রাষ্ট্রভাষা নিয়ে সংগ্রাম আবারো নাজিমুদ্দিন
প্রকাশ : ০১ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২২:১৭
ফেব্রুয়ারির দ্বিতীয় দিনটিতে নতুন কোনো ঘটনার প্রকাশ নেই। হল-হোস্টেলের ছাত্রদের মধ্যে আলোচনার বিষয়—নাজিমুদ্দিনের বক্তৃতা ও সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন। পরিষদের কর্মতত্পরতা নিয়ে, কোনো কোনো বিশিষ্ট সদস্য সম্বন্ধে বিরূপ মন্তব্যও শোনা গেছে। আর মেডিক্যাল কলেজ ছাত্র, কারো কারো মুখে যুক্তিসঙ্গত কারণে শোনা গেছে এ বিষয়ে সমালোচনা। কারণ এখানকার ছাত্রদের রাজনৈতিক তত্পরতা সত্ত্বেও সংগ্রাম পরিষদে অন্য সব হল-হোস্টেল বা কলেজ ইউনিয়নের ভিপি, জিএস দুইজনকে যেখানে সদস্য হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে সেখানে মেডিক্যাল কলেজ ইউনিয়নের ভিপিকেই কেবল সদস্যভুক্ত করা হয়, জিএসকে নয়। অথচ একুশে ফেব্রুয়ারি থেকে পরবর্তী দিনগুলোতে মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেল হয়ে ওঠে আন্দোলন পরিচালনার ঘাঁটি।
সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠনের ক্ষেত্রে ছাত্রলীগ, যুবলীগসহ সরকার-বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদেরও আগ্রহ ছিল যথেষ্ট। রাষ্ট্রভাষার মতো একটি বিষয় রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক দু’দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। কাজেই রাজনৈতিক নেতা অনেকেরই লক্ষ্য ছিল ভাষা আন্দোলনের মঞ্চটিতে আধিপত্য বজায় রাখা। ভাসানী অবশ্য এদিক থেকে ব্যতিক্রম। ছাত্র-যুব আন্দোলনের চেয়ে তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল ভূমিপুত্রদের অর্থাত্ কৃষক-তাঁতি-কামার-কুমার-জেলেদের মতো নিম্নবর্গীয়দের অর্থনৈতিক-সামাজিক সমস্যা। তাই অপ্রিয় হলেও কথাটা সত্য যে, ভাষা আন্দোলনের কর্মকাণ্ড তাকে পুরোপুরি পায়নি। কিন্তু ভাষা আন্দোলন উপলক্ষে কঠোর সরকারি দমননীতি তাকে ভালোভাবেই পেয়েছিল। কারো কারো তুলনায় কিছুটা বেশিমাত্রায়। উঁচু গাছের মাথায় ঝড়ের ঝাপটা বা আঘাত বেশি করে লাগার মতো।
সংগ্রাম পরিষদ গঠনের কর্মীসভায় মেডিক্যাল ছাত্র মোজাম্মেল, সালাম, কবীরসহ আমরা অনেকেই উপস্থিত। মনে পড়ে খালেক নেওয়াজ খান ও কাজী গোলাম মাহবুবের হলের এক কোণে দাঁড়িয়ে একান্ত আলাপ—দু’জনেরই টেনশনবিদ্ধ মুখ, সামান্য ঘামে ভেজা। তোয়াহা-অলি আহাদদের চিন্তিত মুখ। সর্বোপরি চোখে পড়ার মতো মাথায় বেতের টুপি, আটপৌরে পোশাকে মওলানা ভাসানীর সভাপতিত্ব। বক্তা ছিলেন অনেকেই। ছাত্রনেতা খালেক নেওয়াজ, আবদুল মতিন থেকে প্রবীণ রাজনৈতিক নেতা আবুল হাশিম। সবারই বিষয়ানুগ বক্তৃতা। আর সভাপতির স্বভাবসুলভ ভাষণ।
রাষ্ট্রভাষার দাবি ছাড়াও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব ছিল নিরাপত্তা বন্দীদের মুক্তি। শেখ মুজিবুর রহমান, মহিউদ্দিন আহমদ প্রমুখ নেতা তখন ঢাকা জেলে বন্দী। তাছাড়া বন্দী বাম ঘরানার অধিকাংশ রাজনৈতিক নেতাকর্মী। হয়তো তাই ভাষা আন্দোলনের মিছিলে মিছিলে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’র পরের শ্লোগানই ছিল ‘রাজবন্দীদের মুক্তি চাই’—যা ভাষা সংগ্রামীদের গভীর রাজনৈতিক সচেতনতার পরিচায়ক। আর সামাজিক অন্তর্দৃষ্টি ধরা পড়েছিল ‘সর্বস্তরে বাংলা চালু’র শ্লোগানে। শেষ শ্লোগানটি কাদের পরামর্শে তা কিছুটা অনুমান করা যায়।
ভাষা আন্দোলন ঢাকা শহরে আমাদের কারো কারো জন্য অনেক অনুষঙ্গ তৈরি করে রেখেছে। এখনো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান কলাভবন ক্যাম্পাসের পাশ দিয়ে যেতে যেতে উপাচার্য ভবনের উল্টোদিকে মোটাসোটা গাছটি চোখে পড়ে। মনে পড়ে যায় নীলক্ষেত ব্যারাকের বিশাল ছাউনি ও সেখানকার বাসিন্দাদের কথা। ওই গাছের ঠিক উত্তর পাশে মস্তবড় একটি ব্যারাকে মাস কয়েক অভিবাসীর মতো থাকতে হয়েছিল নতুন কলেজ হোস্টেল তৈরি না হওয়ার কারণে। এখন নীলক্ষেত ব্যারাকের প্রায় সবটাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এলাকা। ব্যারাকে থাকার সুবাদে ওই ব্যারাকের বাসিন্দাদের একজনের মুখে শুনি ভাষা নিয়ে তাদের বিক্ষোভ, সভা, মিছিল ইত্যাদির কথা। কারণ যদিও সামান্য, তবুও গুরুত্বপূর্ণ। সাতচল্লিশের শেষে পাক সরকারের ছাপা এনভেলাপ, মানিঅর্ডার ফরম ইত্যাদিতে উর্দু ও ইংরেজি লেখার পাশে বাংলা লেখা না থাকায় তাদের ক্ষোভ। ক্ষোভের প্রকাশ ঘটে ব্যারাক প্রাঙ্গণে সভা, বক্তৃতা এবং মিছিল ও শ্লোগানে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ ‘উর্দুর সঙ্গে বিরোধ নাই’। ওরা সরকারি কর্মচারী, তবু সাহস করে পাকিস্তানি উন্মাদনার যুগ প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে গ্রহণ করার জন্য দাবি জানিয়েছিলেন।
সে নীলক্ষেত ব্যারাক নেই, ব্যারাকের বাসিন্দারাও নেই। আছে শুধু তাদের প্রতিবাদের স্মৃতি, তাও কিছুসংখ্যক ভাষা সংগ্রামীর মনে। ইতিহাস এ ঘটনা বড় একটা ধরে রাখেনি। আমি তা শুনেছি তাদের একজনের মুখে, আর ভাষা মতিন দেখেছেন তাদের স্বতঃস্ফূর্ত তত্পরতা, অনেক পরে বলেছেন আমাকে প্রাসঙ্গিক আলোচনায়, লিখেছেন তার পুস্তিকায়। বিলুপ্ত নীলক্ষেত ব্যারাকের ভাষানুষঙ্গের স্মৃতিরক্ষায় অন্তত একটি ফলক স্থাপন করা উচিত। এ দাবি রইল আমার ও সংশ্লিষ্ট ভাষা সংগ্রামীদের পক্ষ থেকে।
একইভাবে স্মরণ করতে পারি এই ধারাবাহিকতায় শহর ঢাকায় ১৯৪৮ সালের মার্চের ভাষা আন্দোলন। ১১ মার্চ থেকে ১৭ মার্চ পর্যন্ত। সহপাঠী বন্ধু মেডিক্যাল ছাত্র আলী আছগর পিকেটিং করতে গিয়ে পুলিশের হাতে গ্রেফতার, অতঃপর ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে। চারদিন পর মুখ্যমন্ত্রী নাজিমুদ্দিনের আট দফা শান্তি চুক্তির কল্যাণে ১৫ মার্চ ঢাকা জেল থেকে অন্যদের সঙ্গে মুক্তি। এ আন্দোলনের সূচনা গণপরিষদে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বাংলা বিষয়ক প্রস্তাব অর্থাত্ বাংলাকে গণপরিষদের ভাষা হিসাবে গ্রহণের প্রস্তাব নাকচ হওয়ার প্রতিক্রিয়ায়। ঢাকায় শিক্ষিত সমাজে বাংলা রাষ্ট্রভাষা বিষয়ক অনীহার মধ্যেই সাহসী ছাত্র যুবসমাজ এ আন্দোলন সংঘটিত করে। মার্চে রমনার ছাত্র এলাকায় রাজপথে পথে ছাত্র পিকেটিং এবং পুলিশ ও সরকারি গুণ্ডাবাহিনীর আক্রমণে রক্তঝরার সঙ্গে সারি সারি কৃষ্ণচূড়ার রক্তিম ছায়ার বিস্ময়কর নান্দনিক সাদৃশ্য। সেইসঙ্গে কচিত্ শিমুল-পলাশের লাল-হলুদ আভা সহযোগী অনুষঙ্গ তৈরি করে। প্রকৃতির সাজ ও মানব সন্তানদের তত্পরতায় সাদৃশ্য ইতিহাস লেখক লক্ষ্য করতে পারেন। আর আমাদের প্রতিবাদ ও সংগ্রামের ইতিহাস ফাল্গুন-চৈত্র বা ফেব্রুয়ারি-মার্চের সঙ্গে এক অবিশ্বাস্য, অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক তৈরি করে রেখেছে।
সেই তাত্পর্যপূর্ণ সংগ্রামী সময়ে পাকিস্তানের স্থপতি মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ঢাকায় আগমন এবং রেসকোর্স ময়দানের নাগরিক সংবর্ধনা সভায় তার ভাষণ (২১ মার্চ)। এর তিনদিন পর কার্জন হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ সমাবর্তন অনুষ্ঠানে তার বক্তৃতা। তার দুটি বক্তৃতাই ছিল একনায়কোচিত, অগণতান্ত্রিক বক্তব্যে পূর্ণ এবং তাতে ছিল অহমবোধের প্রকাশ। ছিল বাঙালি জাতির প্রতি বিরূপতা, প্রগতি রাজনীতির প্রতি কঠোর ফ্যাসিস্টসুলভ হুঁশিয়ারি। রেসকোর্সে উপস্থিত ছাত্রদের একাংশ তার বাংলাভাষা বিরোধী বক্তব্য শুনে ময়দান ছাড়ে এবং কার্জন হলে একই কারণে তাকে শুনতে হয় ‘না, না’ (নো, নো) প্রতিবাদ। তবু তিনি তার উদ্ধত বাঙলা-বিরোধী ভূমিকার প্রকাশ ঘটিয়ে মুখ্যমন্ত্রী নাজিমুদ্দিনকে সর্বপ্রকার সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে বিদায় নেন। বাঙালি মুসলমান বৃথাই তাকে শাহেনশা’র আসনে বসিয়েছিল। এ সফরে তার স্বেচ্ছাচারী বক্তব্যের বিরুদ্ধে মাত্র একজনই প্রকাশ্যে প্রতিবাদ জানিয়ে ঢাকায় তার অবস্থানকালে বিবৃতি দিয়েছিলেন। তিনি প্রবীণ রাজনীতিক ফজলুল হক।
তখনো বাঙালি মুসলমানের মধ্যে জিন্নাহর গভীর প্রভাব। তার ভাষা বিষয়ক ভাষণের প্রভাবে তমদ্দুন মজলিস লড়াইয়ের মাঠ ছাড়ে। ফলে বায়ান্নর সংগ্রামে তাদের আর মাঠে দেখা যায় না। সেই মুক্ত মাঠ বাম ঘরানার কর্মীদের দখলে চলে যায়। বায়ান্নে তাই ভাষা আন্দোলনের চরিত্র বদল ঘটে। তা সত্ত্বেও সর্বদলীয় আন্দোলনের অনৈক্য তার যাত্রাপথে ছায়া ফেলে। রাজনীতি ক্ষেত্রে অসমন্বিত ঐক্যের ভালো-মন্দ দু’টি দিক থাকে। থাকে ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিক। আমাদের ভাষা সংগ্রামে সেই অসমন্বিত দ্বন্দ্ব বেশ কিছু প্রভাব রেখেছিল। তবু এর সাফল্য প্রশ্নাতীত। কিন্তু ওই সাফল্য পেতে ভাষা আন্দোলনকে প্রায় চার বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। কেউ কেউ বলে থাকেন, এটা বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের প্রস্তুতিপর্ব। হয়তো তাই। কিন্তু এতটা দীর্ঘ প্রস্তুতিপর্বের কি প্রয়োজন হতো যদি আন্দোলন স্থগিত করা ও জিন্নাহ ‘ফ্যাক্টর’ যুক্ত না হতো। আসলে এই ‘যদিও’ কিন্তু অনেক সময় রাজনীতি ক্ষেত্রে নিয়তিসম ঘটনাবলীকে নিয়ন্ত্রণ করে সর্বনাশ ঘটায়। ঘটিয়েছে কখনো কখনো।
লেখক: ভাষা সংগ্রামী ও প্রাবন্ধিক