সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে চাই সুশিক্ষিত ছাত্রসমাজ
প্রকাশ : ০১ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২১:৪৯
আজকের ছাত্রসমাজই আগামী দিনে জাতির কাঙ্ক্ষিত কর্ণধার। কোনো দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের মূল চালিকা শক্তি হলো সে দেশের তরুণ ছাত্রসমাজ। যে জাতি যত বেশি সুশিক্ষিত সে জাতি তত বেশি উন্নত। তাই আজকে আমাদের ছাত্রসমাজ যে শিক্ষা গ্রহণ করবে আগামী দিনের জাতীয় নেতৃত্বে তারই প্রতিফলন ঘটবে। আজ ছাত্ররা যদি সুশিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়ে কেবল সনদ সর্বস্ব শিক্ষার পিছনে দৌড়ায়, তবে ভবিষ্যতের জাতীয় নেতৃত্বে মেধা ও যোগ্যতার সংকট দেখা দিতে পারে। সুশিক্ষার কথা বলছি এ কারণে যে, আমাদের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় পাস করা বা ভালো ফলাফল করা কোনো কঠিন ব্যাপার নয়। দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ থেকে ডিগ্রি লাভের পরও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে আমরা তেমন ভূমিকা রাখতে পারছি না। উপরন্তু দেশের বোঝা হয়ে দিনাতিপাত করতে হচ্ছে। হাজার হাজার শিক্ষিত বেকার যুবক-যুবতী তাদের শিক্ষাজীবন শেষে সামান্য একটি চাকরির জন্য হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়ায়। প্রতিযোগিতামূলক বিভিন্ন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে না পেরে চরম হতাশায় ভোগে। জীবনের প্রতি নেমে আসে চরম অনীহা । ফলে এক পর্যায়ে পা বাড়ায় অন্যায়-অপকর্মের পথে। ঢুকে পড়ে অন্ধকার জগতে। এসব কিছুর জন্য দায়ী আমাদের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা। দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠগুলোতে এখন আর প্রকৃত জ্ঞানের চর্চা হয় না। মুক্তচিন্তার অনুশীলন ও স্বাধীন মতপ্রকাশের সুযোগ আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পাওয়া যায় না। আমাদের শিক্ষকরা ক্লাসে যে পাঠদান করেন অনেক ক্ষেত্রে তাই পরীক্ষার খাতায় লিখতে হয়। অধিকাংশ শিক্ষার্থীর পাঠ্যপুস্তকের সঙ্গে পরিচয় হয় না বললেই চলে। বাজারে প্রচলিত নোট বই, গাইড কিংবা বড় ভাইদের তৈরি প্রথাগত শিট পড়েও অনেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি লাভ করছেন। পেরিয়ে যাচ্ছেন শিক্ষার সর্বোচ্চ গণ্ডি। আমাদের দেশে এখন আর ড. জি সি দেব ও ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর মতো জ্ঞান তাপস মনীষীর জন্ম হয় না। অনেকেই আবার অনিচ্ছায় কিংবা স্বেচ্ছায় জড়িয়ে পড়েন ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে। যদিও ছাত্ররাজনীতি এখন আর ছাত্রদের অধিকার আদায় কিংবা দেশ ও জনগণের কল্যাণে ব্যবহূত হচ্ছে না। কোনো বিশেষ মহলের স্বার্থ রক্ষা বা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের হাতিয়ার হিসেবে ছাত্রদের ব্যবহার করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতির রয়েছে এক গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ৬৯-এর গণঅভ্যুখান, ৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ ও ৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে বাংলার ছাত্রসমাজ সক্রিয় ও অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিল। দেশের যে কোনো সংকট মুহূর্তে ছাত্রদের ভূমিকা ছিল ব্যাপক প্রশংসনীয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে আমাদের ছাত্ররাজনীতি আজ দিগভ্রান্ত ও পথভ্রষ্ট। জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা ও নীতি আদর্শের অনুশীলনের পরিবর্তে আজ তারা দলীয় লেজুড়বৃত্তি ও অপরাজনীতির শিকার। চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, সন্ত্রাস এসব যেন তাদের নিত্যনৈমিত্তিক কাজ। ছাত্ররাজনীতিতে এখন আর গণতন্ত্রের চর্চা ও মেধার মূল্যায়ন হয় না। প্রায় দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বন্ধ রয়েছে ছাত্ররাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু খ্যাত ‘ডাকসু’ নির্বাচন। ফলে ছাত্রদের মাঝে নেতৃত্বের বিকাশ ঘটে না। ছাত্ররাজনীতিতে সৃষ্টি হয় মেধা ও যোগ্যতার সংকট। যার প্রভাব পড়ছে জাতীয় রাজনীতিতে। এদেশে এখন আর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মাওলানা ভাসানী ও এ কে ফজলুল হকের মতো দেশপ্রেমিক ও মেধাবী রাজনীতিবিদ খুঁজে পাওয়া যায় না। রাজনীতিতে নীতি আদর্শের অনুশীলনের পরিবর্তে এখন পেশীশক্তি ও অর্থবিত্তই মুখ্য বিষয়। এর জন্য দায়ী মূলত আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থা। এ দেশে যখন যে সরকার ক্ষমতায় আসেন তাঁরা মেধা ও যোগ্যতার মূল্যায়ন না করে নিছক দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ, পদোন্নতি ও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দিয়ে থাকেন। ফলে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী তাদের শিক্ষাজীবন শেষে একটি সুন্দর ভবিষ্যতের আশায় বিদেশে পাড়ি জমায়।
আমাদের মাননীয় উপাচার্য মহোদয় এক বক্তৃতায় বলেছিলেন যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ হচ্ছে জ্ঞান সৃষ্টি করা আর অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাজ হচ্ছে তা বিতরণ করা। অথচ আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও গবেষণার প্রতি খুব বেশি আগ্রহী নয়। এর জন্যে অবশ্য সরকারও অনেকাংশে দায়ী। কেননা গবেষণা কর্ম পরিচালনা করার জন্য যে পরিমাণ অর্থ বরাদ্দের প্রয়োজন সরকারের পক্ষ থেকে সে পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দেয়া হয় না। ফলে নতুন নতুন জ্ঞান-বিজ্ঞানের আবিষ্কারের ক্ষেত্রে দেশ প্রতিনিয়ত পিছিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে জ্ঞান-বিজ্ঞানের অগ্রগতির বিকল্প নেই। এ দেশকে একটি সুখী সমৃদ্ধ বাংলাদেশ হিসেবে বিশ্বে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে বর্তমান ছাত্রসমাজকেই অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। আমাদের আর্থ সামাজিক উন্নয়নে ছাত্রসমাজের বিকল্প নেই। আজকের তরুণ ছাত্ররাই পারে আমাদের দেশকে একটি সত্যিকার সোনার বাংলায় পরিণত করতে। সেজন্য তাদের জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চায় মনোনিবেশ করতে হবে। নিছক সনদ সর্বস্ব লেখাপড়া না করে নতুন নতুন জ্ঞান বিজ্ঞান আবিষ্কারের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে হবে। নিজেদের মাঝে নীতি আদর্শের অনুশীলন করতে হবে। দলীয় লেজুড়বৃত্তি ও অপরাজনীতি পরিহার করে প্রকৃত গণতন্ত্রের চর্চা করতে হবে। দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে নিজেদের প্রকৃত অধিকার আদায় ও সাধারণ মানুষের কল্যাণের জন্য রাজনীতি করতে হবে। আর সরকারের উচিত দেশ ও জনগণের কল্যাণে ছাত্রদের মেধা ও নেতৃত্বের বিকাশে সহযোগিতা করা এবং প্রকৃত মেধা ও যোগ্যতার মূল্যায়ন করা। সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি সুখী, সমৃদ্ধ ও শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশ গড়াই হোক আমাদের প্রধান লক্ষ্য।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়