নারায়ণগঞ্জে ৪ দিনে তিন গুদামে
আগুন :দুর্ঘটনা না নাশকতা?
হাবিবুর রহমান বাদল, নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশ : ০১ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২০:২৭
নারায়ণগঞ্জে একের পর এক পাটের গুদামে আগুন লাগিয়ে জ্বালিয়ে দেয়ার ঘটনাকে পাট ব্যবসায়ীরা নাশকতা বলে মনে করছেন। ৪ দিনের মধ্যে দেশের প্রধান পাট ব্যবসার কেন্দ্র নারায়ণগঞ্জ মোকামে তিনটি প্রতিষ্ঠানের গুদামে আগুন লেগে প্রায় ৫৫ হাজার মণ পাট পুড়ে গেছে বলে দাবি করেছেন প্রতিষ্ঠানের মালিকরা। তবে প্রত্যক্ষদর্শী ও পাট ব্যবসায়ীদের মতে এতো বিপুল পরিমাণ পাট আগুনে পুড়ে যাওয়া গুদামগুলোতে মালিকদের দাবিকৃত পাট মজুদ ছিল না। তারা জানান, বর্তমানে দেশের পাটের বাজার দর কমে যাওয়ায় এবং ব্যাংকের ঋণ মওকুফের সুবিধা গ্রহণের জন্য পাটের গুদামগুলোতে আগুন লাগানো হয়েছে। এর ফলে কমপক্ষে কোটি টাকার পাট পুড়ে গেছে। আইন অনুযায়ী পাটের গুদামে আগুন লাগার সাথে সাথে সংশ্লিষ্ট মালিক-কর্মচারীদের আটক করার নিয়ম থাকলেও এক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসন রহস্যজনক ভূমিকা পালন করছে। জানা গেছে তিনটি গুদামেই মজুদ পাটের বিপরীতে বীমা করা ছিল এবং ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ টাকার ঋণ রয়েছে। তিনটি প্রতিষ্ঠানের মালিকরাই এখন পলাতক বলে জানা গেছে।
২৬ জানুয়ারি সকালে সিদ্ধিরগঞ্জের গোদনাইল এলাকায় কো-অপারেটিভ সোসাইটির ভাড়াটিয়া উষা জুট বেলিং-এর গুদামে আগুন লেগে প্রায় ১০ হাজার মণ পাট পুড়ে গেছে বলে দাবি করেন প্রতিষ্ঠানটির মালিক ইকবাল হোসেন। জানা গেছে, এ প্রতিষ্ঠানটির মজুদ পাটের বিপরীতে দেড় কোটি টাকা বীমা করা ছিল। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন মালিকদের দাবি অনুযায়ী ১০ হাজার মণ পাট এ গুদামটিতে মজুদ ছিল না। একারণে স্থানীয় সাংবাদিকরা খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে মালিকপক্ষের সন্ত্রাসীদের হামলায় ৫ জন সাংবাদিক আহত হন। সাংবাদিকদের দাবির মুখে পুলিশ কো-অপারেটিভ সোসাইটির চেয়ারম্যান আবুল কাশেমকে আটক করলেও রাতে তাকে ছেড়ে দেয়া হয়। নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা আবদুর রাজ্জাক জানান তদন্ত শেষ না করা পর্যন্ত পুড়ে যাওয়া পাটের ক্ষতির পরিমাণ সঠিক করে বলা যাবে না। প্রত্যক্ষদর্শী পাট গুদামের শ্রমিক সুলতান মিয়া জানান, তিনি গুদামে দুই বছর যাবত্ কাজ করে । এখানে ১০ হাজার মণ পাট মজুদ করা সম্ভব না। তার মতে, গুদামের ভেতর কোন বৈদ্যুতিক সংযোগ ছিল না। সেজন্য বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে গুদামে আগুন লাগার কোন সুযোগ নেই। পরিকল্পিতভাবে আগুন লাগানো হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
উষা জুট বেলিং-এর আগুন না নিভতেই মঙ্গলবার মাত্র এক কিলোমিটার দূরত্বে হাজীগঞ্জ এম সার্কাসে এলাকায় অবস্থিত জোহা ব্রাদার্সের ভেতরে একটি পাটের গুদামে আগুন লাগে। জোহা ব্রাদার্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইফতেখার হোসেন জানান, ৯০০০ বর্গফুটের এই গুদামটির মাঝখানে বেড়া দিয়ে দুইপাশের একদিকে বাসুদেব সাহার মালিকানাধীন ইন্টারন্যাশনাল জুট ট্রেডার্স এবং অপর পাশে মাধব পালের মালিকানাধীন পাল এন্ড সন্স ভাড়া নেয়। তিনি জানান ঐদিন সকালে ইন্টারন্যাশনাল জুট ট্রেডার্স গুদাম থেকে পাট বের করছিল। তাদের সামনেই আগুনের সূত্রপাত হয়। তবে ইন্টারন্যাশনাল জুট ট্রেডার্সের শ্রমিকরা জানান পাল এন্ড সন্সের গুদাম থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। তারা জানান,পাল এন্ড সন্স এ মৌসুমে নতুন পাট ক্রয় করেনি। গত মৌসুমের পাট মজুদ ছিল। তবে দুইটি প্রতিষ্ঠানের মালিকদের দাবি তাদের গুদামে প্রায় ৩০হাজার মণ পাট মজুদ ছিল। এরা দু’জনেই অগ্রণী ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছেন। এর মধ্যে ইন্টারন্যাশনাল জুট ট্রেডার্সের নামে ২ কোটি এবং পাল এন্ড সন্সের নামে ২ কোটি টাকা ঋণ রয়েছে। মালিকপক্ষের দাবি আগুনে দুইটি প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৩০ হাজার মণ পাট পুড়ে গেছে যার আনুমানিক মূল্য কোটি টাকা হবে। কিন্তু প্রত্যক্ষদর্শী পাট শ্রমিকরা জানান, দুইটি গুদামে ১০ হাজার মণের বেশি পাট মজুদ ছিল না। জোহা ব্রাদার্সের ভেতরে গিয়ে দেখা যায় সেখানে অন্তত ৪০টি পাটের গুদাম আছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন পাট রপ্তানিকারক জানান, পাটের দাম কমে যাওয়ায় এখন একের পর এক পাটের গুদামে আগুন লাগিয়ে দেয়া হচ্ছে। প্রবীণ এই পাট ব্যবসায়ী জানান, পাটের গুদামে এখন যেভাবে আগুন লাগানো হচ্ছে, এটি নাশকতা ছাড়া আর কিছু নয়।তিনি জানান, ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধুর সময় একইভাবে পাটের গুদামে আগুন লাগিয়ে দেশের পাটশিল্পকে ধংস করার পাঁয়তারা চলে। তখন বঙ্গবন্ধু কঠোর আইন প্রণয়ন করে পাটশিল্পকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন। তিনি অভিযোগ করেন, পুলিশ কিংবা প্রশাসন নারায়ণগঞ্জে পরপর তিনটি পাটের গুদামে আগুন লাগার পরও কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।
নারায়ণগঞ্জের পাট ব্যবসায়ী ইয়াসিন মিয়া জানান, পাটের বাজার কমে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরা ব্যাংক ঋণ নিয়ে বিপাকে পড়ে আছে। একারণে আগুনের ঘটনা ঘটছে। এটা তিনি পরিকল্পিত বলে মনে করছেন। মজুদের সাথে পাটের গড়মিল প্রসঙ্গে তিনি এ ক্ষেত্রে ব্যাংকের তদারকির অভাবকেই দায়ী করলেন। এদিকে পাল এন্ড সন্সের অপর একটি মজুদ গুদামে গত ৪ নভেম্বর আগুন লাগে। একই প্রতিষ্ঠানের গুদামে তিন মাসের মধ্যে পুনরায় আগুন লাগাকে ব্যবসায়ীরা রহস্যজনক বলে মনে করছেন।
নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের উপ-পরিচালক সাইফুল ইসলাম জানান,পাটের গুদামে বৈদ্যুতিক সংযোগ থাকে না। সুতরাং শর্ট সার্কিট থেকে সেখানে আগুন লাগার কোন সম্ভাবনা নেই। বাংলাদেশ জুট এসোসিয়েশনের (বিজেএ) সাবেক সভাপতি রেজাউল করিম বলেন পাটের গুদামে আগুন লাগিয়ে দেশের সম্পদ নষ্ট করাকে কঠোরভাবে দমন করার জন্য প্রশাসনের প্রতি আহবান জানান।
নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মঞ্জুর কাদের জানান, থানায় এ বিষয়ে দুইটি সাধারণ ডায়েরি হয়েছে। মালিকপক্ষের কাউকে পাওয়া যায়নি বলে আটক করা সম্ভব হয়নি।