কাদের মোল্লার ৪৫ বছরের জেল ভোগ করতে হবে ৩০ বছর
প্রকাশ : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২২:২৯
মুক্তিযুদ্ধকালে হত্যা, গণহত্যা ও ধর্ষণের বিভিন্ন অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লাকে ৪৫ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে মিরপুরের আলোকদি গ্রামে ৩৪৪ জনের বেশি মানুষ হত্যা ও মিরপুরের হযরত আলী ও তার স্বজনদের হত্যার দায়ে যাবজ্জীবন (৩০ বছর) কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। এছাড়া পল্লব হত্যা, কবি মেহেরুন নেসা ও তার মা, দুই ভাই এবং সাংবাদিক খন্দকার আবু তালেব হত্যাকারীদের সঙ্গী হিসেবে ১৫ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়। তবে কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের মেয়াদের ৩০ বছর সাজা ভোগ করতে হবে। এ প্রসঙ্গে রায়ে বলা হয়েছে, যেহেতু তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে সে কারণে বাকি ১৫ বছর কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে না। এই রায়ে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা হতাশা প্রকাশ করেছেন। তারা বলেছেন, এ রায় আমরা প্রত্যাশা করিনি। আসামিপক্ষও এ রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। খোদ কাদের মোল্লা বলেছেন, বিচারকরা বিচারকে কলঙ্কিত করেছেন। তারা সরকারের এজেন্ডা বাস্তবায়নে কাজ করেছেন। জানা গেছে, রায়ের বিরুদ্ধে দুই পক্ষই সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল করবেন।
গতকাল মঙ্গলবার বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বাধীন এবং সদস্য বিচারপতি মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারক শাহিনুর ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত তিন সদস্যের যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ যুদ্ধাপরাধের মামলায় আবুল কালাম আযাদের পর দ্বিতীয় রায় ঘোষণা করেন। রায়ে বলা হয়, আবদুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার ছয়টি অভিযোগের মধ্যে পাঁচটি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। পাঁচ নম্বর অভিযোগ মিরপুরের আলোকদি গ্রামে এলোপাতাড়ি গুলি ছুঁড়ে ৩৪৪ জনের বেশি মানুষ হত্যা এবং মিরপুরের ১২ নম্বর হযরত আলী ও তার স্বজনদের হত্যার ছয় নম্বর অভিযোগে একক দণ্ড হিসেবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়। এছাড়া এক নম্বর অভিযোগ মিরপুর বাঙলা কলেজের ছাত্র পল্লব হত্যা, দুই নম্বর অভিযোগ কবি মেহেরুননিসা, তার মা এবং দুই ভাইকে মিরপুরের বাসায় হত্যা এবং তিন নম্বর অভিযোগ সাংবাদিক খন্দকার আবু তালেব হত্যা প্রমাণিত হওয়ায় একক দণ্ড হিসেবে ১৫ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। এছাড়া ভাওয়াল খানবাড়ি ও ঘাটারচর (শহীদনগর) এবং পার্শ্ববর্তী দুইটি গ্রামে ১১ জনকে হত্যার চার নম্বর অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাকে এ অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। দণ্ডের আদেশে বলা হয়, যেহেতু তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে সেহেতু তাকে বাকি ১৫ বছর কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে না। আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন, ১৯৭৩ এর ২৯ এর (৩) ধারায় কার্যকর করা হবে। আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের কার্যপ্রণালী বিধি ৪৬(২) ধারা অনুযায়ী রায়ের দিন থেকেই কারাদণ্ড মেয়াদ শুরু হবে। দণ্ডিত অপরাধীকে সাজা পরোয়ানা দিয়ে দণ্ড ভোগের জন্য কারাগারে পাঠাতে হবে। রায়ের এই কপি ঢাকা জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এর কাছে পাঠাতে এবং এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বলা হয়েছে।
জামায়াতে ইসলামীর সকাল-সন্ধ্যা হরতালের মধ্যে গতকাল সকাল ১০টা ৪২ মিনিটে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রথম মামলার রায় ঘোষণার কার্যক্রম শুরু হয়। ট্রাইব্যুনাল-২ এর এজলাসে স্থান সংকুলান না হওয়ায় ট্রাইব্যুনাল-১ এর এজলাসে রায় ঘোষণার জন্য বিচারকরা আসেন। বিচারকরা আসন গ্রহণের আগে ১০টা ৩৫ মিনিটে কাদের মোল্লাকে এজলাসের ডকে আনা হয়। জনাকীর্ণ এজলাসে বিচারকরা আসন গ্রহণের পর আবদুল কাদের মোল্লা বিচারকদের উদ্দেশে বলেন, আমি একটু কথা বলতে চাই। তখন বিচারপতি ওবায়দুল হাসান বলেন, আপনি কি কথা বলবেন, এখন বসেন। এরপর কাদের মোল্লা বলেন, তাহলে রায় ঘোষণার পর একটু কথা বলতে দেবেন। ট্রাইব্যুনাল বসতে বললে তিনি বলেন, আমি আপনাদের সহযোগিতা করতে চাই। আপনারাও আমাকে একটু সহযোগিতা করুন। এরপর বিচারপতি ওবায়দুল হাসান বলেন, পুরো রায় ১৩২ পৃষ্ঠার। এতে ৪৩২টি অনুচ্ছেদ রয়েছে। কিন্তু পুরো রায় না পড়ে এর সারাংশ পড়া হবে। ৩৫ পৃষ্ঠার ১১১ অনুচ্ছেদের এ সারাংশ পড়তে সময় লাগে প্রায় দেড় ঘণ্টা। সারাংশ রায়ের প্রথম ৩৫ অনুচ্ছেদ পড়েন বিচারক শাহিনুর ইসলাম। ৩৬ থেকে ৮০ অনুচ্ছেদ পর্যন্ত পড়েন বিচারপতি মজিবুর রহমান মিয়া। শেষের অনুচ্ছেদগুলো পড়ে চেয়ারম্যান ওবায়দুল হাসান। রায়ের সারাংশে মামলার বিচার কার্যক্রম, অভিযোগ, রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামি পক্ষে যুক্তি, সাক্ষীদের বক্তব্য, বিচারকদের পর্যবেক্ষণ, সিদ্ধান্তের বিষয়গুলো উল্লেখ করা হয়। পিনপতন নিরবতায় ১০টা ৪৭ মিনিটে রায় পড়া শুরু হয়।
রায়ে যা বলা হলো:
রায়ে বলা হয়েছে, ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য ছাড়া সহযোগী বাহিনীর সদস্য, ব্যক্তি এবং ব্যক্তিবর্গের বিচারেরও বিধান রয়েছে। ১৯৭৩ সালের আইনের অধীনে গঠিত ট্রাইব্যুনাল একটি আভ্যন্তরীণ ট্রাইব্যুনাল যা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করছে। রায়ে মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বর্ণনা করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে। কিন্তু পাকিস্তান সরকার জনগণের সিদ্ধান্তের প্রতি কোন সম্মান দেখায়নি। এরই ফলে এ অংশে আন্দোলন শুরু হয়। ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ দেয়া ঐতিহাসিক ভাষণে স্বাধীনতার জন্য সংগ্রামের ডাক দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ২৬শে মার্চের প্রথম অংশে তিনি স্বাধীনতারও ঘোষণা দেন। রায়ে বলা হয়েছে, আসামিপক্ষের আইনজীবী আবদুর রাজ্জাক যুক্তি দেখিয়েছেন, ফৌজদারী অপরাধের ক্ষেত্রে মামলা দায়েরে দেরি হলেও বিচারে বাধা নেই, কিন্তু দেরির কারণ ব্যাখ্যা করতে হবে। ট্রাইব্যুনালের মত হচ্ছে, মানবতাবিরোধী অপরাধের ক্ষেত্রে, গণহত্যার ক্ষেত্রে বিলম্ব বিচারের ক্ষেত্রে কোন বাধা নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এখনও চলছে। রায়ে বলা হয়েছে, ১৯৭৩ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন তৈরি করা হয়। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তার পরিবারের সদস্যদের দুঃখজনক হত্যাকাণ্ডের পর মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৭৫ সালের ৩১শে ডিসেম্বর দালাল আদেশও বাতিল ঘোষণা করা হয়। মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীরা নানাভাবে পুনর্বাসিত হয়। তাদের কেউ কেউ ক্ষমতারও অংশীদার হয়। রায়ে বলা হয়েছে, দালাল আইন করা হয় ফৌজদারী অপরাধের বিচারের জন্য। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে মানবতাবিরোধী অপরাধ, জেনোসাইড এসব অপরাধের বিচারের বিধান করা হয়েছে। রায়ে বলা হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে আবদুল কাদের মোল্লা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদউল্লাহ হল শাখা ছাত্র সংঘের সভাপতি ছিলেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের জন্য ট্রেনিং নিয়েছেন তা বিশ্বাসযোগ্য নয়।
আদেশে বলা হয়, মহিউদ্দিন চৌধুরীর লেখা ‘সানসেট এট মিডডে’ গ্রন্থে বলা হয়েছে, ইসলামী ছাত্র সংঘের সদস্যদের নিয়েই রাজাকার বাহিনী গঠন করা হয়েছে। কাদের মোল্লা তার গ্রামে মুক্তিযুদ্ধের জন্য প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন এ কথা আষাঢ়ে গল্পের মতো। কিন্তু ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ থেকে ২৪শে এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে কাদের মোল্লা আলবদর বাহিনীর সদস্য হিসেবে ঢাকার মিরপুরে থেকে অপরাধ সংঘটন করেছেন কি না তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। বরং এটা দেখা যায়, তিনি অপরাধ করেছেন ‘দলের ব্যক্তি হিসেবে। এক, দুই ও তিন নম্বর অভিযোগের ক্ষেত্রে দেখা যায় কাদের মোল্লা দলের সদস্য হিসেবে অপরাধ করেছে। তবে পাঁচ ও ছয় নম্বর অভিযোগের সঙ্গে তিনি কোনো দলের সদস্য হিসেবে বা ব্যক্তি হিসেবে সরাসরি যুক্ত থেকে অপরাধ করেছেন। এ দুই অভিযোগে তাকে একক দণ্ড হিসেবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হলো। এছাড়া অন্য তিনটি অভিযোগে তাকে সব মিলিয়ে ১৫ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হচ্ছে।
যে দুই অভিযোগে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড:
কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় পাঁচ এবং ছয় নম্বর অভিযোগে কাদের মোল্লাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। এই দুই অভিযোগে তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। পাঁচ নম্বর অভিযোগে বলা হয়েছে, কাদের মোল্ল¬ার নেতৃত্বে একাত্তরের ২৪শে এপ্রিল তার সহযোগী আল বদর বাহিনীর প্রায় ৫০ জন সদস্য নিয়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সহায়তায় আলোকদী গ্রাম ঘিরে নির্বিচারে গুলি করে ৩৪৪ জনকে হত্যা করা হয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় ২৪শে এপ্রিল ফজরের নামাজ পরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী হেলিকপ্টারযোগে তুরাগ নদীর পাড়ে আলোকদী গ্রামের পাশ্চিম পাশে অবতরণ করে। পূর্বদিক থেকে স্থানীয় আলবদর বাহিনীর নেতা আসামি আবদুল কাদের মোল্ল¬া তার সহযোগী আলবদর বাহিনীর প্রায় ৫০ জন সদস্য ও কতিপয় অবাঙালি বিহারীদের সঙ্গে নিয়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সদস্যদের সহায়তায় ও যোগসাজশে আলোকদী গ্রাম ঘিরে ফেলে ও নিরীহ নিরস্ত্র মানুষের উপর নির্বিচারে গুলি চালায়। এতে বাসু মিয়া, জহিরুল হক ওরফে জোরা মোল্ল¬া, জেরাত আলী, ফোয়াদ আলী, শুকুর মিয়া, আওয়াল মোল্ল¬া, ছলে মোল্ল¬া, রুস্তম আলী ব্যাপারী, করিম মোল্ল¬া, জয়নাল মোল্ল¬া, কাশেম মোল্ল¬া, বদরউদ্দিন, বিষু মোল্ল¬া, অজল হক, ফজল হক, রহমান ব্যাপারী, নবী মোল্লা, আলামত মিয়া, মোকলেছুুর রহমান, ফুলচান, নওয়াব মিয়া, ইয়াছিন ভানু, লালুচান বেপারী, সুনু মিয়াসহ ৩৪৪ জনকে হত্যা করা হয়। ছয় নম্বর অভিযোগ হলো, একাত্তরের ২৬ মার্চ সন্ধ্যা ছয়টার দিকে কাদের মোল্লা ও তার সহযোগী কয়েকজন অবাঙালি বিহারি ও পাকিস্তানি সেনা মিরপুরের ১২ নম্বর সেক্টরের ৫ নম্বর কালাপানি লেনের হযরত আলীর বাসায় যান। কাদের মোল্লার নির্দেশে হযরত আলীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। একই সঙ্গে তার স্ত্রী আমিনা এবং দুই মেয়ে খাদিজা ও তাহমিনা, দুই বছরের ছেলে বাবুকে হত্যা করা হয়। একই ঘটনায় কাদের মোল্লার ১২ সহযোগী মিলে হযরতের ১১ বছরের মেয়েকে ধর্ষণ করে। হযরতের আরেক মেয়ে মোমেনা ওই সময় আত্মগোপন করে সেই ঘটনা প্রত্যক্ষ করেন।
যে তিন অভিযোগে কারাদণ্ড ১৫ বছর:
এক, দুই এবং তিন নম্বর অভিযোগে কাদের মোল্লাকে ১৫ বছর করে কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। এক নম্বর অভিযোগে বলা হয়, কাদের মোল্লার নির্দেশে স্বাধীনতা বিরোধীদের হাতে আটক মিরপুর বাঙলা কলেজের ছাত্র পল্লবকে মিরপুর ১২ নম্বর সেকশন থেকে ১ নম্বর সেকশনের শাহ আলী মাজার পর্যন্ত টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে তাকে আবার টানতে টানতে ১২ নম্বরের ঈদগাহ মাঠে নিয়ে একটি গাছের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা হয়। কাদের মোল্লার সহচর আখতার একাত্তরের ৫ এপ্রিল পল্লবকে গুলি করে হত্যা করেন। কালাপানি ঝিলের পাড়ে আরও সাতটি লাশের সঙ্গে পল্লবকে কবর দেয়া হয়। দুই নম্বর অভিযোগে বলা হয়, একাত্তরের ২৭ মার্চ কাদের মোল্লা তার সহযোগীদের নিয়ে কবি মেহেরুননিসা, তার মা এবং দুই ভাইকে মিরপুর ৬ নম্বর সেকশনের বাসায় গিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করেন। তিন নম্বর অভিযোগ হলো, ২৯ মার্চ বিকেলে আরামবাগ থেকে সাংবাদিক খন্দকার আবু তালেব মিরপুরে ১০ নম্বর সেকশনের বি ব্লকের ২ নম্বর রোডের ১৩ নম্বর প্লটে অবস্থিত তার আগুনে পোড়া বাড়ি দেখতে আসেন। পরে তিনি আরামবাগে ফিরে যাওয়ার জন্য মিরপুর ১০ নম্বর সেকশনের বাসস্ট্যান্ডে গেলে কাদের মোল্লা ও তার সহযোগীরা তাকে ধরে জল্লাদখানা পাম্প হাউসে নিয়ে জবাই করে হত্যা করে।
যে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি:
কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে চার নম্বর অভিযোগ প্রমাণ করতে পারেনি রাষ্ট্রপক্ষ। এ অভিযোগ থেকে তাকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। এই অভিযোগে বলা হয়েছে, একাত্তরের ২৫শে নভেম্বর ভাওয়াল খানবাড়ি ও ঘাটারচর (শহীদনগর) এবং পার্শ্ববর্তী দুটি গ্রামে কাদের মোল্লা তার সহযোগী আলবদর বাহিনীর সদস্যসহ পাকিস্তানি বাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে নিরস্ত্র মানুষের ওপর নির্বিচারে গুলি চালিয়ে ১১ জনকে হত্যা করেন। হত্যাকাণ্ডের পর স্থানীয় বাড়ি-ঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। সেখানে যাদেরকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে তাদের মধ্যে রয়েছেন, ওসমান গনি, গোলাম মোস্তফা, দরবেশ আলী, আরজ আলী, রাজা মিয়া, আবদুর রহমান, আবদুল কাদির, সোহরাব হোসেন, আবদুল লতিফ, নজরুল ইসলাম, মোহাম্মদ আলী প্রমুখ। এই হত্যাকাণ্ডের পর আলবদর বাহিনীর সদস্যরা মোজাফফর আহম্মেদ খানের বাড়িসহ দুটি গ্রামে আগুন ধরিয়ে দেয়।
মামলার বিচার প্রক্রিয়া
গত বছরের ১৬ এপ্রিল রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনে আবদুল কাদের মোল্লাসহ আরো তিন আসামির মামলা যুদ্ধপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ থেকে ট্রাইব্যুনাল-২ এ স্থানান্তর করা হয়। ২ থেকে ১৬ মে তার বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে শুনানি চলে। ট্রাইব্যুনাল-২ এ গত ২৮ মে কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে মামলার বিচার শুরু হয়। এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষ ২০ জুন সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন করে। রাষ্ট্রপক্ষের প্রথম সাক্ষী জবানবন্দি দেন ৩ জুলাই। ৪ নভেম্বর পর্যন্ত কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা (আইও) আব্দুর রাজ্জাক খান ও মনোয়ারা বেগমসহ রাষ্ট্রপক্ষের মোট ১২ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। ৪ নভেম্বর সাফাই সাক্ষীর জন্য আসামিপক্ষের দাখিল করা ৯৬৫ জনের তালিকা থেকে ৬জন সাক্ষীকে সাক্ষ্য দেয়ার জন্য নির্দিষ্ট করেন ট্রাইব্যুনাল। ১৫ নভেম্বর থেকে শুরু হয় আসামিপক্ষের সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ। কাদের মোল্লা নিজেই সাফাই সাক্ষ্য দেন। ১২ ডিসেম্বর পর্যন্ত কাদের মোল্লাসহ ৬ জনের সাফাই সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। পরে গত ১৭ ডিসেম্বর যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শুরু করে রাষ্ট্রপক্ষ। ১৭ থেকে ২৭ ডিসেম্বর ও গত বুধবার যুক্তি উপস্থাপন করে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি মোহাম্মদ আলী। অন্যদিকে, ৭ জানুয়ারি থেকে আসামিপক্ষ মোট ৮ কার্যদিবসে যুক্তি উপস্থাপন শেষ করে। এর মধ্যে কাদের মোল্লার প্রধান আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক ৪ দিন এবং অপর আইনজীবী অ্যাডভোকেট আব্দুস সোবহান তরফদার ৪ দিন যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন।
ট্রাইব্যুনাল ঘিরে কড়া নিরাপত্তা
রায় ঘোষণার দিন ধার্য থাকায় কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ও নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড যেন না ঘটে সেজন্য ট্রাইব্যুনাল ও এর আশ-পাশের এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়। ভোর থেকেই ট্রাইব্যুনালে প্রবেশের দুই গেট ছাড়াও আশ-পাশে মোতায়েন করা হয় পুলিশ ও র্যাব এবং গোয়েন্দা সংস্থা এনএসআই, এসবি, ডিবি ও ডিজিএফআই’র বিপুল সংখ্যক সদস্য। সূত্রে জানা যায়, ট্রাইব্যুনালের আশ-পাশে প্রায় ২০/২৫টি সিসিটিভি ক্যামেরা দিয়ে পর্যবেক্ষণ, ট্রাইব্যুনালের প্রবেশপথে মেটাল ডিটেক্টরসহ অন্যান্য ডিভাইস দিয়ে গাড়ি এবং ট্রাইব্যুনালের উদ্দেশে আসা প্রত্যেককেই তল্ল¬াশি করা হয়।