আলু ও টমেটোর আগাম ও নাবী ধ্বসা রোগ

আলু ও টমেটো বাংলাদেশের সর্বাধিক জনপ্রিয় দু’টি সবজি। সেই সাথে অর্থকরী ফসলও বটে। এ ফসল দু’টি চাষে স্বল্প সময়ে লাভ বেশি হওয়ায় শুধু কৃষকরাই নয়, যারা কৃষি কাজের সাথে জড়িত নন এমন অনেকেই আলু চাষের দিকে ঝুঁকে পড়ছেন। কিন্তু কিছু কিছু বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য না রাখায় অনেকেই কাংখিত ফলন পান না। তখন বিভিন্ন জনকে বিভিন্নভাবে দোষারোপ করেন। তাই চাষে নামার আগে থেকেই যদি কয়েকটি বিষয় গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হয় তাহলে কাংখিত ফলন নিশ্চিত করা সম্ভব। আলু ও টমেটো চাষে রোগ-বালাই দমন ব্যবস্থাপনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আলু এবং টমেটো ফসল জমিতে থাকা অবস্থায় যেসব রোগের আক্রমণ দেখা যায় তার মধ্যে নাবী ধ্বসা ও আগাম ধ্বসা প্রধানতম দু’টি রোগ। নিচ্ে রোগ দু’টি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হল। নাবী ধ্বসা রোগ:রাতের তাপমাত্রা ১২ থেকে ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস, দিনের তাপমাত্রা ২০ থেকে ২২ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং আপেক্ষিক আর্দ্রতা ৯০ থেকে ১০০ ভাগ হলে ছত্রাক খুব দ্রুত বৃদ্ধি পায়। সাধারণত যখন কুয়াশায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে ফসলের মাঠ। সারাদিন সূর্যের দেখা মেলে না। রাতের তাপমাত্রা কমে যায় স্বাভাবিকের চেয়েও অনেক কম। দিনের বেলা আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকে, কখনো গুড়ি গুড়ি বৃষ্টিপাত হয়। এই আবহাওয়াকে বলা হয় সংকটাপন্ন আবহাওয়া। এই আবহাওয়ায় মাঠের ফসল, বিশেষ করে আলু ও টমেটোতে দেখা দেয় মড়ক রোগ। রোগটি আসলে লেট ব্লাইট বা নাবী ধ্বসা। দিনে-রাতে কুয়াশা থাকায় তাপমাত্রা কমার পাশাপাশি আর্দ্রতাও বেড়ে যাওয়ায় এই রোগের জীবাণু দ্রুত বৃদ্ধি পায়। সপ্তাহ খানেক পর দিনে কুয়াশা কেটে যাওয়ার পর রোদ দেখা দিলেও রাতে আবার কুয়াশা পড়ায় মড়ক রোগের জীবাণুর বৃদ্ধির পক্ষে অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। রোগের কারণ ও লক্ষণ: চযুঃড়ঢ়যঃযড়ত্ধ রহভবংঃধহং নামক এক ধরনের ছত্রাকের কারণে রোগটি হয়। রোগের প্রাথমিক অবস্থায় পাতা, পাতার বোঁটা, ডগা ও কাণ্ডে ছোট ছোট পানি ভেজা আঁকাবাঁকা দাগ পড়ে। ধীরে ধীরে এই দাগ প্রথমে বাদামী ও পরে কালো রঙ ধারণ করে। এরপর দাগ আরো বড় হয়ে সব পাতা, ডগা ও কাণ্ডের চারদিকের বেশকিছু অংশ ঘিরে ফেলে। আক্রান্ত দাগের চারদিকে ফ্যাকাশে সবুজ ও বাদামী রঙের বলয় দেখা যায়। দাগগুলো পাতার কিনারার দিক থেকে ভিতরের দিকে ছড়িয়ে পড়ে। পাতার নিচে সাদা সাদা গুঁড়োর মত জীবাণু দেখা দেয়। এই জীবাণু সামান্য বাতাসেই উড়ে গিয়ে অন্য সুস্থ গাছের পাতা ও ডগা সংক্রমণ করে। বাতাসের আপেক্ষিক আর্দ্রতা বেশি (৯০-১০০%) থাকলে ২ থেকে ৩ দিনের মধ্যেই ক্ষেতের অধিকাংশ গাছ আক্রান্ত হয়ে পড়ে। মারাত্মকভাবে আক্রান্ত ক্ষেতে এক ধরনের বিশেষ গন্ধ বা পোড়া গন্ধ পাওয়া যায়। ক্ষেত দেখে মনে হয় সমস্ত আলুগাছ পুড়ে গেছে। মাটির নিচের আলুতে পচন ধরে। টমেটোর ফল আক্রান্ত হলে বোঁটার কাছাকাছি জায়গা থেকে কালো দাগ পড়ে এবং পচন শুরু হয়। বিস্তার: আক্রান্ত টমেটো বা আলু বীজের মাধ্যমে এই ছত্রাক পরের বছরে রোগ ছড়ায়। অনেক সময় আক্রান্ত টমেটো বা আলুগাছ থেকেও এই রোগ সুস্থ টমেটো বা আলুগাছে ছড়ায়। এই রোগের বীজাণু বা স্পোর বাতাস ও পানির ছিটার মাধ্যমে ক্ষেতের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে। নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনা: আক্রান্ত ক্ষেত থেকে কোনো অবস্থায় বীজ নেয়া উচিত নয়। প্রত্যায়িত বীজ ব্যবহার করতে হবে। ক্ষেত সব সময় আগাছামুক্ত রাখতে হয়। ফসল তোলার সময় আক্রান্ত গাছ ও পাতা যেন টিউবার বা কন্দের সাথে না লাগে সে দিকে লক্ষ্য রাখতে হয়। রোগাক্রান্ত সম্পূর্ণ আলুগাছ সংগ্রহ করে পুড়িয়ে বা মাটিতে পুঁতে ফেলতে হয়। রোগাক্রান্ত আলুবীজও মাটিতে পুঁতে ফেলা উচিত। আক্রান্ত ক্ষেতের আলুগাছ সম্পূর্ণ শুকিয়ে যাওয়ার পর আলু তুললে পাতায় অবস্থিত ছত্রাক মরে যায়, ফলে টিউবার বা কন্দ আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশ কমে যায়। গাছের গোড়ার মাটি উঁচু করে দিলে মাটির নিচের আলুকে রোগ-বীজাণু থেকে রক্ষা করা যায়। বৃষ্টির পর বা ভেজা মাটিতে কখনো আলু তোলা উচিত নয়, এতে পাতা ও মাটি থেকে আলু সংক্রমিত হতে পারে। আলু তুলে ফেলার পর পরিত্যক্ত অংশগুলো একত্র করে পুড়িয়ে ফেলতে হয়। আগাম জাতের আলু চাষ করলে অনেকাংশে এই রোগ এড়ানো যায়। আক্রান্ত ক্ষেতে যথাসম্ভব সেচ প্রদান বন্ধ রাখতে হয়। আলুবীজ শোধন করে লাগাতে হবে। আলুবীজ শোধনের জন্য ফরমালিন ১ : ৪০০ অনুপাত দ্রবনে আলুবীজ ৩ থেকে ৫ মিনিট ডুবিয়ে রেখে এরপর ভেজা গানি ব্যাগে ২ ঘণ্টা রেখে দিতে হবে। এতে আলুর মধ্যস্থিত জীবাণু মারা যায়। রোগ প্রতিরোধের জন্য প্রতিলিটার পানিতে শুধু ম্যানকোজেব ২.৫ গ্রাম ১০ থেকে ১২ দিন পর পর স্প্রে করতে হবে। পরর্বতীতে কুয়াশা ও মেঘলা আবহাওয়া বিরাজ করলে প্রতি লিটার পানিতে ম্যানকোজেব + মেটালেক্সিল (রিডামেল গোল্ড, করমিল, মেটারিল, নিউবেন ইত্যাদি) ২ গ্রাম বা সিকিউর ২ গ্রাম মিশিয়ে সেপ্র করতে হবে। যদি উল্ল্লেখিত ছত্রাকনাশক কাজ না করলে প্রতি লিটার পানিতে সিকিউর ১ গ্রাম + মেলেডি ডুও ২ গ্রাম মিশিয়ে ৭ থেকে ১০ দিন পর পর ২/৩ বার সেপ্র করতে হবে। ছত্রাকনাশক সেপ্র করার সময় গাছের পাতার নিচে, উপরে ও কাণ্ডসহ সেপ্র করতে হবে। পাওয়ার সেপ্রয়ার ব্যবহারে ভাল ফলাফল পাওয়া যায়। (চলবে) লেখক:সহকারী অধ্যাপক, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা