জুনের পর ১৮ দলের তীব্র আন্দোলন
প্রকাশ : ৩১ জানুয়ারি ২০১৩, ২২:৩২
সরকার বাধ্য না করলে কিংবা বড় ধরনের কোনো ঘটনা না ঘটলে আগামী জুন মাসের আগে লাগাতার কর্মসূচিতে না যাওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট। মাধ্যমিক পরীক্ষার (এসএসসি) বিষয়টি বিবেচনায় রেখে চলতি ফেব্রুয়ারি মাসেও আন্দোলনের বড় কোনো কর্মসূচি দেয়া হচ্ছে না। তীব্র আন্দোলনের জন্য জুন-জুলাইকে আপাতত টার্গেট করছে বিরোধী জোট। সেক্ষেত্রে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালে জুনের মধ্যে জাতীয় সংসদে বিল এনে পাস করার জন্য আবারও আল্টিমেটাম দেয়ার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছে ১৮ দল। এছাড়া কোনো অবস্থাতেই বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বা তার দলীয় সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচনে অংশ না নেয়ার বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করেছেন জোট নেতারা।
গত ২৮ জানুয়ারি সোমবার রাতে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ১৮ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতাদের বৈঠকে এসব সিদ্ধান্ত ও ঐকমত্য হয় বলে জানা গেছে। তবে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তাত্ক্ষণিক হরতাল, অবরোধের মত কর্মসূচিও দেয়া যেতে পারে বলে আগাম মত দিয়ে রেখেছেন জোট নেতারা।
বৈঠকে অংশ নেয়া ১৮ দলীয় জোটের একটি শরিক দলের প্রধান ইত্তেফাককে জানান, ঐ বৈঠকে বিরোধী দলীয় নেতা খালেদা জিয়া বলেছেন, আমরা চাই বর্তমান সরকার তার মেয়াদ পূর্ণ করুক। কোনো তৃতীয় বা অগণতান্ত্রিক শক্তির উত্থান ঘটুক এটাও আমরা চাই না। আমরা চাই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর। কিন্তু বর্তমানে যে সাংবিধানিক কাঠামো তাতে সরকার আমাদের দাবি না মানলে শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়াসহ পুরো পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করবে। এজন্য অবাধ নির্বাচনের স্বার্থে সংবিধানে আবার সংশোধনী এনে নির্দলীয় সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল করতে হবে। আর এটি করতে হবে বর্তমান সরকারকেই, কারণ সংসদে তাদের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে।
এই প্রসঙ্গে খালেদা জিয়া বৈঠকে আরও বলেছেন, সংসদের চলতি অধিবেশনে তো সরকার তত্ত্বাবধায়কের বিল আনছে না। এরপর জুনে বাজেট অধিবেশন শুরু হবে। বাজেট অধিবেশনের পর আগস্ট-সেপ্টেম্বরে যে অধিবেশনটি বসবে সেটি চলতি নবম সংসদের শেষ অধিবেশন হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। এজন্য জুনের মধ্যেই (বাজেট অধিবেশনে) সংসদে বিল এনে তত্ত্বাবধায়ক পুনর্বহালে সরকারকে আমাদের বাধ্য করতে হবে। তখন তীব্র আন্দোলনে যেতে হবে আমাদের।
বৈঠকে অংশগ্রহণকারী ১৮ দল শরিক ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি) চেয়ারম্যান শেখ শওকত হোসেন নিলু বিএনপি চেয়ারপারসনের এই বক্তব্যের কথা স্বীকার করে ইত্তেফাককে জানান, ১৮ দলীয় জোট নেত্রীর উপরোক্ত বক্তব্য ও ব্যাখ্যার সঙ্গে উপস্থিত জোট নেতারা সবাই একমত পোষণ করেছেন।
জানা গেছে, চলতি মাসেই সরকারকে আল্টিমেটাম দিয়ে জুনের মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা পুনর্বহালের বিল পাসের জন্য ১৮ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে সরকারকে সময় বেঁধে দেয়া হতে পারে। কোনো কারণে এখনই না হলে এই আল্টিমেটামের কথা সংসদের চলতি অধিবেশন শেষ হওয়ার পর যে কোনোদিন ঘোষণা করতে পারে।
প্রসঙ্গত, ২০১১ সালের ৩০ জুন সংসদে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর বিল পাসের মধ্য দিয়ে বিলুপ্তি ঘটে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার। এরপর থেকেই বিরোধী দল তা পুনর্বহালের দাবি জানিয়ে আসছে। গত বছরের ১২ জুন বিএনপির সমাবেশ থেকে খালেদা জিয়া তত্ত্বাবধায়ক পুনর্বহালে ঐ বছরের ১০ জুন পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়ে সরকারকে প্রথম আল্টিমেটাম দেন। দাবি পূরণ না হলেও এরপর নির্দিষ্ট সময়সীমা উল্লেখ করে আর কোনো আল্টিমেটাম দেয়নি। এবারও জুনের মধ্যেই তত্ত্বাবধায়ক পুনর্বহালে আল্টিমেটাম দিতে যাচ্ছে বিরোধী দল।
এদিকে সোমবার রাতে ১৮ দলের বৈঠক শেষে বিএনপির সমন্বয়ক তরিকুল ইসলাম সাংবাদিক সম্মেলনে জানিয়েছেন, চলমান আন্দোলনের পরবর্তী কর্মসূচি কী হবে সে ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে কয়েকদিনের মধ্যেই গণমাধ্যমকে জানানো হবে। তবে গতকাল পর্যন্ত ১৮ দল নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেনি।
জানা গেছে, এসএসসি পরীক্ষা থাকায় ফেব্রুয়ারি মাসে বড় কোনো কর্মসূচি না দেয়ার বিষয়ে একমত হয়েছেন ১৮ দল নেতারা। চলতি মাসের জন্য সভা-সমাবেশ, গণসংযোগ, মানববন্ধন, মানবপ্রাচীর ও অবস্থান কর্মসূচির মতো অহিংস কর্মসূচি দেয়া হবে। তবে নির্দলীয় সরকারের দাবিতে চলতি মাসে সারাদেশে উপজেলা পর্যায়ে একদিনে অবস্থান কর্মসূচির ঘোষণা আসতে পারে। সোমবার রাতের বৈঠকে ১৮ দল শরিক জাগপা সভাপতি শফিউল আলম প্রধান এই অবস্থান কর্মসূচির প্রস্তাব দিলে খালেদা জিয়াসহ উপস্থিত জোটের অন্য নেতারা তাতে সম্মতি দেন।
আন্দোলনের নতুন কর্মসূচি সম্পর্কে সোমবারের বৈঠকে ১৮ দলের আরেক শরিক বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজেপি চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিভ রহমান পার্থ বলেছেন, আমাদের প্রধান দাবি নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকার। জুনে বাজেট অধিবেশনেই যেন তা পুনর্বহাল করা হয় সেজন্য আমরা সরকারকে বাধ্য করব। সরকারকে বাধ্য করতে তখনই তীব্র আন্দোলন করতে হবে। এর আগে আন্দোলনের বড় কর্মসূচি দেয়া হলে তাতে একদিকে যেমন বিরোধী জোটের শক্তি ক্ষয় হবে, তেমনি অন্যদিকে নেতা-কর্মীদের আরও অনেককে বিভিন্ন অজুহাতে সরকার জেলে ঢুকাবে। ব্যারিস্টার পার্থের এই বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত করেননি খালেদা জিয়াও।
১৮ দলের নতুন কর্মসূচি কবে ঘোষণা করা হবে, এ ব্যাপারে বিএনপির যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী গতকাল সাংবাদিকদের জানান, এসএসসি পরীক্ষার কথা বিবেচনায় রেখে কর্মসূচি প্রণয়ন করা হয়েছে। যে কোনো সময় তা ঘোষণা করা হবে।