নির্বাচন নিয়ে বিপরীত মেরুতে দুই দল

জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে দেশের প্রধান দুই দলের অবস্থান সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে। তত্ত্বাবধায়ক বা নির্দলীয় সরকারের দাবিতে প্রধান বিরোধী দল আন্দোলন অব্যাহত রাখলেও এ বিষয়ে সরকারের এখন পর্যন্ত কোনো ইতিবাচক মনোভাব নেই। বিরোধী দলের দাবি কিংবা আগামী নির্বাচন নিয়ে বিবদমান পক্ষগুলোর মধ্যে আলোচনার কোন ইঙ্গিতও দেখা যাচ্ছে না। ইতিমধ্যে ক্ষমতাসীন মহাজোট আগামী নির্বাচনের জন্য প্রচারণা শুরু করে দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ মহাজোটের নেতারা রীতিমতো জনসভায় নিজ দলের পক্ষে ভোট চাইছেন। মহাজোটের অন্যতম শরিক জাতীয় পার্টি (এ) আগামী নির্বাচনে বিভিন্ন আসনে প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করতে শুরু করেছে। নির্বাচন কমিশনও (ইসি) নির্বাচনের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিব উদ্দিন আহমেদ বলেছেন, যে কোনো ধরনের সরকারের অধীনেই নির্বাচনের জন্য কমিশন প্রস্তুত আছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুতে সরকার ও বিরোধী দলের অবস্থান পরস্পর বিরোধী। সেটি হিসাবে নিলে বলা যায়, বর্তমান সরকারের মেয়াদ শেষ হবার আগে এই ইস্যুতে ঐকমত্য হচ্ছে না। তবে, কারো কারো মতে, অতীত মূল্যায়ন করে শেষ পর্যন্ত সরকার এবং বিরোধী দলের মধ্যে একটি সমঝোতা হয়েও যেতে পারে। গত কয়েক মাসে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের শরিকরা নির্বাচনী প্রচারণায় নেমেছে। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিভিন্ন জায়গায় যে জনসভাগুলো করেছেন, সেখানে তিনি নৌকা মার্কার পক্ষে ভোট চেয়েছেন। সর্বশেষ গতকাল শনিবার বৃহত্তর পাবনার তিনটি জনসভায় প্রধানমন্ত্রী আগামী নির্বাচনে নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে আওয়ামী লীগকে নির্বাচিত করার জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। দলটির একাধিক শীর্ষ নেতাও বিভিন্ন জনসভায় নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছেন। আওয়ামী লীগের সর্বশেষ সংসদীয় দলের বৈঠকে সংসদ নেত্রী শেখ হাসিনা এমপিদের নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিতে বলেছেন। মহাজোটের অন্যতম শরিক জাতীয় পার্টি (এ) চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদও প্রায় শ’খানেক সংসদীয় আসনে প্রার্থিতা ঘোষণা করেছেন। মহাজোটের অন্য শরিক যেমন জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি ও অন্যরাও নিজ নিজ দল থেকে সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতে নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছে। এদিক থেকে বলা যায় আওয়ামী লীগ এবং মহাজোট পুরোদমে নির্বাচনী মাঠে। এদিকে, প্রধান বিরোধী দল বিএনপি আগামী নির্বাচন তত্ত্ব্বাবধায়ক বা নির্দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠানের দাবিতে রাজপথে আছে। এ দাবিতে তারা জোরালো আন্দোলন না চালালেও বিএনপির চেয়ারপার্সন ও বিরোধী দলীয় নেতা খালেদা জিয়া ইতিমধ্যে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, নির্দলীয় সরকার ছাড়া নির্বাচন নয়। দলটির অন্যতম শরিক জামায়াত যুদ্ধাপরাধের বিচার ইস্যুতে রাজনীতির মাঠে কোণঠাসা থাকলেও জোটের সাথে তারা ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। গত বৃহস্পতিবার জামায়াত আহূত হরতালে বিএনপি সমর্থন দিয়ে জোটের ঐক্য অক্ষুণ্ন্ন রাখার ইংগিত দিয়েছে। আরো যে কয়েকটি ছোট ছোট দল বিএনপির সাথে জোটবদ্ধ হয়েছে তারাও আন্দোলনের পাশাপাশি নির্বাচন নিয়ে কথাবার্তা চালিয়ে যাচ্ছে। নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে সরকার এবং বিরোধী দলের অবস্থান বিপরীত মেরুতে হলেও কারো কারো মতে, নির্বাচনকে সামনে রেখে এ ইস্যুতে একটা ফয়সালা হবেই। শেষ পর্যন্ত একটি সমঝোতার মাধ্যমে দু’পক্ষ নির্বাচনে আসবে। বিশেষ করে দু’দলই চাইবে না ওয়ান ইলেভেনের মতো কোন ব্যবস্থা দেশে আবার আসুক। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ গতকাল ইত্তেফাককে জানান, নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের অংশগ্রহণের জন্য আমরা প্রস্তুত। কারণ এই পদ্ধতিতে সরকারের অধীনে দেশে কয়েকটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এমনকি বর্তমান সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশ নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর তারা এককভাবে সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে দিয়েছে। আমরা তা পুনর্বহালের জন্য আন্দোলনরত। আমরা চাই আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে সমঝোতা হোক। তবে কোন দলীয় সরকারের অধীনে বিএনপিসহ জোটের শরিক দলগুলো নির্বাচনে অংশ নেবে না। আগামী নির্বাচনে বিরোধী দলও অংশ নেবে ক্ষমতাসীন দলের এমন বক্তব্য প্রসঙ্গে ব্যারিস্টার মওদুদ বলেন, নির্বাচনে সকল দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য সরকারকেই উদ্যোগ নিতে হবে। এ ব্যাপারে সরকারের আন্তরিকতা থাকলে তাদের স্পষ্ট করে বলতে হবে যে, নির্দলীয় সরকার ব্যবস্থা তারা পুনর্বহাল করবে। আর তারা দলীয় সরকারের অধীনে এককভাবে নির্বাচন করতে চাইলে রাজপথেই শেষ পর্যন্ত বিষয়টির মীমাংসা হবে। গণজাগরণের মুখে সরকার বিরোধী দলের দাবি মেনে নিতে বাধ্য হবে। নতুবা তাদের বিদায় নিতে হবে। আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী মাহবুব-উল-আলম হানিফ জানান, আগামী নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে আমরা বদ্ধপরিকর। এ নির্বাচনে সকল দলের অংশগ্রহণও আমাদের কাম্য। যেহেতু নির্বাচনের এখনো এক বছর বাকি সেহেতু বিরোধী দলের সাথে আলোচনার সময় এখনো শেষ হয়ে যায়নি। নির্বাচন নিয়ে সংসদে এসে আলোচনা করার জন্য আমাদের পক্ষ থেকে তাদের প্রতি বার বার আহ্বান জানানো হয়েছে। দেশে গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখতে তারা আলোচনায় আসবে এবং সেই আলোচনার মাধ্যমে সবকিছু ফয়সালা হবে এমন আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। এদিকে, প্রধান নির্বাচন কমিশনার সমপ্রতি সাংবাদিকদের বলেছেন, যে কোন ব্যবস্থার মধ্যে নির্বাচন কমিশন আগামী নির্বাচন করতে প্রস্তুত। নির্বাচন পদ্ধতি কি হবে তা ঠিক করবে রাজনৈতিক দলগুলো। নির্বাচন কমিশনের কাজ হবে নির্বাচন অনুষ্ঠান করা।