রাজনীতির বলি চার তরুণ

দিনক্ষণ ঠিক হলেও বিয়ে হলো না শফিকুলের। আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারি বিয়ের অনুষ্ঠানের জন্য কনেপক্ষ থেকে নগরীতে একটি কমিউনিটি সেন্টারও ঠিক করা হয়েছিল। কিন্তু গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম নগরীর আগ্রাবাদ সোনালী ব্যাংকের সামনের ফুটপাতে গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারালেন শফিকুল ইসলাম শফিক। মঙ্গলবার চট্টগ্রামে জামায়াত-শিবির কর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনায় যে চার তরুণ প্রাণ হারিয়েছেন শফিকুল তাদেরই একজন। তাদের কারো বয়সই ২৫ পার হয়নি। সহিংস রাজনীতির বলি হলেন তারা। মঙ্গলবার দুপুর সোয়া একটায় নগরীর অলঙ্কার মোড়ে মিছিলকারী ও পুলিশের সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান ইমরান খান রাজিব (২১) নামে এক তরুণ। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় শেখ মুজিব রোডে মিছিলকারী জামায়াত-শিবিরকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার সময় একশ গজের ব্যবধানে গুলিবিদ্ধ হন আবিদ বিন ইসলাম (২০) ও মো. আফজাল (২৫) নামে দুই তরুণ। এর আধাঘণ্টা পর আগ্রাবাদ বাদামতলি মোড়ে সোনালী ব্যাংকের সামনে পাওয়া যায় শফিকুল ইসলামের অচেতন দেহ। হাসপাতালে নেয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই আফজাল ও শফিকুল মারা যান। আর আবিদ মারা যান গভীর রাতে। নিহত চারজনের মধ্যে শফিকুল ও আফজাল স্বল্পআয়ের চাকরিজীবী। শফিকুল সিইপিজেডে ইয়ংওয়ান গার্মেন্টসে সুইং অপারেটরের চাকরি করতেন। আর শেখ মুজিব রোডে গাড়ির পার্টস বিক্রয়কারী একটি দোকানে চাকরি করতেন আফজাল। অন্যদিকে রাজীব ও আবিদ এখনও ছাত্রত্বের গণ্ডি পেরোতে পারেননি। চট্টগ্রামের নাসিরাবাদ এলাকায় পলিটেকনিক ইনস্টিউটের কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন রাজীব। আর চট্টগ্রাম সিটি কলেজে পড়াশোনা করতেন আবিদ। সামনেই তার উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা। শফিকুল ও আফজালের কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নেই। এলাকায় একেবারেই নিরীহ প্রকৃতির মানুষ হিসেবে তারা পরিচিত। অপরদিকে ইমরান ও আবিদ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে তাদের পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন। গার্মেন্টস কর্মী শফিকুল বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার কাকচিরা গ্রামের জালাল জমাদ্দারের ছেলে। মঙ্গলবার আগ্রাবাদ এলাকায় একটি নতুন মোবাইল ফোন সেট কিনতে এসেছিলেন তিনি। একই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ফুপাতো বোন নাসিমা জানান, মোবাইল ফোন সেট কেনা ছাড়াও আগ্রবাদ এলাকায় বসবাসকারী তার হবু স্ত্রীর বাসায় বিয়ের ব্যাপারে যাওয়ার কথা ছিল। নাসিমা কান্না জড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘শফিকুল আমার ছোট ভাইয়ের মতো। শফিক আমাকে বলেছিল আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারি গাড়িতে করে আমাকে সঙ্গে নিয়ে কমিউনিটি সেন্টারে বিয়ের অনুষ্ঠানে যাবে। কিন্তু এখন অ্যাম্বুলেন্সে করে তার লাশ নিয়ে যেতে হচ্ছে। চার বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার ছোট শফিকের বয়স ২১ বছর হবে। সংঘর্ষে নিহত আফজালের সুপারিওয়ালা পাড়ার বাসায় গিয়ে দেখা যায়, উপার্জনক্ষম একমাত্র ছেলের মৃত্যুতে নির্বাক হয়ে পড়েছেন তার বাবা-মা। তার স্ত্রী রীমার বুকফাটা আহাজারিতে ভারি হয়ে উঠেছে এলাকার পরিবেশ। মাত্র আড়াই বছর আগে বিয়ে হয় তাদের। তাদের রয়েছে আরিনা আক্তার নামে ৯ মাসের এক কন্যা। আরিনাকে জড়িয়ে ধরে কান্নাজড়িত কণ্ঠে রীমা জানালেন, আগামী ২২ তারিখ আফজালের ছোট বোনের বিয়ে। বিয়ের জন্য টাকা জোগাড় করতে বের হয়েছিলেন তিনি। দেওয়ানহাট এলাকায় পুলিশের সাথে গোলমাল শুরু হয়েছে শুনে রাত সাড়ে ৮টায় মোবাইল ফোনে আফজালের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেন রীমা। আর ফোন করেই ভগ্নিপতির কাছে শুনতে পান আফজাল মারা গেছেন। আফজালের নানা আব্দুন নূর জানালেন, আফজালদের বাড়ি কর্নেলহাট এলাকায়। তবে ছোটবেলা থেকেই সে সুপারিওয়ালা পাড়ায় নানার বাড়িতে মানুষ হয়েছেন তিনি। শেখ মুজিব রোডে গাউসিয়া মার্কেটে ইত্যাদি মটরস নামে গাড়ির পার্টস বিক্রয়কারী একটি দোকানে স্বল্প বেতনে চাকরি করতেন তিনি। তিনি জানান, আফজাল কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে জড়িত ছিলেন না। অথচ রাজনৈতিক সহিংসতাতেই প্রাণ হারাতে হল তাকে। বাসা থেকে বের হওয়ার সময় আফজালের বাবাকে দেখা গেল গেইটের কাছে নির্বাক হয়ে বসে রয়েছেন। এ সময় পাশে বসে থাকা প্রতিবেশীরা জানালেন, তিনি পক্ষাঘাতগ্রস্ত। ছেলের আয়ের ওপরই তিনি নির্ভরশীল ছিলেন। এখন ছেলে মারা যাওয়ায় কিভাবে তিনি আগামী ২২ তারিখ মেয়ের বিয়ে দেবেন, আর কিভাবেই জীবনের বাকি দিনগুলো কাটাবেন, এমন প্রশ্ন করায় শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়েই রইলেন বৃদ্ধ বাবা আমীর আহমদ। নিহত শিবিরকর্মী ইমরানের বাবা বাবুল খান গার্মেন্টস কর্মী। স্বল্পআয়ে সংসার চালাতে গিয়ে হিমশিম খান তিনি। তাই ইমরানের স্বপ্ন ছিল পড়াশোনা শেষ করে বাবার দারিদ্র্যতা দূর করবেন। কিন্তু সেই আশা আর পূরণ হয়নি। ছেলের লাশ নিতে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজে এসে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বাবুল খান বলেন, ছেলের মৃত্যুর জন্য তিনি কারো কাছে বিচার চান না। এ দেশে কেউ সুবিচার পায় না। এদিকে গতকাল বুধবার দুপুর দেড়টায় নিহত শিবিরকর্মী আবিদের হালিশহর নিউ এ ব্লকের বাসায় গিয়ে দেখা গেল অন্য রকম এক নিস্তব্ধতা। আবিদের বড় ভাই জিহাদ বিন ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, ‘আমার ভাইকে পুলিশ ধরে নিয়ে ছাত্রলীগের ক্যাডারদের হাতে তুলে দিলে তারা নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করে।’