‘আমরা ঢাল তলোয়ারহীন নিধিরাম সর্দার’
প্রকাশ : ৩১ জানুয়ারি ২০১৩, ২২:২৫
‘আমাদের অবস্থা ঢাল তলোয়ারহীন নিধিরাম সর্দারের মতো’-এ স্বীকারোক্তি বাংলাদেশ রেলওয়ে পুলিশের একজন শীর্ষ কর্মকর্তার। তিনি বলেছেন, ট্রেন যাত্রীদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার জন্য যতজন নিরাপত্তারক্ষী দরকার তা রেল পুলিশের হাতে নেই। নেই কোন আধুনিক সরঞ্জাম। এ নিয়ে কারো নজরও নেই। আর এভাবেই চলে আসছে বছরের পর বছর। আর সব বদনাম পোহাতে হয় রেল পুলিশকে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ একটু আন্তরিক হলে জিআরপি (গর্ভমেন্ট রেলওয়ে পুলিশ) আধুনিকতা ও গতিশীল করা সম্ভব হতো।
গত ৫ মাসে রেলওয়ের বিভিন্ন রুটে ডাকাত ও ছিনতাইকারীদের হাতে নিহত হয়েছেন ৪৪ জন যাত্রী। তাদেরকে চলন্ত ট্রেন থেকে ফেলে দিয়ে হত্যা করা হয়। রয়েছে অজ্ঞান পার্টি, আর পকেটমারদের সীমাহীন দৌরাত্ম্য। অভিযোগ রয়েছে, যাত্রীদের নিরাপত্তা রেল পুলিশের কোনো তত্পরতা দেখা যায় না। বরং তারা অপরাধী ধরার চেয়ে তাদের কাছ থেকে টু পাইস কামানোতেই বেশি ব্যস্ত থাকে।
রেলওয়ে পুলিশ সদর দফতর থেকে প্রাপ্য তথ্যে জানায় যায়, রেলওয়ে পুলিশের মঞ্জুরিকৃত জনবলের সংখ্যা ১ হাজার ৬২৩ জন। সেখানে রয়েছে ১ হাজার ৩৭৬ সদস্য। তারাই রেলওয়ের ( দুই অঞ্চলের) প্রতিদিন চলাচলকারী ২৮৮ টি ট্রেনের প্রায় আড়াই লাখ রেল যাত্রীর নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করে থাকে। এরমধ্যে পূর্বাঞ্চল রেলে রয়েছে ৬৯৮ জন সদস্য। যারা ১৭৫ টি ট্রেনের লক্ষাধিক যাত্রীর নিরাপত্তা বিধান করে । পশ্চিমাঞ্চল রেলের ১১৩টি ট্রেনের প্রায় এক লাখ ২০ হাজার যাত্রীর নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছে ৬৭৮ জন সদস্য। জনবলের অভাবে রেল যাত্রীদের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দিতে পারছে না স্বীকার করেছেন রেলওয়ে পুলিশের ডিআইজি। একটি আন্ত:নগর ট্রেনের ৮ থেকে ৯শ’ যাত্রীর নিরাপত্তায় মাত্র চারজন পুলিশ সদস্য।
অপরদিকে রেল পুলিশ ছাড়া রয়েছে রেলের নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনী। এ বাহিনীর দায়িত্ব শুধু রেলের সম্পদ পাহারা। আর রেলওয়ে পুলিশ ট্রেন, স্টেশন এবং রেলওয়ে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই প্রতিরোধ, লাশ উদ্ধার এবং রেল যাত্রীদের নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করে। ফলে অপরাধ দমন, মামলা তদন্তের পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক রেল যাত্রীর নিরাপত্তায় নিশ্চিত করতে প্রতিনিয়ত হিমশিম খেয়ে হচ্ছে জিআরপির। রেলওয়ে থানায় রয়েছে মাত্র দুইজন সাব-ইন্সপেক্ট। মামলা তদন্ত করতে হয় তাদেরকে। আর এ অবস্থায় প্রতিটি থানায় সর্বদা তদন্তের অপেক্ষায় ঝুলে থাকে এক থেকে তিন শতাধিক মামলা।
রেলওয়ের ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি সোহরাব হোসেন বলেন, জিআরপি চাইলেও তো আধুনিক হতে পারবে না। কারণ পুলিশ সদস্যরা এখানে কাজ করে পেশনে। কয়েক বছর আগেও জিআরপি যে অবস্থানে ছিল এখনও সেই অবস্থায় রয়ে গেছে। তবে তিনি বলেন, জিআরপি থানা গুলো আপগ্রেড করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
রেলে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যের ওয়ারলেস সেট প্রদান প্রসঙ্গে তিনি কোন মন্তব্য না করে বলেন, ওয়ারলেস সেট না পেলেও টর্চ লাইট সরবরাহ করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, রেলওয়ে পুলিশের জনবল সংকট থাকায় প্রতি ট্রেনে পর্যাপ্ত পুলিশ দেয়া সম্ভব না। এ কারণেই শুধুমাত্র রাতের ট্রেনগুলোতেই পুলিশ থাকে। ছিনতাইকারী ও পকেটমারের ব্যাপারে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময় বেশ কয়েকটি চক্রকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অপরাধ প্রবন এলাকা চিহ্নিত করে কয়েকটি রুটে পুলিশের টহল বাড়ানো হয়েছে।
পুলিশ সদস্যরা মনে করেন, রেলওয়ে পোস্টিং মানে শাস্তিমূলক, এমন প্রশ্নের ব্যাপারে তিনি বলেন, এ ধরনের একটি অপপ্রচার রয়েছে। যার ফলে অনেক পুলিশ সদস্যদের মধ্যে হতাশা রয়েছে।
রেলওয়ের নিরাপত্তা বাহনীর ঢাকা বিভাগীয় প্রধান কমানড্যান্ট ইকবাল হোসেন বলেন, রেলের সম্পদ পাহারার পাশাপাশি রেলের কোচ, বুকিং মালামাল স্কট করে গন্তব্যে পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব পালন করে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা। নিরাপত্তা বাহিনীর দুইটি সদর দফতরের নিয়ন্ত্রণে চারটি ডিভিশন রয়েছে।
জিআরপি থানা ঃ সেই বৃটিশ আমল থেকে এখনও রেলওয়ে থানার অফিসার ইনচার্জের দায়িত্ব পালন করেন একজন সাব-ইন্সপেক্টর পদমর্যার কর্মকর্তা । শুধুমাত্র ঢাকা ও খুলনা জিআরপি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে দুইজন ইন্সপেক্টর দায়িত্ব পালন করছেন। আর একজন ডিআইজির নেতৃত্বে রেলওয়ে পুলিশ পরিচালিত হচ্ছে। রেলওয়ের চট্টগ্রাম জোনের এলাকার জন্য জিআরপি থানা ১২টি। থানা এলাকা প্রায় একশত কিলোমিটার। ১৮টি ফাঁড়ি । প্রতিটি থানায় রয়েছে দু’জন সাব-ইন্সপেক্টর ও ২০ জন কনস্টেবল। তবে তাদের সহায়তার জন্য প্রতি থানায় রয়েছে ১৫ জন নিরস্ত্র আনসার। আর সৈয়দপুর জোনে থানা সংখ্যা ৮টি ও ১৭টি ফাঁড়ি রয়েছে। চট্টগ্রামের থানাগুলো হচ্ছে চট্টগ্রাম রেলওয়ে, লাকসাম, আখাউড়া, শ্রীমঙ্গল, ভৈরব, ময়মনসিংহ, জামালপুর ও ঢাকা। অপর দিকে সৈয়দপুরে পার্বতীপুর, লালমনিরহাট, বোনারপাড়া, রাজবাড়ী, পোড়াদহ, খুলনা ও রাজশাহী।