স্বার্থান্বেষীরা যেন আপনাদের পিঠে সওয়ার হতে না পারে

সেনাবাহিনীর পিঠে সওয়ার হয়ে যাতে কোন স্বার্থান্বেষী মহল দেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রা ব্যাহত করতে না পারে, সেইদিকে সর্বোচ্চ দৃষ্টি দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। গতকাল রবিবার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঢাকা সেনানিবাসে জেনারেলদের সম্মেলনে এ আহ্বান জানান। প্রধানমন্ত্রী বলেন, অনেক সময় কুচক্রী মহল হীন স্বার্থে ভিত্তিহীন তথ্য ছড়িয়ে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। আপনাদের অধস্তনরা যাতে এ ধরনের বিরূপ প্রপাগান্ডার শিকার না হন, সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। সেনাবাহিনীর চেইন অব কমান্ডকে সমুন্নত রাখতে হবে। জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাগণকে নৈতিকতা, সততা ও কর্তব্যপরায়ণতার উদাহরণ হিসেবে নিজেদেরকে অধস্তনদের সামনে উপস্থাপন করতে হবে। অধস্তনদের শ্রদ্ধা ও আনুগত্য অর্জন করতে প্রধানমন্ত্রী গুরুত্ব দেন। তাদের সকল প্রয়োজনীয়তা, আশা-আকাঙ্ক্ষা ও চিন্তা-ভাবনার দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। সকালে প্রধানমন্ত্রী ঢাকা সেনাসদর অফিসার্স মেসে (নতুন) এসে পৌঁছালে তাকে প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল তারিক আহমেদ সিদ্দিক, আরসিডিএস, পিএসসি (অবঃ) এবং সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ইকবাল করিম ভুঁইয়া, পিএসসি অভ্যর্থনা জানান। ঐ সময় প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব শেখ ওয়াহিদ উজ জামান, প্রতিরক্ষা সচিব খন্দকার মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান ও প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ এবং ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন। অনেক ত্যাগ, তিতিক্ষা ও সংগ্রামের বিনিময়ে দেশে আজ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কথা উল্লেখ করে সংবিধান ও গণতন্ত্র বিরোধী যে কোন কর্মকাণ্ড সকল শক্তি নিয়ে প্রতিহত করার প্রত্যাশার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, শত বাধা সত্ত্বেও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা হয়েছে। যা মোটেই সহজ কাজ ছিল না। বিচারে বাধাদান ও বন্ধে প্রতিনিয়ত বিশৃঙ্খলা তৈরীর চেষ্টাসহ রাষ্ট্র বিরোধী ষড়যন্ত্র হচ্ছে। এজন্য সকলকে সজাগ থাকার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। দুর্নীতি ও অনিয়মের প্রশ্নে কাউকে ছাড় দেয়া হয়নি এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ডিজিটাল প্রযুুক্তি ছড়িয়ে দিয়ে জীবনযাত্রা সহজ ও স্বচ্ছ করা হয়েছে। জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস নির্মূল করা হয়েছে। দেশ সেবায় সেনাবাহিনীর সার্বক্ষণিক সহযোগিতা পেয়েছি। সেনা অফিসারদের মনোবল ও কর্মস্পৃহা বৃদ্ধির জন্য ক্যাপ্টেন ও সমমান পদবীর কর্মকর্তাদের বেতন স্কেল ৭ম গ্রেড থেকে ৬ষ্ঠ গ্রেডে উন্নীতকরণের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। সেনা সদস্যদের আংশিক অর্থায়নে সেনা আবাসন প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। পাশাপাশি সেনাবাহিনীর অফিসারদের জন্য ডিওএইচএস সম্প্রসারণ ও নতুন প্রকল্প, জেসিও ও অন্যান্য পদবির জন্য একই ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, জলসিঁড়ি প্রকল্পের আওতায় কিছুদিনের মধ্যেই প্রথম পর্যায়ে ৩৬৭টি প্লট অফিসারদের হস্তান্তর করা হবে। দ্রুততম সময়ে ভোটার আইডি কার্ড প্রস্তুত করে সেনাবাহিনী নির্বাচন প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও সহিংসতামুক্ত করেছে। এ পর্যন্ত স্থানীয় সরকার নির্বাচনসহ সকল নির্বাচন শান্তিপূর্ণ ও সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য করেছে সরকার। এখন থেকে মানুষের ভোটাধিকার নিয়ে ছিনিমিনি খেলার সুযোগ আর কেউ পাবে না। জনগণ যাকে ভোট দেবে সেই দেশ পরিচালনার সুযোগ পাবে। মানুষের সমর্থন পেতে হলে তাদের জন্য নিবেদিতভাবে কাজ করার কোন বিকল্প নেই বলে প্রধানমন্ত্রী জানান। নির্মিত পার্বত্য চট্টগ্রামে থানচি ও রুমা ব্রিজ এবং বনানী ওভারপাস ও বেগুনবাড়ি খালসহ হাতিরঝিল সমন্বিত উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ সফলভাবে সমাপ্ত করায় প্রধানমন্ত্রী সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ার কোর এবং স্পেশাল ওয়ার্কস অর্গানাইজেশনকে ধন্যবাদ জানান। এ সকল প্রকল্পের কাজে সেনাবাহিনী দেশবাসীর আস্থা ও প্রশংসা কুড়িয়েছে। চট্টগ্রামের বহদ্দারহাট জংশনে নির্মাণাধীন ফ্লাইওভার দুর্ঘটনার পর এ প্রকল্পের কাজও স্পেশাল ওয়ার্কস অর্গানাইজেশনকে হস্তান্তরের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন। নারায়ণগঞ্জের পাগলায় সেনাবাহিনীর যৌথ তত্ত্বাবধানে ২০১১ সালে একটি বিদ্যুত্ কেন্দ্র নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। ভবিষ্যতে জাতীয় উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে সেনাবাহিনীদের সম্পৃক্ততা আরও ব্যাপকভাবে দেখতে পাবেন বলে আশা প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তার সরকার সর্বদাই জনগণের সেবক হিসাবে দেশ পরিচালনা করতে চায়, কখনও শাসক হিসাবে নয়। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেনাবাহিনীর আধুনিকায়নের লক্ষ্যে ফোর্সেস গোল ২০৩০ এর আলোকে রিয়েল এস্টেট মাস্টার প্ল্যান এর কার্যক্রম চূড়ান্ত করা হয়েছে। এর অংশ হিসাবে ইতিমধ্যে সিলেটের সালুটিকর ও কক্সবাজার রামুতে একটি পূর্ণাঙ্গ সেনানিবাস স্থাপনের জন্য যথাক্রমে ৯২০.৭৮ একর এবং ৬৫৭.১৭ একর জমি সেনাবাহিনীর অনুকূলে হস্তান্তরের প্রস্তাবনা মন্ত্রণালয়ের সক্রিয় বিবেচনাধীন রয়েছে। সরকার সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের আবাসিক সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে চলতি অর্থ বছরেই ৩৬৩ কোটি টাকা পুনঃউপযোজনের মাধ্যমে মোট ৯৭টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। এ প্রকল্পসমূহ বাস্তবায়িত হলে আগামী ২০১৫ সালের মধ্যে সেনানিবাসসমূহে বাসস্থানের ঘাটতি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে। সেনাবাহিনীর উন্নয়ন, সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়নের বিষয়টি বর্তমান সরকার সামনে রেখে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এ বাহিনীর উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় প্রয়োজনীয় খসড়া জাতীয় প্রতিরক্ষা নীতি ও সেনাবাহিনী ফোর্সেস গোল-২০৩০ নির্ধারণের কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সশস্ত্র বাহিনীর উন্নয়নকল্পে সাম্প্রতিক রাষ্ট্রীয় ঋণ চুক্তি অনুযায়ী রাশিয়া হতে এক বিলিয়ন ডলারের সমরাস্ত্র ক্রয়ের চুক্তি হয়েছে। যা ভবিষ্যতে সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর হতে স্বল্প সময়ে সেনাবাহিনীর উন্নয়নের লক্ষ্যে যথাসম্ভব সকল বাস্তবমুখী কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়। এ লক্ষ্যে সেনাবাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও পুনর্গঠন কার্যক্রম ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। এতে সামগ্রিকভাবে আমাদের গর্বিত সেনাবাহিনীর সমর শক্তি ও চলাচল সক্ষমতা আরো অনেক বৃদ্ধি পাবে বলে আশা প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। ইতিমধ্যে সেনাবাহিনীর সেলফ প্রোপেলড রেজিমেন্টের জন্য সেলফ প্রোপেলড গান, অত্যাধুনিক এ্যামুনিশন প্ল্যান্ট, চতুর্থ প্রজন্মের এমবিটি ২০০০ মডেলের ট্যাংক, উইপন লোকেটিং রাডার, আর্মার্ড পার্সোনাল ক্যারিয়ার, আর্মার্ড রিকভারী ভেহিক্যাল ও হেলিকপ্টার ক্রয় করা হয়েছে। যা নিজস্ব সমর শক্তি বৃদ্ধির পাশাপাশি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশনে আরও পেশাগত দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালনে সহায়ক হবে বলে প্রধানমন্ত্রী জানান। এরমধ্যে সমরাস্ত্র কারখানা প্রতি বছর উন্নতমানের ১২০০০ বিডি-৮, রাইফেল উত্পাদনের সক্ষমতা অর্জন করেছে। সেনাবাহিনীকে একটি ত্রিমাত্রিক বাহিনী হিসাবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ পদ্ধতিতে আধুনিকায়ন করার কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। নতুন ফরমেশন ট্রেনিং সিস্টেম, আর্মি ট্রেনিং ডকট্রিন প্রণয়ন, নতুন শারীরিক যোগ্যতা পদ্ধতি, অনলাইনও ই-লারনিং কার্যক্রম চালু হয়েছে। সরকারের বর্তমান মেয়াদে দেশে ও বিদেশে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর যৌথ প্রশিক্ষণ কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ এলাকার সীমাবদ্ধতার কথা চিন্তা করে প্রধানমন্ত্রী ভূমি মন্ত্রণালয়কে চর কেরিং এর ৯ হাজার একর জমি সেনাবাহিনীকে প্রদানের নির্দেশ দেন। দুর্যোগ ও দুর্ঘটনা মোকাবেলায় সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা বিশেষ করে সেনাবাহিনী দ্রুততম সময়ে দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে দেশে ও বিদেশে প্রশংসিত হয়েছে। জাতিসংঘ শান্তি মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ভূমিকা বরাবরই প্রশংসিত হয়েছে। সরকার বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে জাতিসংঘ মিশনে আরও বলিষ্ঠ নীতি নির্ধারনের অংশীদার করার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বিভিন্ন মানদণ্ডের বিবেচনায় আজ বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। এ মর্যাদা সমুন্নত রাখার দায়িত্ব সেনাবাহিনীর।