সৌন্দর্যের বিপণি-বিতান!

‘লুকিং গর্জিয়াস!’ ‘ইউ লুক বিউটিফুল টুডে’, কিংবা ‘তোকে আজ অনেক সুন্দর লাগছে’। আপনি যদি নারী-পাঠক হয়ে থাকেন, তবে এই বাক্যগুলো জীবনের কোথাও না কোথাও শুনেছেন এবং শুনছেন। কোনো পার্টিতে আপনার সহকর্মীদের মুখে কিংবা ক্যাম্পাসে আপনার বন্ধুদের কাছে। শুধু এই একটা বাক্যের জন্য আপনি আপনার বাজেটে মাসে কত টাকা বরাদ্দ করেন— কখনো কি হিসেব করেছেন? কতটা সময় আপনার ড্রেসিং টেবিলের কাছে কাটান— তা কি কখনো ঘড়িতে দেখেছেন? না, আমরা কেউই তা কখনো করিনি! কারণ এটা আমাদের প্রাত্যহিক কাজের রুটিনে চলে গেছে! আমরা এখন রুটিন করে তিনবেলা তিন ধরনের ভিন্ন ভিন্ন ব্র্যান্ডের লোশন ব্যবহার করি। প্রতি মাসে ১৫ দিন অন্তর বিউটি পার্লারে যাই। ফেসিয়াল করি, ভ্রুঁ প্লাক করি। চুলের কাট পরিবর্তন করি। এভাবেই আমরা প্রতিমাসে সৌন্দর্য ক্রয় করি। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ‘পারফেক্ট’ হয়ে ওঠার জন্য গর্ববোধ করি। তবে বাস্তবিক অর্থে, পুরো প্রক্রিয়াটি একজন ‘ব্যক্তি’ হিসেবে সমাজে নিজের অবস্থানকে অধঃপতন ঘটানো ছাড়া আর কিছুই না! অনিরাপত্তাজনিত বিষয় থেকে বদ্ধমূল ধারণায় পরিণত হওয়ায় নারীরা সমাজ-আরোপিত অলীক এক সৌন্দর্য-দর্শনের পিছনে ছুটছে। আর এই সমাজ তাকে সৌন্দর্য মোহতে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। একজন বিমানবালার কথাই ধরুন না। প্লেনে যাত্রীদেরকে নিরাপদে যাত্রার জন্য নিরাপত্তা-সম্পর্কিত নিয়মকানুনগুলো সম্পর্কে জানিয়ে থাকেন একজন বিমানবালা। তিনি যাত্রীদেরকে প্লেন টেক-অফ এবং ল্যান্ডিং করার সময় সিট বেল্ট পরতে সাহায্য করেন। যাত্রীদেরকে খাবারসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিস সরবরাহ করেন। টিকেট চেক করেন, প্রয়োজনে ফাস্টএইডের দায়িত্বও পালন করেন। তাদের আরামের প্রতি নজর রাখেন এবং সর্বোপরি এটার নিশ্চয়তাবিধান করেন। মোদ্দাকথা, যাত্রীদের যাত্রাকে নিরাপদ এবং আরামদায়ক করাই একজন বিমানবালার কর্মদায়িত্ব। এমন কিছু দায়িত্ব পালন করার জন্য একজন বিমানবালার বয়সসীমাকে হতে হবে ১৬-২৯ বছর। দেশভেদে এর ভিন্নতা রয়েছে। ফিজিক্যাল অ্যাপিয়ারেন্সের ক্ষেত্রে রয়েছে নির্দিষ্ট কিছু মানদণ্ড। উচ্চতা, চেহারায় স্পষ্টতা, শারীরিক-মানসিক ফিটনেস এবং সুন্দর একটা হাসি। বিমানবালার চাকরির রিকোয়ারমেন্টে সমাজ-আরোপিত সৌন্দর্য-ধারণার সমস্ত মাপকাঠি রাখা হয়েছে; উহ্য রাখা হয়েছে শুধু ‘সুন্দর’ শব্দটিকে! বাসে সুপারভাইজার থাকেন, ট্রেনে থাকেন অ্যাটেনডেন্ট। লঞ্চে থাকেন কেবিন বয়। তাঁরা সবাই পুরুষ। শুধু প্লেনেই এই দায়িত্ব পালন করেন একজন নারী! খুব স্বাভাবিকভাবে মনে প্রশ্ন আসতেই পারে, প্লেনের যাত্রীসেবার দায়িত্বের জন্য শুধু নারীই কেন? জানলাম, অতীতে (১৯১২-১৯২৯) এই দায়িত্বও শুধু পুরুষরাই পালন করতেন। ১৯৩০ সালে আমেরিকায় (ইউনাইটেড এয়ারলাইন) প্রথম একজন নারীকে নিয়োগ করে। এবং ১৯৩৬ সালের মধ্যে এই চাকরি শুধুই নারীদের জন্য হয়ে যায়। আর এই পরিবর্তন নারীর বৈশিষ্ট্যের জন্য হয় বলে জানা যায়। পুরুষ সিন্ডিকেটের এই সমাজ সৌন্দর্যের মানদণ্ড তৈরি করছে। সৌন্দর্যের প্রতি মোহ তৈরি করে নারী জাতিকে সেটায় আচ্ছন্ন করে রেখেছে। তার দিনের সময়কে দখল করে রাখছে। মাসের বাজেটের বড় একটা অংক নিজের পকেটে পুরছে। সমাজ নারীকে পুঁজি করে সৌন্দর্য-তত্ত্ব দিয়ে ব্যবসা করছে, লাভবান হচ্ছে। দেশের নারী ও মানবাধিকার সংগঠনের বিভিন্ন সামাজিক প্রতিরোধ কমিটিগুলোর কর্মীরা সামাজিক আন্দোলনের মঞ্চায়ন করেন। ধর্ষণ, অ্যাসিড সন্ত্রাস, যৌতুক প্রথা, বাল্য বিয়ে প্রভৃতি সমাজের গতানুগতিক ঘটনাগুলো নিয়ে সভা-সেমিনার করেন, লিফলেট বের করেন, রাস্তায় প্লাকার্ড নিয়ে রোদের মধ্যে দাঁড়িয়ে চিত্কার করেন। প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তাবনা লিখে লিখে কলমের কালি শেষ করেন। আসলে তারা তাদের ৯টা-৫টা ডিউটিই শুধু পালন করেন। রাস্তার বিলবোর্ডের নগ্ন-অর্ধনগ্ন নারীর শরীর তাদের ভাবায় না। মিডিয়ার প্রেসক্রিপশন তাদের মনে প্রশ্ন জাগায় না! ২০-২৫জন নারীর স্বেচ্ছায় শরীর প্রদর্শনী নিয়ে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই নারী হিসেবে, সর্বোপরি মানুষ হিসেবে সমাজে আমাদের অবস্থানকে কি একেবারেই অস্তিত্বশূন্য করে দেয় না? দেয় বৈকি। কেননা আমরা তো সেখানে প্রতিনিয়ত নারীর সৌন্দর্যকে দেখতেই অভ্যস্ত হয়ে উঠছি। আমাদের পরবর্তী প্রজন্মও বেড়ে উঠছে এভাবে অথবা এর চেয়েও ভয়ংকর কিছুকে সামনে রেখে। ঢাকা