জীবনের মূল্য পাঁচ লাখ টাকা

বিয়ে বাড়ির অনুষ্ঠান। ধুমধাম করে অনুষ্ঠান চলছে। ব্যবস্থা রয়েছে ভাল খাবার-দাবারের; কিন্তু ডাক পড়ে না পুলিশ সদস্যদের। যখনই কোনো ধরনের অপ্রতিকর ঘটনা তৈরি হয়, তখনই ডাক পড়ে পুলিশের। শুধু আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণই নয়, অনেক সময় নানা ধরনের সামাজিক কর্মকাণ্ডে পুলিশ অগ্রণী ভূমিকা পালন করে; কিন্তু তা সত্ত্বেও পুলিশই সব বদনামের ভাগিদার (!) যা প্রজাতন্ত্রের অন্য কোনো সংস্থার কর্ম-চারীকে শুনতে হয় না। দিন নেই, রাত নেই যেকোনো সময় ঘটনা ঘটলেই পুলিশ সদস্যদের ত্বরিত গতিতে ছুটে যেতে হয়। ৮ ঘণ্টা নির্ধারিত ডিউটি নয়, প্রতিদিনই অতিরিক্ত দায়িত্ব তাদের পালন করতে হয়। সেই পুলিশ সদস্যের জীবনের মূল্য পাঁচ লাখ টাকা। গতকাল রবিবার ভোর রাতে মুন্সিগঞ্জে দায়িত্ব পালন কালে দুর্বৃত্তদের হামলায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর শরিফুল ইসলাম খান নিহত হবার পর তার সহর্মীরা এভাবেই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। পুলিশের অতিরিক্ত আইজি (প্রশাসন) শহীদুল হক বলেন, গত বছর পর্যন্ত দায়িত্ব পালনকালে পুলিশের কনস্টেবল থেকে শীর্ষকর্মকর্তা পর্যন্ত যে কেউ মারা গেলে বরাদ্দ ছিল তিন লাখ টাকা। চলতি বছর পুলিশ সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী তিন লাখ থেকে বাড়িতে পাঁচ লাখ টাকার ঘোষণা দিয়েছেন। আহত হলে আগে বরাদ্দ ছিল ৫০ হাজার টাকা। তা বাড়িয়ে এক লাখ টাকা করা হয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে পরিবার সদস্যের জন্য নিরপত্তা প্রকল্প। প্রতিমাসের বেতন থেকে এ খাতে পদ অনুয়ারী চাঁদা রাখা হয়। এ প্রকল্প থেকে কনস্টেবলরা পাবেন ৩০ হাজার টাকা, সাব-ইন্সপেক্টরা পাবেন ৫০ হাজার টাকা, ইন্সপেক্টরা ৭৫ হাজার টাকা, আর এএসপি থেকে উপরের পদ পর্যন্ত পাবেন ১ লাখ টাকা। পাশাপাশি পুলিশ কল্যাণ তহবিল থেকে মাসিক ভাতা হিসেবে প্রতি মাসে ১৫শ টাকা দেয়া হয়ে থাকে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ওয়ারী থানার অফিসার ইনচার্জ মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম বলেন, পুলিশ সদস্যদের চরম ঝুঁকির মধ্যে কাজ করতে হচ্ছে। ঝুঁকির জন্য যে বরাদ্দ রয়েছে তাও নাম মাত্র। মাত্র ৩৩০ টাকা। অপরদিকে ট্রাফিক বিভাগে যারা দায়িত্ব পালন করেন তাদের মূল বেতনের ৩০ ভাগ প্রদান করার বিধান রয়েছে। তবে সেই টাকা সর্বোচ্চ ২ হাজার ৫০০ টাকার বেশি হতে পারবে না। একজন ট্রাফিক পুলিশকে গড়ে প্রতিদিন ১২-১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করতে হয়। দেখা যায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা নানা ধরনের রোগে আক্রান্ত হয়ে অনেকে খুব অল্প বয়সেই মারা যান। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বেপরোয়া গাড়ি চালকের হাতেও মর্মান্তিকভাবে অনেক ট্রাফিক সদস্যকে প্রাণ হারাতে হয়। অপরদিকে প্রতিনিয়ত জীবন ঝুঁকিতে দিন কাটে মহাসড়কে দায়িত্বরত হাইওয়ে পুলিশ সদস্যদের। পুলিশ সদরদফতর থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, গত ২১ বছরে (১৯৯২ থেকে ২০১২) সারাদেশে দায়িত্ব পালনকালে ৬৩৮ পুলিশ সদস্য সড়ক দুর্ঘটনা ও সন্ত্রাসীদের হাতে নিহত হয়েছেন। এরমধ্যে ১৯৯২ সালে ২০ জন, ৯৩ সালে ২০, ৯৪ সালে ১৪, ৯৫ সালে ২৮, ৯৬ সালে ৩৫, ৯৭ সালে ২৬, ৯৮ সালে ১৯, ৯৯ সালে ৩১, ২০০০ সালে ১৫, ২০০১ সালে ৫৩, ২০০২ সালে ৪৭, ২০০৩ সালে ৫০, ২০০৪ সালে ৪২, ২০০৫ সালে ৩৩, ২০০৬ সালে ২৪, ২০০৭ সালে ২৬, ২০০৮ সালে ২০, ২০০৯ সালে ২৬, ২০১০ সালে ১২, ২০১১ সালে ৫১ জন এবং ২০১২ সালে ৩৮ জন। এর মধ্যে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুই সবচেয়ে বেশি।