নতুন দিনের যাত্রা

শ্রমজীবী আমিন মিয়া। সুখের সংসার তার। এক ছেলে এক মেয়ে। আর তারা দু’জন। মোট চারজন। দিনভর আমিন মিয়া পরিশ্রম করে। সারাদিনের পরিশ্রম শেষে যখন সোনার টুকরা ছেলে-মেয়ের মুখটি দেখে সব ক্লান্তি দূর হয়ে যায়। ভুলে যায় সমস্ত দুঃখ-যন্ত্রণা। আমিন মিয়ার শরীর স্বাস্থ্য বেশ। অল্প পরিশ্রম তাকে কাবু করতে পারে না। আমিন মিয়া ভোর থেকে শুরু করে পশ্চিম আকাশে সূর্য ডুবে যাওয়া পর্যন্ত কাজ করতে থাকে। কাজই তার জীবন, কাজই তার সাধনা। আর স্বপ্ন দেখে এক সোনালি ভবিষ্যতের। ভাগ্যকে সে জয় করবে। গরীব হয়ে জন্ম গ্রহণ করা সে অন্যায় মনে করে না, কিন্তু গরীব হয়ে থাকাকে সে কিছুতেই মেনে নিতে পারে না। তার দু’চোখ ভরা স্বপ্ন। আগামীর নবদিগন্তের বিজয়ের। অর্থ সম্পদে সে গরীব হতে পারে, কিন্তু তার মনটা গরীব নয়। সে ভাগ্যকে কিছুতেই মেনে নিতে পারে না। দুরন্ত তার ছুটে চলা। ভাগ্যের কাছে সে হার মানবে না। একটু সময়ও আমিন মিয়া নষ্ট করে না। সারাদিন কাজের মধ্যে ডুবে থাকে। অনেক রাত ধরে ছেলে-মেয়েকে লেখাপড়া করায়। ক্লাসের পাঠ শেষ করে তবেই তাদের ছুটি। বড় ছেলেটা ক্লাস টু-তে পড়ে। মেয়েটা পড়ে ক্লাস ওয়ান-এ। মেয়েটা খুব মেধাবী। আমিন মিয়ার স্ত্রী দীর্ঘদিন প্যারালাইজড হয়ে বিছানায় পড়ে আছে। এ জগতে তার কোনো দায়িত্ব নেই। বরং তার দায়িত্বই আমিন মিয়াকে নিতে হচ্ছে। ঘর-বাইর দু’টিই আমিন মিয়াকে সামলাতে হয়। শান্ত ও ঝুমু ওরা কখনো আলাদা করে বাবা মা কী জিনিস ভাবতে পারেনি। যখনি ওরা একটু ভালো-মন্দ বুঝতে শিখেছে; তখন থেকেই ওদের মায়ের এ দুরবস্থা। আমিন মিয়া প্রতিদিন সকাল সকাল ঘুম থেকে ওঠে। সূর্যের সাথে প্রতিযোগিতায় চলে সারাদিন তার অবিরত কাজ। সে কখনো সূর্যের কাছে হার মানেনি। পশ্চিম আকাশে সূর্যের রক্তিম আভা বিলীন হওয়ার আগেই সে তার সমস্ত কাজ গুটিয়ে নেয়। সূর্য আমিন মিয়ার নিত্যসঙ্গী। যার আলোয় জেগে ওঠে সে। যার অস্ত যাওয়ার সাথে সাথে তার প্রত্যাবর্তন। আজো পূর্ব আকাশে লাল টুকটুকে থালার মতো সূর্য উঠেছে। সূর্য অনেক দূর এগিয়েছে। আমিন মিয়া আর ঘুম থেকে জাগছে না। তার শরীরটা কেমন জানি করছে। এমনতো এর আগে কখনো হয়নি। আমিন মিয়া কিছুতেই নিজেকে বিছানা থেকে টেনে তুলতে পারছে না। বারবার কে জানি তাকে ঝাপটে ধরে রাখছে। কিছুতেই সে বিছানা থেকে উঠতে পারছে না। সকাল থেকে আমিন মিয়া কেমন জানি করছে। কিছু বলতে পারছে না। শুধু দু’চোখ বেয়ে অশ্রু ঝরছে। যেন আষাঢ়ের বৃষ্টি। নিমিষেই আমিন মিয়ার প্রাণ পাখিটা দেহ পিঞ্জর থেকে উড়ে গেলো। ছেলে-মেয়েরা কিছুই বুঝতে পারছে না। পাড়ার সবাই ভিড় জমিয়েছে। অনেকে কাঁদছে। ওরা বাবার গালে চুমু দিচ্ছে আবার চলে যাচ্ছে। ওরা কিছুই বুঝতে পারছে না। স্ত্রীর দু’চোখ গড়িয়ে ফোঁটায় ফোঁটায় জল পড়ছে। যেন আর হাউ মাউ করে কী যেন বলছে। ভাষা বোঝা বড়ো দায়। আপনজন হারানোর ভাষা। এসব দেখে শিশুদের মনটা খারাপ। ওরা কী হয়েছে বুঝতে না পারলেও কিছু যে একটা হয়েছে তা কিন্তু বুঝতে পেরেছে। আমিন মিয়াকে দাফনের জন্য নেয়া হলো। বাচ্চারা চিত্কার করে উঠলো, আমার বাবাকে নিয়ে কোথায় যাচ্ছেন। আমার বাবাকে আপনারা নেবেন না। আমার আম্মু অসুস্থ। ওরা আর এখন ওদের বাবাকে প্রতিদিনের মতো বাসায় দেখে না। মানুষের দয়া-দাক্ষিণ্যে চলতে থাকে ওদের দিন। এভাবে আর কতদিন চলবে। মানুষের অনুগ্রহে। দিন বাড়তে থাকে মানুষের সহানুভূতি কমতে থাকে। ভাগ্যের লিখন ওদের আজ পথে নামিয়েছে। সারাদিন দুই ভাই বোন যা রোজগার করে তা দিয়ে ওদের সংসার চলে। দুই ভাই বোন পরিশ্রম করে সংসারের কাজও করে। রাত পোহালেই নতুন দিনের যাত্রা শুরু করে। মানুষের দ্বারে দ্বারে ওদের পদযাত্রা। এভাবেই ওদের দিন কাটে। আজ ওরা খুব ক্লান্ত। পরিশ্রান্ত। অনেক পথ হেঁটেছে। ভাগ্যে দুপুরের খাবার জোটেনি। ক্ষুধায় পেট চো চো করছে। পা সামনের দিকে আর চলছে না। ক্লান্তিতে চোখ বুঝে আসছে। ওরা দু’জন দুটো ব্যাগ কাঁধে করে হাঁটছে। পথিমধ্যে এক সাহেবের সাথে দেখা। স্যার, আজ সারা দুপুর ধরে আমাগো পেটে কিছু পড়েনি। স্যারগো, দশটা টাকা দ্যান। আমরা কিছু খামু। ওদের কোমলতা সবার হূদয়কে ছুঁয়ে যাবে। স্যারও ওদের এড়াতে পারলেন না। কী সাধ্য আছে তাঁর। স্যার ওদের বাসায় নিয়ে পেটভরে খেতে দিলেন। ওরা যখন দুধ দিয়ে ভাত খাচ্ছে মনে হচ্ছে দুধের শুভ্রতার সাথে ওদের হাসির শুভ্রতা একাকার হয়ে যাচ্ছে। মুখ জুড়ে অতৃপ্ত হাসি। যে হাসি পরম আনন্দের হাসি। ভালোবাসার হাসি। স্যার খাবার শেষে দু’জনের হাতে দু’টা দশটাকার নোট দিয়ে বললেন, তোমরা পরে কিছু খেয়ে নিয়ো। ওদের ক্ষণিকের আনন্দের মাঝে লুকিয়ে আছে দু’টি ছোট্ট জীবনের কুসুম কোমল স্বপ্ন। মানুষের বাঁচার পরম ইচ্ছা। স্যারের কাছ থেকে ওরা দু’জন চলে গেলো ঠিকই, কিন্তু স্যারের হূদয় থেকে ওদের কষ্টের সেই স্মৃতিচিহ্ন কিছুতেই কাটছে না। স্যারের অনেক নামিদামি ছাত্র আছে। স্যারের অনেক কাছের ছাত্র রহমান। রহমান স্যারকে অসম্ভব ভালোবাসে। রহমান নিঃসন্তান। স্যার বললো, রহমান আমি তোমায় একটা অনুরোধ করবো, তুমি রাখবে? স্যার আমি কখনো আপনার কথাকে উপেক্ষা করিনি। আজো করবো না। সেই শিক্ষা আপনি আমাকে দেননি। তোমার কথা শুনে খুশি হলাম বাবা। রহমান তুমি দুটো বাবাহারা সন্তানকে আশ্রয় দাও। যারা তোমার আশ্রয়ে প্রকৃত মানুষ হবে। আজ স্যার জীবিত নেই। কিন্তু স্যারের উদারতা আজো জীবন্ত। রহমানের মনে স্যারের জন্য আজো আছে অফুরন্ত ভালোবাসা। রহমানের সামনে স্যার যেনো আজো এক আলোর দিশারী। স্যারের ইচ্ছাকে বুকে ধারণ করে সে আজো বেঁচে আছে।