মহাকবি কালিদাসের রচনা থেকে—

কবি কালিদাসের জীবন ও সাহিত্য নিয়ে একদিন কিছু কথা বলেছি। নিশ্চয় মনে রেখেছ। আজ বলবো ভিন্ন কথা। কালিদাস সাধাসিধে মনের মানুষ ছিলেন। তবে তিনি বাগ্দেবীর কৃপায় হঠাত্ করেই কবি হয়ে গেলেন। শুধু কবি নয়, মহাকবি । তিনি রাজা বিক্রমাদিত্যের সভাকবি ছিলেন বলে বিশেষজ্ঞগণের ধারণা। তাঁর বেশ কিছু রচনার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো : মেঘদূতম , অভিজ্ঞান শকুন্তলম , কুমারসম্ভব , রঘুবংশ ,ঋতুসংহার প্রভৃতি। কিন্তু তাঁর ‘দ্বাত্রিংশত্ পুত্তলিকা’ গ্রন্থটি বাংলায় বহুল আলোচিত না হলেও এই রচনাটি বেশ তাত্পর্যপূর্ণ । এখানে বত্রিশটি পুতুলের শাপ থেকে মুক্তির কথা আছে। বত্রিশটি পুতুল ছিলো দেবী পার্বতীর সখী। স্বয়ং মহাদেব বত্রিশজনের প্রতি বিলাসে প্রবৃত্ত হলেন দেখে দেবী পার্বতী সেই বত্রিশজনকে শাপ দিলেন , তারা নির্জীব পুতুল হয়ে থাকবে। তবে দেবী তাদের সখী বলেই করুণাবশত তাদের শাপাবসানের উপায়ও বলে দিয়েছিলেন। যাক, আমি গল্প বলবো না। বত্রিশটি পুতুলের মাধ্যমে আমরা মহাকবি কালিদাসের যেসব স্মরণযোগ্য উচ্চারণ পাই , সেগুলোই উল্লেখ করবো ++যে ব্যক্তি জ্ঞান এবং ঐশ্বর্যাদি গুণযুক্ত , সে যদি ক্ষণমাত্রও জীবিত থাকে , তার জীবনই সফল হয়। যশ, গুণ এবং ধর্মসমন্বিত জীবনকে তিনি যথার্থ জীবন বলেছেন। ++সম্পদের স্থায়ীত্ব নেই আর মূর্খের বিবেচনা নেই। ++ঘুমন্ত শিশুকে হত্যায় যেমন কোনো পৌরুষত্ব নেই ,তেমনি সত্যনিষ্ঠ- বিশ্বস্ত ব্যক্তিকে প্রবঞ্চনায় কোনো নৈপুণ্য নেই। ++দুর্জন ব্যক্তি সর্বদা নিজের গুণ এবং পরের দোষ প্রকাশে উত্সাহী। সজ্জনেরা কখনই নিজের গুণকীর্তন করে না। ++যার মধ্যে উদ্যম ,সাহস , ধৈর্য, শক্তি, বুদ্ধি ও পরাক্রম — এই ছয়টি গুণ থাকবে , সেই ব্যক্তি যশস্বী হবে । ++সঙ্কল্পের দৃঢ়তা অভিলাষ পূরণে সহায়ক। ++যে ব্যক্তি মনে থাকে সে দূরে থাকলেও কাছে থাকে আর যে মনে নেই সে কাছে থাকলেও তার সাথে ব্যবধান থেকেই যায়। ++যেমন চাঁপা ফুলে সুবাস, মুক্তার কান্ত্মি , ইক্ষুর রস তেমনি ঔদার্যও মানবের স্বাভাবিক গুণ। ++ক্ষমতাশালীর সাথে বিরোধ অনুচিত। ++প্রাজ্ঞজনের অনুবৃত্তি করা কর্তব্য। ++পর-হিত চিন্তায় যিনি নিয়োজিত , তিনিই যথার্থ কৃতি ও সুখী। ++সত্পাত্রে দান করলে তা বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। ++যাদের বিদ্যা নেই, তপস্যা নেই, শীলতা নেই, গুণ নেই, ধর্ম নেই তারা পৃথিবীর বোঝা। ++বিদ্বান ব্যক্তি দরিদ্র হলেও ধনী, মানী ,বরেণ্য। ++যে ব্যক্তি অর্থের জন্য লালায়িত , তার পিতাও নেই, বন্ধুও নেই । কামাতুরের ভয় ও লজ্জা নেই , চিন্তাতুরের সুখ ও নিদ্রা নেই,ুধাতুরের বল ও তেজ থাকে না। ++পিতা-মাতা, ভার্যা ও সন্তানকে শত কষ্টেও প্রতিপালন কর্তব্য। ++সত্সঙ্গে মহত্ আনন্দ লাভ হয়। জ্ঞানচর্চা মানুষের দৃষ্টিভঙ্গী প্রসারিত করে, মানুষকে মহত্ করে। এভাবে কবি বত্রিশটি পুতুলের গল্পের মাধ্যমে আমাদের সামনে মহামূল্যবান কিছু বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন , যা আমাদের আচরণিক- মানসিক বিকাশে এবং ভবিষ্যত্ জীবন গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সহায়ক।