হদিস নেই সাড়ে পাঁচ লাখ ভোটারের
প্রকাশ : ০১ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২২:১৫
নির্বাচন কমিশন (ইসি) প্রকাশিত চূড়ান্ত ভোটার তালিকা নিয়ে বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে। তালিকায় ৫ লাখ ৫৬ হাজার ৯৫৬ জন ভোটারের হিসাব না মেলার বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন নির্বাচন পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ও রাজ-নৈতিক বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, এই ভোটাররা গেল কোথায়, তাদের হদিস মিলছে না কেন? চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের আগে-পরে খোদ ইসির দেয়া তথ্যেই গরমিল দেখা দেয়ায় এনিয়ে সঙ্গত কারণেই রাজনৈতিক বিতর্কও দেখা দেবে বলে মনে করছেন তারা।
ভোটার তালিকার এই তথ্যবিভ্রাট সম্পর্কে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি ও সরকার বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপিকা দিলারা চৌধুরী গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, শুরু থেকেই বর্তমান নির্বাচন কমিশনের সকল কার্যক্রমে কোনো না কোনো গরমিল দেখছি। এখন চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় এরকম মারাত্মক বিভ্রান্তির কারণে এই কমিশন সম্পর্কেই জনমনে সন্দেহ কিংবা আস্থার সংকট দেখা দেবে। এমনিতেই সাধারণ মানুষের একরকম ধারণা রয়েছে যে, এই কমিশন অদৃশ্য কোনো শক্তি দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। সাড়ে পাঁচ লাখ ভোটারের হিসাব না মেলার কারণে মানুষের সেই ধারণা এখন তা আরও বদ্ধমূল হবে।
নির্বাচন কমিশনের হিসাব অনুযায়ী ২০১২ সালের ১০ মার্চ ভোটার হালনাগাদ কার্যক্রম শুরুর আগে সারা দেশে ছবিসহ ভোটার ছিল ৮ কোটি ৬৪ লাখ ১০ হাজার ৩৫৬ জন। মৃত্যুজনিত কারণে তালিকা থেকে কর্তন করা হয় ৭ লাখ ৪১ হাজার ৬৯ জনকে। অন্যদিকে এবার হালনাগাদ কার্যক্রমে নতুন করে যুক্ত হয়েছেন ৭০ লাখ ১৭ হাজার ৫২১ জন ভোটার। এই হিসাবে চূড়ান্ত তালিকায় ভোটার হওয়ার কথা ৯ কোটি ২৬ লাখ ৮৬ হাজার ৮০৮ জন। কিন্তু বৃহস্পতিবার কমিশন প্রকাশিত চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় দেখা যাচ্ছে, ভোটার সংখ্যা ৯ কোটি ২১ লাখ ২৯ হাজার ৮৫২। ফলে ৫ লাখ ৫৬ হাজার ৯৫৬ জন ভোটারের হিসাবে গরমিল পরিলক্ষিত হচ্ছে।
তথ্যবিভ্রাট সম্পর্কে সাংবাদিকরা জানতে চাইলে স্পষ্ট কোনো জবাব কিংবা ব্যাখ্যা দিতে পারেননি প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ। তবে সাংবাদিকদের সিইসি বলেছেন ‘ভোটার তালিকা প্রণয়ন প্রকল্পের কর্মকর্তাদের কাছে আমিও এই প্রশ্নটি করেছি, তাদের জবাবের অপেক্ষায় আছি।
এ বিষয়ে জাতীয় পরিচয়পত্র অনুবিভাগ প্রকল্পের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আকতারুজ্জামান সিদ্দিকী দাবি করেছেন, হালনাগাদের সময় যে হিসাব দেয়া হয়েছিল, সেটি হয়তো ভুল ছিল। বর্তমানে যে হিসাব দেয়া হয়েছে তা শতভাগ নির্ভুল।
নির্বাচন পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা জানিপপ চেয়ারম্যান ড. নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, সাড়ে পাঁচ লাখেরও বেশি ভোটারের হিসাব কেন মিলছে না, সে ব্যাপারে কমিশনকেই ব্যাখ্যা দিতে হবে। কীভাবে ভোটারের এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে, সে বিষয়ে স্বচ্ছ হিসাব বুঝিয়ে দিতে হবে কমিশনকেই। তা না হলে এনিয়ে বিতর্কের ঝড় উঠবে। যে পর্যন্ত কমিশন সবার কাছে বিশ্বাসযোগ্য ব্যাখ্যা হাজির করতে না পারবে, সে পর্যন্ত অবাধ নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে বলেও কমিশন দাবি করতে পারবে না।
২০১২ সালের ৮ মার্চ নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে লিখিতভাবে সিইসি কাজী রকীবউদ্দিন জানিয়েছিলেন, ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম সংসদ নির্বাচনে মোট ভোটার ছিল ৮ কোটি ১০ লাখ ৫৮ হাজার ৬৯৮ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার ছিল ৪ কোটি ১২ লাখ ৩৬ হাজার ১৪৯, পুরুষ ভোটার ছিল ৩ কোটি ৯৮ লাখ ২২ হাজার ৫৪৯ জন। এরপর ২০০৯ সালের হালনাগাদে ভোটার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৮ কোটি ৫৭ লাখ ৪৭ হাজার ৩৬৩। ঐসময় ভোটার বৃদ্ধি পায় ৪৬ লাখ ৮৮ হাজার ৬৬৫ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার ছিল ২০ লাখ ৭৭ হাজার ৩৮৬ এবং পুরুষ ভোটার ছিল ২৬ লাখ ১১ হাজার ২৭৯ জন। পরে দুই বছর ভোটার হালনাগাদ কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও ভোটার করার কার্যক্রম অব্যাহত ছিল। কমিশন থেকে বলা হয়, ঐ দুই বছরে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ ভোটার নিবন্ধন করা হয়েছে। সেই হিসাব কষলেও বৃহস্পতিবার প্রকাশিত ভোটার সংখ্যার সঙ্গে গরমিল ধরা পড়ে।
অধ্যাপিকা দিলারা চৌধুরীর মতে, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পূর্বশর্ত হল একটি স্বচ্ছ ও নির্ভুল ভোটার তালিকা। সেক্ষেত্রে এই কমিশন শুরুতেই হোঁচট খেল। ড. কলিমুল্লাহও মনে করেন, চূড়ান্ত ভোটার তালিকা সম্পর্কে এই তথ্যবিভ্রাট দূর করতে কমিশন ব্যর্থ হলে এই কমিশনকে অনেক বড় মূল্য দিতে হতে পারে। তাই যতদ্রুত সম্ভব এর গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা দিয়ে কমিশনের উচিত একটি সন্দেহমুক্ত ভোটার তালিকা জনগণের সামনে হাজির করা।