স্ফুলিঙ্গ থেকেই আগুন জ্বলবে
প্রকাশ : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২১:৫১
বেশ কিছুদিন ধরেই একটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ধারাবাহিকভাবে ছাত্ররাজনীতি বন্ধের কথা বলছেন। প্রথমে ছাত্রলীগ তারপর ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের রাজনীতি বন্ধে অনেকটা নিরপেক্ষ ভূমিকায় থেকে জনমত তৈরির আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন। জামাত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধের মতো তিনি ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের পক্ষেও জনমত সৃষ্টির জন্য কাজ করে চলেছেন। তিনি তাঁর বক্তব্যের সপক্ষে বিশ্বজিত্ হত্যাকাণ্ড, সমসাময়িক সময়ে সংগঠিত ছাত্রসংগঠনগুলোর সহিংস কর্মকাণ্ডের দিকে জনগণের দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে চেয়েছেন । তিনি বলতে চেয়েছেন, ছাত্ররাজনীতি আজ তার আদর্শ ছেড়ে টেন্ডারবাজি, আধিপত্য বিস্তার ও সহিংস কর্মকাণ্ডের মধ্যে জড়িয়ে পড়েছে। ব্যাপারটা অবশ্যই নিন্দনীয়। কিন্তু তিনি কি আমাদের একটু কষ্ট করে বলবেন—ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করে তিনি কোন্ উপায়ে দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের পরিবর্তন আনবেন। আসুন আমরা একটু ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকাই। যদি প্রশ্ন করি—৫২’র ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ৯০’র গণঅভ্যুত্থানে কারা নেতৃত্ব দিয়েছিল? জানি সবাই এক বাক্যে স্বীকার করে নেবেন—ছাত্ররা। হ্যাঁ, সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ ছাড়া এই আন্দোলন কখনোই সফল হতো না। নেতৃত্বে কিন্তু এই ছাত্ররাই ছিল। আমরা ছাত্ররা নিজেদের মধ্যে সুকান্তকে ধারণ করি, নজরুলকে ধারণ করি, অন্যায়ের প্রতিবাদে জীবন দিতেও কুণ্ঠাবোধ করি না। ছাত্রদের দাবিয়ে রাখতে পারলে বৃহত্ অন্যায়ও সহজে চালিয়ে দেওয়া যাবে। বাধা দেয়ার মতো কেউ এগিয়ে আসবে না। রাজনীতিবিদদের নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন সহজ হয়ে যাবে। এই জন্যই কি ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করতে চাওয়া? ঢালাওভাবে ছাত্ররাজনীতির মুণ্ডপাত করা হয়। সাধারণ ছাত্রদেরও আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়। এখন আমরা যদি বলি, এই আপনারাই আমাদের এ অবস্থার জন্য দায়ী, আপনাদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভূমিকার কারণে আজ বিশ্বজিত্ খুন হয়েছে, ছাত্ররা টেন্ডারবাজি করছে। আপনাদের এই তথাকথিত নিরপেক্ষতা নেহাতই ভান। আসুন ব্যপারটা একটু খতিয়ে দেখি।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটি ছাত্রকে মানসম্মত শিক্ষার একটি পর্যায় পর্যন্ত যেতে পুরোটুকুই তার পরিবারের ওপর নির্ভরশীল হতে হয়। ধরি এই পর্যায়টা সম্মান শ্রেণি পর্যন্ত। অর্থাত্ এই ১৬ বছর পড়াশোনা তার পরিবারের কল্যাণে সে লাভ করে। কিন্তু যে পরিবারটি তাকিয়ে থাকে তার সন্তান শিক্ষা লাভ শেষে একটা মানসম্মত চাকরি পেয়ে তাদের শেষ জীবনের সহায় হবে, সেই ছেলেটি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি থেকে বের হয় সে কী পাচ্ছে? জনগণের টাকায় এক শ্রেণির মানুষ দামি গাড়ি নিয়ে ঘুরছেন, হাজার কোটি টাকা খরচ করে নাম কামাচ্ছেন, অথচ একটি শিক্ষিত ছেলেকে একটি চাকরি দিতে পারছেন না। ছেলেটিকে কীভাবে নৈতিকতা শিক্ষা দেবেন? তার পেটে কোনো খাবার না দিয়ে তার নৈতিকতা তৈরি করতে পারবেন না। শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য মনুষ্যত্ব তৈরি করা হলেও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শিক্ষা হলো গরিবের অবলম্বন, বৃদ্ধের সান্ত্বনা, ধনীর অলঙ্কার। একটি শিক্ষিত ছেলে দেশের, সঙ্গে তার নিজের ও পরিবারের ভাগ্য পরিবর্তন করতে চায়। কিন্তু তৈরি এই সিস্টেমে তাদের ভাগ্য পরিবর্তনের কোনো সুযোগ নেই। কারণ তাদের ভাগ্য পরিবর্তন হলে দায়ী ব্যক্তিদের ভণ্ডামি, শঠতা ফাঁস হয়ে যাবে। তাই ‘তাঁরা’ সুপরিকল্পিতভাবে ছাত্ররাজনীতিকে করায়ত্ত করে রাখেন। নিজেদের রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসাবে সাধারণ ছাত্রদের ব্যবহার করেন। ঐ ছাত্রটি তখন ভাগ্য পরিবর্তনের অন্য উপায় না দেখে ‘তাঁদের’ দ্বারস্থ হয়। এদেশে মামা-চাচার জোর নাকি অনেক বেশি। ‘তাঁদের’ সান্নিধ্যে থাকলে ভাগ্য পরিবর্তন হবে এই আশাতে কতিপয় ছাত্র ‘তাঁদের’ এজেন্ডাগুলো বাস্তবায়ন করতে গিয়ে এবং ‘তাঁদের’ আধিপত্য বজায় রাখতে গিয়ে বিশ্বজিেক খুন করে শক্তির মহড়া দেয়। এই মহড়া যতটা না নিজেদের কারণে করে, তার চেয়ে বেশি করে ‘তাঁদের’ শক্তির সক্ষমতা প্রমাণ করতে। অথচ সমস্ত দোষ গিয়ে পড়ে ঐ ছাত্রদের ঘাড়ে।
আপনি রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী যেই হন না কেন আপনাকে বলছি— আজ ছাত্রলীগ নয়, ছাত্রদল বা ছাত্রশিবিরও নয়, স্বতন্ত্র পরিচয়ে যদি ছাত্ররা অন্যায়ের প্রতিবাদ করে, নিজেদের অধিকার আদায়ে মাঠে নামে কী করবেন তখন? সাধুবাদ জানাবেন, ন্যায্য দাবিগুলো পূরণ করবেন নাকি ১) আলোচনার নামে কালক্ষেপণ করে আন্দোলনকে মাঠে মেরে দেবেন। ২) দল উপদল তৈরি করে আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে নেয়ার চেষ্টা করবেন। ৩) বিরোধী দলের ষড়যন্ত্র হিসাবে আখ্যায়িত করে আন্দোলন দমানোর চেষ্টা চালাবেন। ৪) পেপার স্প্রে মেরে ছত্রভঙ্গ করবেন। ৫) অবস্থা বেগতিক দেখলে জল-কামান, বুলেট ব্যবহার করবেন। ৬) এক শ্রেণির বুদ্ধিজীবী দিয়ে মিডিয়াতে আলোচনার ঝড় তুলবেন।
আপনাদের হাত থেকে শ্রদ্ধেয় শিক্ষকরাও রেহাই পাননি। সেখানে আমরা সাধারণ ছাত্ররা আপনাদের কাছ থেকে ভালো ব্যবহার পাবো এই আশাও রাখি না। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিন। আপনাদের উদ্দেশ্য সফল হবে না। গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি তারুণ্য একে হাসিমুখেই বরণ করবে। আশা করবো আপনারা আপনাদের রাজনৈতিক কূটবুদ্ধি দিয়ে আন্দোলনকে নস্যাত্ করতে গিয়ে ছাত্রদের পিঠ দেয়ালে ঠেলে দেবেন না। শুধু এইটুকু বলতে চাই—সময় এসেছে এগিয়ে আসার। এক মনীষী বলে গিয়েছেন— রাজনীতি ব্যাপারটা শুধু রাজনীতিবিদদের হাতে ছেড়ে দেয়া উচিত নয়, কেননা এখানে আমাদের স্বার্থ জড়িত থাকে। সেই দিন খুবই সন্নিকটে। যেদিন আমরা ছাত্ররা আপনাদের লেজুড়বৃত্তির ছাত্রসংগঠন হিসেবে নয়, সাধারণ ছাত্র হিসেবে মাঠে নেমে আমাদের ন্যায্য অধিকারকে আদায় করে নেবো। মিশর, তিউনিশিয়ার মতো বিপ্লব আজ আমাদের দেশে অবশ্যম্ভাবী। তৈরি থাকুন, স্ফুলিঙ্গ থেকেই আগুন জ্বলবে।
ঢাকা