যশোরের বিল কপালিয়ায় ফের টিআরএম চালুর পাঁয়তারা

বিল কপালিয়ার চারদিকে চোখ জুড়ানো সবুজ। বিলের বুক চিড়ে বোরো ধানের কচি চারা মনকে জুড়িয়ে দেয় নিমেষেই। সেই চারা সোনারঙা ধান হয়ে কৃষকের গোলাকে দেবে ভরিয়ে। এমনই চলে আসছে যুগ যুগ ধরে। কিন্তু সেই সোনার ধানের বুকে নোনা জল ঢুকিয়ে চাষির স্বপ্নকে দুমড়ে দিতে চায় একটি মহল। কিন্তু রক্ত দিয়ে হলেও আমরা তা হতে দেব না-দৃঢ়চেতা অঙ্গীকারে একাট্টা বিল কপালিয়া পাড়ের মানুষ। মৃত্যুভয় তুচ্ছ করে, রাতের অন্ধকারকে উপেক্ষা করে ঘর ছেড়ে তারা নেমে পড়েছেন বিল রক্ষার লড়াইয়ে। রবিবার রাতে প্রভাবশালীদের কেটে দেয়া বেড়িবাঁধ রাতেই জোড়া লাগিয়ে তারা জানান দিয়েছেন তাদের প্রত্যাশা ও ঐক্যের। যশোরের মনিরামপুর ও অভয়নগর উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে বিল কপালিয়ার অবস্থান। সেখানে টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট (টিআরএম) বা জোয়ারাধার প্রকল্পের উদ্যোগ নিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। কিন্তু জনগণের চাওয়াকে আমলে না নিয়ে অস্ত্রের শক্তিতে টিআরএম বাস্তবায়ন করার উদ্যোগ নেন সংশ্লিষ্ট এলাকার সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের হুইপ শেখ আব্দুল ওহাব এবং অভয়নগর উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুল মালেক। তারা দুজন সংশ্লিষ্ট এলাকার কর্মকর্তাদের সাথে নিয়ে গত বছরের ২ জুন প্রকল্পের কাজ শুরু করতে গিয়ে তীব্র জনরোষের মুখে পড়েন। লাঞ্ছিত হন স্বয়ং হুইপ এবং আহত হন উপজেলা চেয়ারম্যানসহ ৩০ জন। আগুনে পুড়ে সরকারি ৩টি গাড়িসহ ৯টি যানবাহন। এরপরও পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় টিআরএম প্রকল্প চালিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত নিলে স্থানীয়তা আরও বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। আন্দোলনের একপর্যায়ে ১৮ জুন যশোরের জেলা প্রশাসক মো. মোস্তাফিজুর রহমান আন্দোলনকারীদের সাথে সভায় বসে টিআরএম একবছরের জন্য বন্ধের ঘোষণা দেন। কিন্তু সরকারি সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে টিআরএম পক্ষের লোকেরা আবারও প্রকল্প শুরুর উদ্যোগ নেন। একথা জানতে পেরে বিলপাড়ের জনগণ রবিবার দুপুরে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের সাথে দেখা করে টিআরএম বন্ধ রাখার উদ্যোগ গ্রহণের অনুরোধ জানান। ওই রাতে যশোরের জেলা প্রশাসক মো. মোস্তাফিজুর রহমান ইত্তেফাককে বলেন, বেড়িবাঁধ কেটে না দেয়ার জন্য আমি খান টিপু সুলতান (মনিরামপুর আসনের এমপি) ও অভয়নগর উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুল মালেককে অনুরোধ করেছি। র্যাব-পুলিশও তাদের একই অনুরোধ করেছে।’ গতকাল সোমবার সকাল ১০টায় বেড়িবাঁধ কেটে দেয়ার কর্মসূচি ছিল। কিন্তু জনগণের সম্ভাব্য প্রতিরোধ এবং প্রশাসনের নিষেধের প্রেক্ষিতে রবিবার রাতেই বাঁধ কাটার মিশনে নামেন ‘হুইপপন্থি’ অভয়নগর উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুল মালেকের লোকেরা। রাত ১২টার দিকে হরিহর নদীর ৯ নং বেন্টের কাছে অভয়নগর উপজেলা অংশে বিশালাকৃতির এস্কাভেটর দিয়ে বাঁধ কেটে ফেলা হয়। খবর ছড়িয়ে পড়লে কয়েকটি মসজিদের মাইকে গ্রামবাসীদের সেখানে যেতে বলা হয়। এ সময় টিআরএম পক্ষীয়রা গুলিবর্ষণ ও হাতবোমা নিক্ষেপ করে। বালিধা গ্রামের খালেক গাজীর ছেলে হালিম (৪০) গুলিবিদ্ধ এবং খালেক আহত হন। রাত সোয়া তিনটার দিকে বাঁধ কেটে চলে যাবার পর ওই রাতেই বাঁধ বাঁধার কাজে নেমে পড়েন হাজার হাজার গ্রামবাসী। শহর থেকে ৪৫ কিলোমিটার দূরে ঘটনাস্থলে গতকাল সরেজমিনে দেখা যায়, নির্ঘুম রাত কাটানো গ্রামবাসীরা বিল এলাকার ৫-৬ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে পাহারা দিচ্ছেন। অভয়নগর উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুল মালেক সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনজন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা বেড়িবাঁধ কাটার সাথে অভয়নগর উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুল মালেকের লোকেরা জড়িত বলে মন্তব্য করেন। যশোরের জেলা প্রশাসক মো. মোস্তাফিজুর রহমানও ইত্তেফাকের কাছে বেড়িবাঁধ কাটার সাথে উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুল মালেকের সম্পৃক্ততার কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘এলাকার সামগ্রিক পরিস্থিতি পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিবকে টেলিফোনে জানিয়েছি।’