল হাতেগোনা কয়েকটি সংবাদপত্রে প্রকাশিত ভাষা আন্দোলন সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠনের খবর। যেসব ছাত্র বার লাইব্রেরি হলের কর্মীসভায় যোগ দিতে পারেনি তারাও মনোযোগের সঙ্গে পত্রিকায় পরিবেশিত সে খবর পড়েছে। রাষ্ট্রভাষার সমস্যা কীভাবে মিটবে তা নিয়ে কৌতূহল এবং আগ্রহ দুই-ই দেখা গেছে। বাহান্ন সালে পৌঁছে রাষ্ট্রভাষা বাংলা নিয়ে শিক্ষিত সমাজের বৃহত্ অংশে পূর্বেকার অনীহা অনেকাংশে মুছে গিয়েছিল। এদিক থেকে ছাত্রসমাজ ছিল অগ্রগামী। লেখক: ভাষা সংগ্রামী ও প্রাবন্ধিক