বুলেট কেড়ে নিল আবদুল্লাহর প্রকৌশলী হওয়ার স্বপ্ন

‘মা তুমি দেখে নিও, সংসারে আমাদের অভাব বেশি দিন থাকবে না। বাবাকেও আর কষ্ট করতে হবে না বেশি দিন। একদিন আমি বড় ইঞ্জিনিয়ার হব। তখন তোমাকে সবাই ইঞ্জিনিয়ারের মা বলে ডাকবে। গর্বে ভরে যাবে তোমার বুক। তুমি দেখে নিও, সে দিন বেশি দূরে নয়; যেদিন আমি অনেক উপার্জন করবো। আমার ছোট ভাইবোনদের পড়ালেখার খরচ যোগাব, তাদের মানুষের মত মানুষ করে তুলব, পূরণ করবো তাদের সব রকমের চাহিদা। তখন তোমাদের হবে শুধু সুখ আর সুখ। দু’ চোখ আমার স্বপ্নে ভরে উঠতো। সকালে ছেলে মোবাইল ফোনে আমাকে পায়েস রাঁধতে বলেছিলো। সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে খাবে। পায়েস রান্নাও হয়েছে। কিন্তু তা খাওয়াতে পারলাম না তাকে। এ আফসোস রাখব কোথায়।’ গত বৃহস্পতিবার সারাদেশে হরতাল চলাকালে বগুড়ায় পুলিশ ও জামায়াত-শিবিরের সংঘর্ষের ঘটনায় নিহত আব্দুল্লাহ আল মামুনের মা অলেদা বেগম কান্না আর আবেগ জড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলেন। নিহত আব্দুল্লাহ জয়পুরহাটের কালাই পৌরসভার এক নম্বর ওয়ার্ডের আদর্শপাড়া মহল্লার অধিবাসী ছিলেন। অত্যন্ত ভদ্র আর নম্র স্বভাবের ছেলে আব্দুল্লাহর এ অকাল মৃত্যু পাড়া-প্রতিবেশীরা মেনে নিতে পারছেন না। এ ঘটনায় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। নিহত আব্দুল্লাহর লাশ তার গ্রামের বাড়িতে পৌঁছে জুমার নামাজের পরপরই। তাকে শেষ দেখা দেখতে ভিড় জমায় এলাকাবাসী। বাদ আছর জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। আব্দুল্লাহর বাড়িতে গিয়ে জানা যায়, তার বাবা মো. আখের আলী সরদার কালাই পৌর বাজারের সবজি ব্যবসায়ী। তিন সন্তানের মধ্যে সে সবার বড়। অভাবের সংসার। তারপরও ছেলের ভবিষ্যতের কথা ভেবে মেধাবী ছেলেকে বগুড়ায় সরকারি পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটে পাওয়ার ট্রেডে ভর্তি করে দেন। ছেলের স্বপ্ন ছিলো পড়ালেখা শেষ করে বড় প্রকৌশলী হওয়ার। পরিবারের দাবি- তাদের ছেলে কোন রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পৃক্ত নয়। এলাকাবাসীও বিশ্বাস করেন না আব্দুল্লাহর মতো অত্যন্ত ভদ্র ও বিনয়ী এ ছেলেটি শিবিরের মতো একটি উগ্র সংগঠনের সাথে জড়িত। সহপাঠী ফারজানা আকতার জানায়, আব্দুল্লাহ স্কুল জীবন থেকেই ছিল নরম আর মার্জিত স্বভাবের। কোনদিন তাকে উচ্চৈস্বরে কথা বলতেও শুনিনি। সব সময় সে হট্টগোল এড়িয়ে চলতো। তার অকাল মৃত্যুর খবরে আমরা হতবাক।’ আদর্শপাড়া মহল্লার প্রতিবেশী মোকলেছুর রহমান বলেন, আব্দুল্লাহ সবাইকে সম্মান ও সমীহ করে চলতো। কখনও কারো সাথে তাদে দ্বন্দ্ব কলহে জড়াতে দেখিনি। পড়ালেখার অবসরে মহল্লার সহপাঠীদের সাথে খেলাধুলা করেই সময় কাটতো তার। কোন রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় তাকে দেখা যায়নি। প্রতিবেশী অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী সানজিদা জেরিন সুমনা জানান, “আব্দুল্লা ভাই আমাদের খুব স্নেহ করতেন। মাঝে মাঝে পড়া দেখিয়ে দিতেন। আর যেন কোন ভাইকে রাজনৈতিক রোষানলে জীবন দিতে না হয়।” কালাই উপজেলার শান্তিনগর আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল মতিন বলেন, ‘আব্দুল্লাহ আমার স্কুল থেকে ২০১২ সালে অনুষ্ঠিত এসএসসি পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে জিপিএ ৪.৯৬ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে। শত অভাবের মাঝেও বড় প্রকৌশলী হবার স্বপ্ন দেখতো সে। আমরা তাকে নিয়ে গর্ব করতাম। কিন্তু আব্দুল্লাহর সে স্বপ্ন যে অঙ্কুরেই ঝরে যাবে তা ভাবতে পারিনি।’