সোনাদিয়া দ্বীপে শুঁটকিতে মেশানো হয় কীটনাশক

বাঙালির অন্যতম প্রিয় খাবার শুঁটকি মাছ। কিন্তু অনেকে জানে না কিভাবে এটি প্রস্তুত বা সংরক্ষণ করা হয়। সমপ্রতি সরেজমিনে কক্সবাজার জেলার মহেশখালী উপজেলার সোনাদিয়া দ্বীপে শুঁটকি আড়তে গিয়ে দেখা গেল ভয়াবহ চিত্র। প্রকাশ্যেই শুঁটকিতে কীটনাশক মেশানো হচ্ছে। সেখানকার চারটি আড়তে মাছ শুকিয়ে শুঁটকি তৈরির কাজ হয়। আড়ত মালিক ও ব্যবসায়ীরা ৪ গ্রুপকে নিয়মিত চাঁদা দিয়ে এ কাজ করছে। সন্ত্রাসী ও ডাকাত গ্রুপদের অত্যাচারের নানা তথ্য ব্যবসায়ী ও শ্রমিকরা জানিয়েছে। স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনও সন্ত্রাসী ও ডাকাত গ্রুপের কাছে অসহায়। ব্যবসায়ী ও শ্রমিকরা জানান, ১৯৬০ সাল থেকে দেশের সর্ববৃহত্ শুঁটকির আড়ত সোনাদিয়া দ্বীপ থেকে সারা দেশের ৮০ ভাগ শুঁটকি সরবরাহ করা হয়ে থাকে। দ্বীপটির শুঁটকির আড়তে দশ সহস্রাধিক শ্রমিক কাজ করে। তারা ১৫ই ভাদ্র থেকে ১৫ই ফাল্গুন পর্যন্ত ৬ মাস সোনাদিয়া দ্বীপে শুঁটকির কাজ করে। এ সময় সমুদ্র থেকে মাছ ধরে জেলেরা আড়ত মালিকদের কাছে বিক্রি করে। জেলেরা জানান, এ সময় প্রায় ৪০ হাজার টন মাছ তারা শুঁটকির আড়ত মালিকের কাছে বিক্রি করে থাকেন। ৮০টি ট্রলার মালিক মাছ ধরার কাজে নিয়োজিত। প্রতিটি ট্রলারে ১৫ থেকে ২০ জন জেলে থাকে। ৩ থেকে ৪ দিন পর্যন্ত গভীর সমুদ্রে গিয়ে মাছ ধরে জেলেরা ট্রলারে বরফ দিয়ে মাছ রেখে দেয়। তবে ফরমালিন মিশ্রিত বরফ দিয়ে মাছ রাখা হয়। এ মাছ একসঙ্গে রেখে দিলে পচে না। বরফকলের মালিকরা ফরমালিন মিশ্রণে বরফ তৈরি করছে। প্রতিদিন টন টন মাছ সোনাদিয়া দ্বীপে শুঁটকির আড়তে জেলেরা বিক্রি করে। এ মাছ সেখানে বাঁশের তৈরি বড় বড় লম্বা মাচার মধ্যে শুকানো হয়। এই আড়তে মাছ শুকানোর পর পোকামাকড় খাওয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এ জন্য শুকনো মাছের উপর কীটনাশক ছিটিয়ে বস্তাভর্তি করা হয়। ৫ জন শ্রমিককে কীটনাশকের দানা পাত্রে রেখে শুঁটকিতে ছিটাতে দেখা গেছে। শ্রমিকরা এ প্রতিনিধিকে জানান যে, স্যার এগুলো পোকা মারার মসল্লা। আড়ত মালিক তাদের একথা বলেছেন। তারা নিয়মিত শুঁটকিতে কীটনাশক মিশিয়ে আসছেন। কীটনাশক ব্যবহার করতে করতে শ্রমিকদের হাতের চামড়ায় অনেক রোগ দেখা দেয়। প্রতিদিন ৬ থেকে ৭ টন শুঁটকি এসকল আড়ত থেকে কক্সবাজারের আড়তে ট্রলার যোগে পাঠানো হয়। এই আড়তে যাওয়ার পর দ্বিতীয় সময় ব্লিচিং পাউডার মেশানো হয়। এ পাউডার মেশানোর পর বছরের পর বছর শুঁটকি রেখে বিক্রি করলে পোকামাকড় কাছেই আসবে না। শুঁটকি থাকবে তরতাজা। এমন তথ্য সোনাদিয়া চর আড়ত মালিকগণ জানিয়েছেন। আণবিক শক্তি কমিশন সূত্রে জানা যায়, একশ বছরেও ব্লিচিং পাউডার মিশ্রিত শুঁটকির তেজস্ক্রিয়া নষ্ট হবে না। ঐ শুঁটকি খাওয়া মানুষ মারা গেলে তার লাশে পাওয়া যাবে ব্লিচিং পাউডারের চিহ্ন। ৪ সন্ত্রাসী গ্রুপ যেভাবে চাঁদা দিয়ে টিকে রয়েছে শুঁটকি ব্যবসায়ীরা ৬ মাসের বেশি সোনাদিয়া দ্বীপে থাকা যায় না। ১৫ ফাল্গুনের পর ধুলাবালি উড়তে থাকে। ঝড়-তুফানের ঝুঁকি রয়েছে। ৬ মাসেই ৮০ ভাগ শুঁটকির কাজ হয়। মহেশখালী উপজেলা পরিষদ কিংবা প্রশাসন থেকে ঐ সময়ের জন্য সোনাদিয়া চরে শুঁটকির জন্য লিজ দেয়া হয়ে থাকে বলে স্থানীয় ইত্তেফাক সংবাদদাতা জানিয়েছেন। শুঁটকির মধ্যে ছুরি, লইট্যা, ফাইস্যা, রূপচাঁদা ও লাক্কা বেশি। এছাড়া অন্যান্য শুঁটকি রয়েছে। ৬ মাস সোনাদিয়া চরে ৮০টি আড়ত মালিক ও শ্রমিকদের ৪টি ডাকাত ও সন্ত্রাসী গ্রুপ কর্তৃক নির্মম নির্যাতন এবং হয়রানি হয়ে আসছি। নিয়মিত চাঁদা দিয়ে সেই হয়রানি থেকে রক্ষা পাননি বলে জানান। একই অবস্থার শিকার হন জেলেরা। জাম্বু গ্রুপ, এনাম গ্রুপ, সেলিম গ্রুপ ও খলিল গ্রুপের সন্ত্রাসী ডাকাত সদস্যরা জেলেদের ধরে নিয়ে সোনাদিয়া ৮০ মাচোরদার ব্রীজের কাছে জিম্মি রেখে দেন। নিম্নে দুই থেকে পাঁচ লাখ টাকা মুক্তিপণ দিয়ে ছাড়া পেয়ে আসতে পায়। মুক্তিপণ আদায়ের যোগাযোগকারী আব্দুল গফুর ওরফে নাগু। নাগুর মাধ্যমে সমঝোতা করে আটক জেলে কিংবা শুঁটকির আড়ত মালিক ছাড়া পাওয়ার সুযোগ মেলে। তবে মুক্তিপণের টাকা বিক্যাশ এর মাধ্যমে লেনদেন করতে হয়। এজন্য নির্ধারিত ৫টি বিক্যাশ রয়েছে বলে শ্রমিকরা জানান। তিন মাস পূর্বে মুক্তিপণের টাকা চাহিদা অনুযায়ী না দেয়ায় এক জেলেকে জবাই করে জাম্বু গ্রুপের সদস্যদের সমুদ্র ভাসিয়ে দেয় বলে তিন আড়ত মালিক ও শ্রমিকরা জানিয়েছেন। সোনাদিয়া চর থেকে ট্রলার ভর্তি শুঁটকিও প্রায় ঐ সব ডাকাত সন্ত্রাসী গ্রুপ নিয়ে আটক রাখে। তিন থেকে চার লাখ টাকা চাঁদার বিনিময়ে ঐ ট্রলার পায়। বিভিন্ন স্থান থেকে ডাকাত সন্ত্রাসী গ্রুপ তরুণীদের এনে রাত ভর সোনাদিয়া চরে অসামাজিক কার্যকলাপ করে থাকে। এ দৃশ্য শ্রমিকরা নীরবে দেখে যাচ্ছেন। এক যুগ ধরে উক্ত ডাকাত-সন্ত্রাসী গ্রুপ বিনা বাধায় বীরদর্পে চাঁদাবাজি ও নানা অপকর্ম সোনাদিয়া চরে করে আসছে। প্রশাসন দেখেও না দেখার ভান করে থাকে। কারণ হিসাবে আড়ত মালিকরা ও শ্রমিকরা জানান, নাসুর মাধ্যমে পুলিশ প্রশাসন এবং স্থানীয় ক্ষমতাধর রাজনৈতিক চরে চাঁদার ভাগ ডাকাত-সন্ত্রাসী গ্রুপ নিয়মিত পাঠিয়ে দেয়। এ কারণে পুলিশের একশ্রেণীর কর্মকর্তা এ সব ডাকাত-সন্ত্রাসী গ্রুপের সোর্স হিসেবে কাজ করে থাকে বলে উক্ত শ্রমিকরা জানান। সোনাদিয়ায় বসবাসকারী অধিকাংশ পরিবারের আয়ের উত্স শুঁটকি ও মাছ ধরা। চাঁদা দিয়ে তাদের কোন রকমে পেট চলে বলে আড়ত মালিক ও শ্রমিকরা জানান। কক্সবাজার জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বাবুল আকতার জানান, সোনাদিয়া চর ও আশেপাশে ডাকাতদের উপদ্রব রোধে পুলিশ মাঝে মাঝে অভিযান চালায়। কিন্তু পুলিশের অভিযান চালানোর মতো দ্রুতগতির ট্রলার নেই। ভাড়া করে যেতে যেতে সেই সংবাদ পেয়ে ডাকাতরা নিরাপদ স্থানে চলে যায়। পুলিশের পকক্ষ থেকে নজরদারি রয়েছে বলে তিনি জানান। বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকের অভিমত কীটনাশক ও ব্লিচিং পাউডার মিশ্রিত শুঁটকি রান্না করে খেলেও নিরাপদ নয়। ক্যান্সার, কিডনি, লিভার, গাইনি ও শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকগণ বলেন, এ শুঁটকি খেলে ক্যান্সার, কিডনি, লিভারসহ নানা রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। গর্ভবতী মা এ ধরনের শুঁটকি খেলে বিকলাঙ্গ শিশুও জন্ম হতে পারে।