শেরেবাংলা নগর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়

ফাইজা মোস্তফা, সদস্য নম্বর :১৪৯৯ বাংলাদেশের মধ্যে যে কয়টি বিদ্যালয় উচ্চ স্থানে রয়েছে ‘শেরে বাংলা নগর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়’ তারমধ্যে একটি। ১৯৭০ সালে তত্কালীন পাকিস্তান সরকার সরকারি চাকরিজীবীদের সন্তানদের জন্য ‘সেন্টাল গার্লস হাইস্কুল’ নামে ঢাকার আইয়ুব নগরে এ সরকারি বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা লাভের সাথে সাথে এলাকার নাম পাল্টে হয়ে যায় শেরে বাংলা নগর। বাংলার মহান কিংবদন্তি এ.কে. ফজলুল হক তার বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবনের স্বীকৃতিস্বরূপ শেরে বাংলা অর্থাত্ বাংলার বাঘ উপাধিতে ভূষিত হন। এই কিংবদন্তির নামানুসারে এলাকার নাম রাখা হয় শেরেবাংলা নগর। এ কারণে বিদ্যালয়ের নামে আসে পরিবর্তন, রাখা হয় ‘শেরে বাংলা নগর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়’। শুরু থেকেই বিদ্যালয়টি দুটি শিফট এবং দুটি ভাষায় শিক্ষার মাধ্যম চালু ছিল। প্রভাতী শাখায় উর্দু এবং দিবা শাখায় বাংলা ভাষায় শিক্ষা দেয়া হতো। স্বাধীনতার পর দুটো শাখার শিক্ষার মাধ্যম হলো বাংলা ভাষা। ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত প্রভাতী শাখায় প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত ছেলে-মেয়ে একসাথে শিক্ষা গ্রহণ করতো। পরবর্তীতে শুধু মেয়েদের ভর্তি করা হতো এবং পর্যায়ক্রমে একটি পুরোপুরি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে পরিণত হলো। ১৯৮০ সাল থেকে উভয় শাখায় ১ম-১০ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা শুরু হয়। ২০০৭-২০০৮ শিক্ষাবর্ষে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে এ বিদ্যালয়ের সাথে যুক্ত হয়েছে একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণি। প্রাথামিকভাবে বিজ্ঞান ও ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ শুরু করা হয়। বিদ্যালয়ের সকলের আন্তরিক সহযোগিতার মাধ্যমে এ শাখার শিক্ষা কার্যক্রম সুচারুভাবে চালিয়ে নেবার চেষ্টা অব্যাহত আছে। ঢাকা মহানগরীর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান সবুজ শ্যামলিমায় ঘেরা ‘শেরে বাংলা নগরে’ এক সুন্দর মনোরম এবং মনোমুগ্ধকর পরিবেশে বিদ্যালয়টির অবস্থান। এর উত্তরে বাংলাদেশ বেতার ভবন, দক্ষিণে ‘শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়’, পূর্বে সরকারি আবাসন ভবন এবং পশ্চিমে রয়েছে বিশ্বব্যাংক ও এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংকের বাংলাদেশস্থ কার্যালয়। ভৌত অবকাঠামোঃ তিন একর জমির উপর নির্মিত লাল সিরামিক ইটের নান্দনিক গাঁথুনিতে সুউচ্চ প্রাচীর ঘেরা এই বিদ্যালয় ভবনটি ইংরেজি U প্যাটার্নের তিন তলা ভবন যার সামনে সবুজ বিস্তৃত মাঠ, ক্রীড়ামোদী শিক্ষার্থীদের মনে প্রতিযোগিতা ও সৌভ্রাতৃত্বের মাধ্যমে বিশ্বজয়ের মন নিয়ে সগৌরবে মাথা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এই বিদ্যালয়ে যথাক্রমে ২টি ভবন, ৩৮টি শ্রেণিকক্ষ, ১টি প্রধান শিক্ষিকার কক্ষ, ২টি সহ-প্রধান শিক্ষকের কক্ষ, ২টি সহকারী শিক্ষকের কক্ষ, ১টি অফিস কক্ষ, ১টি কম্পিউটার ল্যাব, ২টি বিজ্ঞানাগার, ১টি কমন রুম, ১টি নামাজ ঘর, ১টি টিফিন রুম/টিফিন তৈরির ঘর, ১টি স্বাস্থ্য ইউনিট, ১টি গার্লস গাইডস রুম, ১টি গার্হস্থ্য অর্থনীতি ল্যাব, ১টি বড় খেলার মাঠ আছে। আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠার জন্য প্রয়োজন শৃঙ্খলাবোধ, নিয়মানুবর্তিতা ও আনুগত্যবোধ। এ সত্যের বাস্তবায়নের জন্য প্রতি কার্যদিবসের শুরুতে ছাত্রী-শিক্ষক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। পবিত্র কোরআন শরীফ তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে ভাল কাজ করবার, দেশ গড়ার ও সেবা করার সর্বোপরি এ বিদ্যালয়ের সকল নিয়ম-কানুন মেনে চলার দীপ্ত শপথে ব্রতী হয়ে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীরা আমাদের প্রতিদিনের বিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরু করে। বছরের শুরুতেই আমাদের হাতে তুলে দেয়া হয় পবিত্র কোরআন ও হাদীসের অমর বাণী ও বিদ্যালয়ের নিয়ম-শৃঙ্খলা সম্বলিত দৈনিক পাঠ বিবরণী। সেটিতে তারা দৈনিক পাঠের বিবরণী লিপিবদ্ধ করে থাকে। এর ফলে আমাদের অভিভাবকবৃন্দ বিদ্যালয়ের কার্যক্রম সম্বন্ধে নিয়মিতভাবে অবহিত হতে পারেন। এতে সারা বছরের ছুটির তালিকা, শ্রেণি পরীক্ষা, সাময়িক ও বার্ষিক পরীক্ষার তালিকা সম্বলিত একটি দিনপঞ্জি সংযুক্ত আছে। তাছাড়া সংযুক্ত আছে ছাত্রীদের আচরণবিধি, বিশেষ নিয়মাবলী এবং সম্মানিত অভিভাবকবৃন্দের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণরূপে ছোট্ট একটি নোটিস যা পড়ে আমরা শিক্ষাজীবন সুশৃঙ্খল ও নিয়ম অনুযায়ী গড়ে উঠতে সক্ষম হব। ডায়েরির নির্দিষ্ট কলামে আমাদের এবং অভিভাবকবৃন্দের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি লিপিবদ্ধ করা হয়। সবশেষে রয়েছে অভিভাবকদের স্বাক্ষর ও প্রধান শিক্ষিকার ধন্যবাদ জ্ঞাপন। ২০০০ সাল থেকে এ বিদ্যালয়ে ঢাকা মহানগরীর ২৪টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে সর্বপ্রথম কম্পিউটারে সফটওয়্যারের মাধ্যমে ফলাফল প্রস্তুত করার কাজ শুরু হয়। ১ম-দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত বোর্ডের নিয়মানুসারে গ্রেডিং পদ্ধতিতে ফলাফল তৈরি ও ঘোষণা করা হয়। ১ম-৭ম শ্রেণি পর্যন্ত ৫টি গ্রেড এবং ৮ম-১২ (দ্বাদশ) শ্রেণি পর্যন্ত ৭টি গ্রেড চালু হয়। একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য আমাদের দক্ষ মানব সম্পদ তৈরির উদ্দেশ্যে নতুন ভবনে রয়েছে কম্পিউটার ল্যাব। যেখানে রয়েছে সব উন্নত মানের (Dell) ডেল কম্পানির কম্পিউটার। ২০১১ সালে মূল ভবনের ২০১ নম্বর রুমে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকগণ আমাদের অধিক কার্যকর ও যুগোপযোগী শিখন প্রক্রিয়ার ক্লাস নিয়ে থাকেন। লাইব্রেরিঃ জ্ঞানপিপাসু শিক্ষার্থীদের জন্য লাইব্রেরি গঠিত। এই লাইব্রেরিতে রয়েছে দেশি-বিদেশি লেখকদের লেখা নানা জীবনী, রূপকথা, ছবির ভাণ্ডার ইত্যাদি। এগুলো নিয়ে আমাদের পাঠাগার/লাইব্রেরি। প্রায়োগিক শিক্ষাই প্রকৃত শিক্ষা। তাই এখানকার ছাত্রীদের হাতে-কলমে শিক্ষা দেয়ার জন্য রয়েছে আধুনিক যন্ত্রপাতি সম্বলিত পদার্থ বিজ্ঞান, রসায়ন, জীববিজ্ঞান ও উচ্চতর গণিতের গবেষণাগার। বিদ্যালয়ে রয়েছে একটি স্বাস্থ্যকর টিফিন কক্ষ। যেখান থেকে সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকমণ্ডলীর দক্ষ তদারকির ফলে প্রতিদিন সুষ্ঠুভাবে টিফিন সরবরাহ হয়। হল রুমঃ বিদ্যালয়ে রয়েছে একটি বিশাল হল রুম। এখানে বিভিন্ন সভা ও অনুষ্ঠানাদি অনুষ্ঠিত হয়। নামাজ কক্ষঃ দিবা শাখার ক্লাস শুরু হয় ১২ :২০ মিনিট থেকে। তাই যোহর ও আছর নামাজ ঠিকমত আদায়ের লক্ষ্যে আমাদের জন্য রয়েছে নামাজ কক্ষ। শুরু থেকেই এ বিদ্যালয়ে সেন্ট্রাল স্কুল হেলথ ক্লিনিক নামে একটি সরকারি হেলথ ইউনিট চালু আছে। এই ইউনিটে রয়েছে একজন মেডিক্যাল অফিসার, একজন নার্স এবং ২ জন স্টাফ-এর দায়িত্বে নিয়মিতভাবে আমাদের স্বাস্থ্য পরিচর্যা কার্যক্রম পরিচালিত হয়। নতুন বছরের সকল কার্যক্রমের শুভ কামনায় পবিত্র মিলাদ মাহফিল-এর মধ্য দিয়ে বার্ষিক কর্মসূচির সূচনা করা হয়। এ অনুষ্ঠানে হযরত মুহাম্মদ (স.)-এর শানে দুরুদ, মুনাজাত, বিভিন্ন ইসলামী বিষয়ক প্রতিযোগিতা, হামদ, নাত, ক্বিরাত, রচনা লিখন এবং পোস্টার লেখার আয়োজন করে বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করা হয়। প্রতি বছর জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। একটি জাঁকজমকপূর্ণ পরিবেশে এ অনুষ্ঠানটি সম্পন্ন হয়। এদিন বেশিরভাগ ছাত্রীই বিভিন্ন ক্রীড়া নৈপুণ্য, শরীর চর্চা, ডিসপ্লে এবং কুচকাওয়াজ প্রদর্শন করে থাকে। এ দিনটির আকর্ষণীয় বিষয় হলো যেমন খুশি তেমন সাজো। সবশেষে প্রধান অতিথি ও শিক্ষিকা বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করেন। প্রতি বছরই বিভিন্ন শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মধ্যে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। বিজয়ীদের পুরস্কৃত করা হয় বিভিন্নভাবে। আমরা যে ন্যায় ও সত্যের পথে অবলম্বন করে শিক্ষা জীবন শেষে পরিবার, সমাজ তথা দেশের জন্য নিজেদের গড়ে তুলতে পারি এ লক্ষ্যকে সামনে রেখেই এ বিদ্যালয়ে গার্লস গাইডস ও গার্ল-ইন-স্কাউট কর্মসূচি চালু হয়েছে। বিদ্যালয়ের বার্ষিকীতে ছাত্রীদের সাহিত্য সাধনার প্রথম সোপান, মুখপাত্র ও বিদ্যালয়ের স্বরূপ। বিদ্যালয়ের বার্ষিক কর্মকাণ্ডের প্রতিবিম্বিত এক প্রতিচ্ছবি। আমাদের কাঁচা লেখা ও শিক্ষকদের তত্ত্ব ও তথ্যসমৃদ্ধ লেখার সমন্বয়ে প্রধান শিক্ষিকার সার্বিক তত্ত্বাবধানে ও যোগ্য সম্পাদকের সম্পাদনায় বার্ষিকী প্রকাশিত হয়। ২০১২ সালের প্রকাশিত প্রতীতি নতুনভাবে সকলের কাছে নানা মাত্রায়, স্বতন্ত্র মহিমায় আদৃত হবে বলে আমাদের বিশ্বাস। সকল জাতীয় দিবসের (স্বাধীনতা, জাতীয় দিবস, বিজয় দিবস) ওপর ভিত্তি করে আমরা আবৃত্তি, দেশাত্মবোধক গান, বক্তৃতা, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করি। পরে আলোচনাসভায় আমরা ও শিক্ষক উক্ত বিষয়ের ওপর বক্তব্য দিয়ে থাকি। বিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাকাল থেকে বর্তমান প্রধান শিক্ষিকার পূর্ব পর্যন্ত ১৪ জন স্বনামধন্য প্রধান শিক্ষিকা সাফল্যের সাথে স্ব-স্ব দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে আমাদের প্রধান শিক্ষিকা হলেন নাজমুন নাহার শাহীন। ২৬-০৬-২০০৭ তারিখে তিনি এ বিদ্যালয়ে যোগদান করেন। তিনি তার দূরদর্শিতা, নিষ্ঠা, আন্তরিক ও বিচক্ষণতার সাথে সুদক্ষ শিক্ষকমণ্ডলীকে নিয়ে স্কুল কর্মকাণ্ডকে ঢেলে সাজানোর ফলে বর্তমানে বিদ্যালয়টি তার অতীত ঐতিহ্যের সাথে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। যা স্কুলের ভাবমূর্তিকে উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর করেছে।