সিতেশ খুড়ো
প্রকাশ : ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ১৭:২১
আমাদের সিতেশ খুড়ো অনেক খেলাই ভালো খেলতে পারত; ক্রিকেটটা খেলতে পারত না। কারণ খুড়োদের সময়ে আমাদের গ্রামে এই খেলাটা এসে পারেনি। আমাদের স্মৃতিতে খুড়োর যখন যাত্রা শুরু, তখনই তার বয়স পঁয়ত্রিশ-চল্লিশ হবে। বিয়ে-থা করেনি।
আমরা পেলে-ম্যারাডোনার খেলা দেখা তো দূরে থাক, নামও শুনিনি তখন। ফলে ফুটবল নিয়ে সিতেশ খুড়ো অদ্ভুত সব কাণ্ড-কারখানা আর রোজ মুড়ি-মুড়কির মতো গোল দিতে পারা দেখে আমরা তখন মহা অভিভুত। খুড়ো একবার চান্দের খোলার মাফুজের পা-ই ভেঙে দিল দাঁড়িয়াবান্দা খেলতে গিয়ে। মাহফুজ ডুগ দিয়ে আমাদের মানে সাংদিয়ার কোর্টে এলে খুড়ো একাই তার পা চেপে ধরল বিপুল বিক্রমে। সেই চাপ এমন চাপ হয়ে গেল যে, মাহফুজের ডান পা-টা ল্যাগ-ব্যাগ করে ঝুলতে লাগল।
এ নিয়ে ঝামেলাও কম হয়নি। কাউন্সিলে বিচার বসল; খুড়োকে সবাই খুব গালাগালি করল। জরিমানা করার একটা প্রস্তাবও ছিল। কিন্তু সুজিতবাবু চেয়ারম্যান শেষ পর্যন্ত আর অর্থদণ্ডের কথা তুললেন না। কারণ সবাই জানত, জরিমানা দেওয়ার মতো টাকা সিতেশ খুড়ো কোনোদিনই জোগাড় করতে পারবে না। চান্দা তুলে হাসপাতালে নেওয়া হলো মাহফুজকে।
আসলে সিতেশ খুড়োর সবকিছুই এ রকম দানবীয় ছিল। সিতেশ খুড়ো যে কার খুড়ো, বা আসলে যে কোন বাড়ির লোক—এ কথা কেউই জানত না। থাকত কখনো উত্তরের বাড়ি, মানে বটঠাউরের বাড়িতে। আবার কখনো কখনো আমাদের বাড়িতেও থাকত। তবে নির্দিষ্ট কোনো কাজ থাকলে যে বাড়ির কাজ সেই বাড়িতেই রাত কেটে যেত তার।
নির্দিষ্ট কাজ বলতে খুড়ো যে কারও বাড়িতে কিষেন দিত বা পয়সা নিয়ে কাজ করত—তা না। কোনো বাড়িতে ধান উঠল বা তাদের কুটো কিনতে হবে; খুড়ো গিয়ে হাজির সেখানে। কাজ শেষ করে চার-পাঁচ থাল ভাত খেয়ে ঘুম দিত ওই বাড়িতেই।
রাত দুপুরে উঠে আবার এর বাগানের নারকেল আর ওর বাগানের তালের রস পেড়ে এনে, আর দুই সের চাল ঠাউর বাড়ি থেকে সরিয়ে রান্না একগাদা পায়েস করে ফেলত। মাঝরাতে খুড়োর ডাকে উঠে নাকের সিকনি মুছতে মুছতে সেই পায়েস খেয়ে খুড়োকে মাঝে মাঝেই মনে হতো আকাশ থেকে নেমে আসা কেউ।
এই রকম সেবার কুটো কিনতে হবে বিষ্ণুদের বাড়িতে। কুটো বিক্রি হবে ও পাড়ার বিরের বাড়িতে। খুড়ো চলে গেল দরদাম করতে। বিরের সঙ্গে খুড়োর কোনোকালেই সদ্ভাব ছিল না। স্বভাবতই খুড়োকে দেখে কুটোর আঁটার দাম দ্বিগুণ করে দিল বিরের বৌ। এমনিতেই বাজারে তখন কুটোর দাম চড়া। তাই বলে বিশ টাকা এক আঁটি! খুড়োও দমবার লোক না। তার কুটো ওই বাড়ি থেকেই কিনতে হবে। জিজ্ঞেস করল—
‘আঁটা কত বড় বানব?’
বিরের বৌ আসল ব্যাপারটা বুঝতে না পেরে বলে ফেলল—
‘তুই যতডি পারিস একবারে নিতি।’
এই ‘যতডি পারিস’ই কাল হলো। খুড়ো তিনজন কিষেন নিয়ে পুরো কুটোর পালা, যাতে প্রায় চার আঁটা কুটো হবে, এক সঙ্গে বেঁধে বলল—
‘এবার কান্ধে উঠোয়ে দে’। বিরের বৌয়ের চিল্লাপাল্লা অগ্রাহ্য করে সেই মস্ত আঁটা নিয়ে খুড়ো কোনোমতে বিরের বাড়ির থেকে বের হয়েই ফেলে দিল। বলল—
‘এইবার ভাগ কইরে নিয়ে চল’।
সেবার রঘুনাথপুরের ভলিবল দল এল আমাদের ওখানে খেলতে। আমরা হাফপ্যান টেনে ওঠাতে ওঠাতে গিয়ে সুপারিগাছের খুঁটির কাছে বসে পড়েছি। শুনছি, ওদের দলে আর্মি থেকে একজন খেলোয়াড় আসছে, খান নাম। সে না কি দুই হাতে চাপ দিতে পারে। আর লম্বা নাকি পাঁচ হাত। তা আমাদের সিতেশ খুড়োও লম্বা কিছু কম ছিল না। রঘুনাথপুর দল এসে গেল। আমরা হাঁ করে দেখছি খানের খেলা। দড়াম করে একটা বল মেরে দিল খুড়োর মুখের দিকে। খুড়োও কী একটা করল, বল উঠে গেল শূন্যে। সেই বল হাতে ধরে তা দিয়েই খুড়ো মারল খানের মুখে। খানের নাক ফেঠে রক্ত বেরিয়ে গেল। আর যায় কোথায়! খুড়ো পালাল। আমাদের কাছে আরও বড় তারকা হয়ে উঠল। ওরে বাবারে বাবা, খানের নাক ফাটিয়ে দিয়েছে আমাদের সিতেশ খুড়ো!
তবে এসব বীর মাফিক কাণ্ড-কারখানার জন্য নয়, আমরা সিতেশ খুড়োর ভক্ত ছিলাম তার চার বল লোফাপুফি খেলার জন্য। খুড়ো দুই হাতে চারটে বল নিয়ে দিব্যি লোফালুফি করতে পারত। সবসময় দুটো বল শূন্যে থাকত, একবারের জন্যও মাটিতে পড়তনা কোনো বল। খেলাটা খুড়ো শিখেছিল লক্ষণ দাসের সার্কাস থেকে। সেবার যাত্রাপুরে রথের মেলায় সার্কাস দেখতে গিয়ে খুড়ো শিখে এল এই খেলা।
আর কী! আমরা পাড়ার যত হাফপ্যান পরা ছোটমোট, সব স্থায়ীভাবে লেগে গেলাম খুড়োর ল্যাজে। খুড়ো রাস্তায় চলছে, হাঁটছে, কথা বলছে আর দু-হাতে শূন্যে ছুড়ে দিচ্ছে চারটে সুপারি। আমাদের চোখে অবশ্য ওই সুপারিগুলোই ছিল কাচের বল। এমনকি একবার কলেজের এক প্রফেসর আমাদের পাড়ায় একটা বিয়েতে এলে তিনিও বেশ অবাক হয়েছিলেন খুড়োর লোফালুফি দেখে।
বল নিয়ে লোফালুফি করতে পারা খুড়ো একবার হারিয়ে গেল। খুড়ো যে এই প্রথম হারিয়ে গেল তা নয়। কিন্তু হারিয়ে সহজে আর ফিরল না।
ঘটনাটা শুরু হয়েছিল আমাদের বারন্দা থেকেই। আমাদের বারান্দায় রোজ সন্ধেরাতে কড়ি খেলা হতো একপাশে, আরেক পাশে তাস। খুড়ো তাস খেলত না। বিরে, ঠাম্মা আর আমার মায়ের সঙ্গে কড়ি খেলত। সেদিন আমরা বই নিয়ে তাসের দিকে তাকিয়ে পড়ছিলাম। হঠাত্ কী একটা শব্দ হলো। চেয়ে দেখি, বিরে বুড়ো বারান্দা থেকে নিচে পড়ে গিয়ে চিত্কার করছে।
চেঁচামেচির ভেতর দিয়ে বুঝতে পেলাম, খেলা নিয়ে কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে বিরেকে লাথি মেরে বারান্দা থেকে ফেলে দিয়েছে খুড়ো। কিন্তু কোথায় সে সিতেশ খুড়ো। তার আর দেখা মিলল না। বটঠাউর কয়েক শ টাকা খরচ করে ঘাটের মড়া বিরেকে বাচিয়ে তুলল। কিন্তু ওই লাথিতে বিরে মরেই গেছে—এমনটা ধরে নিয়ে খুড়ো সেই যে গেল আর তার দেখা মিলল না টানা পাঁচ বছরের মধ্যে। এর ভেতর কাশী দালালের মুখে খবর শোনা গেল, খুড়ো নাকি ইন্ডিয়ায় চলে গেছে।
এর বছর পাঁচেক পর খুড়ো এল একবার বাংলাদেশে। বাংলাদেশে মানে আমাদের পাড়ায়। আমি তখন বাগেরহাটে থেকে বিদ্যান হওয়ার চেষ্টায় লিপ্ত। ফলে এবার তার সঙ্গে দেখা হলো না। এবার খুড়ো নাকি একা আসেনি, সঙ্গে করে বৌ আর একটা ছেলে নিয়ে এসেছিল। ইন্ডিয়ায় গিয়ে কোথাকার কোন আত্মীয়র মেয়েকে বিয়ে করে সংসারী হয়েছে সিতেশ খুড়ো। কিন্তু খুড়ো বৌ নিয়ে থাকতে আসেনি। ইন্ডিয়ায় নাকি কোনো এক দোকানে চাকরি করে। তিন দিন থেকেই চলে গেল। আমার দেখা হলো না বল লোফালুফি খেলা।
খুড়ো আবার এল আরও সাত বছর পর। এবার একেবারেই এল। বাগেরহাট বসেই শুনলাম, সে নাকি বারুইখালী তার নিজের জায়গায় একটা ঘর তুলে বৌ আর দুই ছেলে নিয়ে বসবাস করছে। এই প্রথম জানতে পারলাম, তার কোনো পৈতৃক বাড়ি ছিল এবং সেটা আমাদের গ্রামে নয়। সে যা-ই হোক, আমার শৈশবের এমন মহা তারকা আবার দেশে ফিরে এসেছে শুনে তার সঙ্গে দেখা করতে যাওয়াটা ফরজ হয়ে পড়ল। বন্ধুদের অনেকেই তত দিনে সিতেশ খুড়োর গল্প শুনে ফেলেছে। তাদেরই দুজন মামুন আর ফিরোজকে নিয়ে চললাম সিতেশ খুড়োর বাড়িতে।
বারুইখালী যাই না মেলাদিন। খুড়োর বাড়িটাও আগে থেকে চিনতাম না। লোকেদের মুখ থেকে ভাগ্যিস বাড়ির বর্ণনাটা শুনে নিয়েছিলাম, তা না হলে একটা কেলেঙ্কারিই হয়ে যেত। খুড়োর বাড়ি নয়, খুড়োকেই এই বদলে যাওয়া চেহারায় চেনা অসম্ভব হয়ে পড়ত। সেই ডাকাবুকো চেহারা আর নেই। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হয়েছে চোখের চাউনিতে। আমার স্মৃতির প্রতারণা না কী, বুঝতে পারলাম না। আগে খুড়োর চোখ দুটো কি বেড়াল-চোখো ছিল না? কেমন ঘোলাটে মরা মাছের মতো চোখ দুটো দেখেই বুকটা ছ্যাত্ করে উঠল, খুড়ো পারবে তো? বন্ধুদের আর আমার ভয়ের কথা বললাম না। বিকেল গড়িয়ে গেছে পৌঁছাতে পৌঁছাতে। বাড়ির সামনে একটা নোংরা প্যাঁচপেচে জায়গায় কী যেন খোঁজ করছিল খুড়ো। আমাকে দেখে একবারেই চিনে ফেলবে, তা আশা করিনি। কিন্তু পরিচয় দেওয়ার পরও কেমন নিরুত্তাপ কণ্ঠে বাড়ির ভেতরে যেতে বলল খুড়ো। খানিকটা দ্বিধা আর বেশিটা ভয় নিয়ে ভাঙাচোরা একটা ঘরের সামনে একটা মুরগির খাচার সামনে গিয়ে পড়লাম। খুড়োরা নিশ্চয়ই মুরগি চরে বেড়ানো এই জায়গাটাকে উঠোন বলে দাবি করে।
চোখের পরিবর্তন যা-ই হোক, দাপট বোধহয় মরেনি।
‘গেইলে কোহানে, এগো মাদুর-টাদুর কিছু বাইর কইরে দেও।’
ভেতর থেকে কোনো উত্তর বা নির্দেশ পালনের অপেক্ষা না করেই আমাদের বলল—
‘তোরা বয়, আমি কয়ডা ডাব পাইড়ে আনি।’
আমাদের মামুন স্বভাবতই খুব ভদ্র ছেলে। মুখে তার বিনয়ের অভাব নেই। তাড়াতাড়ি বলল—
‘না, না। কাকা আপনি বুড়ো মানুষ। আপনার কষ্ট করতি হবে না।’
আর কেউ টের না পাক, খুড়োর চমকে ওঠাটা ধরতে পারলাম আমি। এখনো তাহলে নিজেকে ‘বুড়ো মানুষ’ মানেনি খুড়ো? আমি একটু স্বস্তি পেলাম, তাহলে বোধহয় সমস্যা নেই।
আমরা বসে আছি তো আছিই। খানিক পরে খুড়ো দু-হাতে দুটো ডাব আর দুই পাশে প্রায় একই সাইজের দুটো ছেলে নিয়ে ঢুকল সেই মুরগি চরা উঠোনে। পাতলা ছিটকাপড় দিয়ে বানানো একই রকম ছাপা দুটো হাফ প্যান্ট পরা ছেলে দুটোর হাতেও একটা করে ডাব। উঠোনে এনে ফেলতে দেরি আছে, ছেলে দুটোর চিত্কার জুড়ে দিতে দেরি নেই। যেটা একটু বড়সড় আর হাবাগোবা দেখতে, সে বেশি চেঁচাতে লাগল—
‘ও বা। আমারে ডাব দেও.. আমারে এটটা দেবা না..?’
খুড়ো ওদের কথার কোনো উত্তর না দিয়েই মস্ত একটা ধারালো দা নিয়ে বসে গেল ডাব কাটতে। এক হাতে দা চালাচ্ছে আর ডাব ধরা হাতটার ওপর বারবার এসে পড়ছে ছেলেটা। হঠাত্ কেউ কিছু বোঝার আগেই খুড়ো উঠে দাঁড়িয়ে একহাত ধরে তুলে একটু দূরে, চার-পাঁচ হাত দূরে ছুড়ে মারল ছেলেটাকে। আমরা উঠে দাঁড়ালাম সব কজন। একটা ‘আহা উহু’ চিত্কার উঠল। কিন্তু যতটা ভাবা গিয়েছিল ততটা আহত বা দুঃখিত মনে হলো না ছেলেটিকে। বরং আগের থেকে কান্নার জোর একটু কমেই এসেছে। আমাদের ‘আহা-উহু’তে এই প্রথম বাইরে বেরিয়ে এলেন খুড়োর বৌ। খুড়ো কখনো বিদ্যান হতে শহরে যায়নি। তাই তার পরিচয় করিয়ে দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। আর ভদ্র মহিলাও এমন কোনো আগ্রহ দেখাল না আমাদের দিকে। আমরা যেন আদৌ নেই এই চাতালে। ছেড়া একটা ব্লাউজ, একটা পুজোয় পাওয়া শাড়ি আর সরু দুটো শাখায় অলঙ্কৃত কাঠির মতো শরীরের ভদ্র মহিলা যে আমাদের সিতেশ খুড়ি তা আর বলে দিতে হলো না। পড়ে যাওয়া ছেলেটিকে তুলে নিয়ে যেতে যেতে তার মাতৃত্বের প্রমাণ দিয়ে বলল—
‘হারামজাদা হাড় হাভাইতের গুষ্ঠি। যা দেখপে গিলতি যাবে...। কেন, মরতি গেল্লি কেন...। বেশ, হইছে... ভালো হইছে.. আরও দুইখেন দিলি ভালো হতো...’
ডাবের জল গেলায় আমাদের এমন কোনো অরুচি কোনোকালেই ছিল না। কোনো প্রতিকূল পরিস্থিতি আমাদের একটা করে ডাবের জল খাওয়া থেকে বিরত রাখতে পারল না। কেবল মামুন একবার ছোট ছেলেটাকে বলেছিল—
‘ভাইডি, এটটা গেলাস নিয়ে আসো।’
ছেলেটি অপিরাণামদর্শী নয়।
এবার আমাদের যাওয়ার পালা। রাস্তায় বেরিয়ে এলাম। সঙ্গে সিতেশ খুড়ো। এতক্ষণে একবারের জন্যও জিজ্ঞেস করেনি আমাদের বাড়ির কারও কথা। এবারও জিজ্ঞেস করল না। খুড়ো জিজ্ঞেস না করুক, আমাকে তো এবার আসল কথাটা পাড়তেই হয়। একটু কেশে বললাম—
‘ও খুড়ো, সেই বল নিয়ে খেলাটা একবার দেহাবা?’
খুড়ো প্রথমবার ঠিক বুঝতেই পারল না। আবারও বলতে হলো—
‘সেই যে চাইরডে বল নিয়ে খেলা দেহাইতে...’
‘ও...। সেয়া কি আর মনে আছে নাকি!’
ভালো করে চেপে ধরলাম—
‘একবার চেষ্টা কইরে দেহো না। তুমি ঠিক পারবানে।’
তাল দিল মামুন আর ফিরোজও। একটু থেমে থেকে খুড়ো এবার হাতড়াল—
‘বল তো নেই’
সে আমি আগে থেকেই ব্যাবস্থা করে নিয়ে গিয়েছিলাম। পকেট থেকে বের করে ফেললাম সুন্দর করে সাইজ করা চারটে কাঠের বল। এখানে আসার আগে মিঠেপুকুর পাড়ের ফার্নিচারের দোকানে বললে ওরা বানিয়ে দিয়েছে।
মলয়ের ভাইয়ের দোকান বলে কোনো টাকাও লাগেনি। বল চারটে নিয়ে একটু দম নিল, দুবার থুতু ফেলল আর হাতের দিকে চাইল খুড়ো। দুই হাতে দুটো করে বল নিয়ে শূন্যে ছুড়ে দিল বল দুটো। ও দুটো শূন্যে থাকতেই বাকি দুটো ছুড়ে দিয়ে ওদের ধরার চেষ্টা করল। দুটো পারল আর দুটো পড়ে গেল মাটিতে। উবু হয়ে পড়ে যাওয়া বল দুটোকে দেখতে লাগল সিতেশ খুড়ো। কোন দুটো পড়ে গেছে? আগে ছোড়া দুটো নাকি পরে যাদের ওড়াল শূন্যে? আসলে চিনতেই পারল না বোধহয় ওদের। চারটে বল একই রকম।
মাথাটা উঁচু করে শরীরটা একটু নুইয়ে রেখেই ফ্যালফ্যাল করে চাইল আমার মুখের দিকে। সে চাউনিতে কেবলই ক্ষমা চাওয়ার ভঙ্গি; আমার প্রতি কোনো ক্ষোভ ছিল না। মামুন বা ফিরোজ হয়তো ক্ষান্ত দেওয়ার কথা ভাবছিল। কিন্তু আমাকে যে থামলে চলবে না। বল লোফালুফি তো আমাকে দেখতেই হবে—
‘খুড়ো, তুমি এটটু দুটো বল নিয়ে একবার চেষ্টা কইরে দেখপা?’
খুড়ো কোনো আপত্তি করল না। দুটো বলই তুলে নিল হাতে। আবার শুরু করার আগে একবার আমার দিকে চাইল। ক্ষণিকের জন্য খুড়োর চোখে যেন সেই বিড়াল-চোখা নীল রঙ দেখতে পেলাম। আমারই চোখের ভুল। তা না হলে শেষ মুহূর্তে কেনো হাত গুটিয়ে নেবে খুড়ো। বলল—
‘বাবু রে, আমি পারব না নে’।
এই বলাটা আলাদা কিছু ছিল কি না, কে যানে। মামুন তাড়াতাড়ি বলল—
‘থাইক কাকা, আমরা আরেক দিন আসপানে।’
খুড়ো কি হতাশ হলো, না কি হাফ ছাড়ল? বোঝা গেল না। শুধু দীর্ঘশ্বাসটা টের পেলাম। আমরা এগোচ্ছি আল ধরে, পেছনে পড়ে রইল খুড়ো।
একবার চাইলাম পিছন ফিরে। আলের ওপর, বহু দূরে একটা বাঁকা লাঠির মতো দাঁড়িয়ে রইল খুড়ো। লজ্জায় আমি মামুনদের মুখে চাই না।
একবার পেছনে তাকাই, একবার পায়ের দিকে। হঠাত্ পেছনে তাকিয়ে দেখি, বাকা লাঠি সোজা হয়ে গেছে। মাজায় ভর করে দাড়িয়েছে খুড়ো। আকাশের দিকে চেয়ে এক দলা থুতু ছুড়ে দিল দূরে। হাতে একটু থুতু মাখিয়ে নিল। তারপর; তারপর একটু সামনে ঝুঁকে শূন্যে ছুড়ে দিল দিল চারটে বল। বলগুলো মহাশূন্যে উঠে করে খেলা। সিতেশ খুড়ো আপনমনে চার বল নিয়ে লোফালুফি করে চলে।
আমি কাউকে ডাকি না। এই দৃশ্য সবার দেখতে নেই।