মহানবী (স.) বিনির্মিত সোনালী সমাজ

বিশ্বমানবতার মুক্তির দূত হযরত মুহাম্মদ (স.) শান্তি-কল্যাণ ও সহযোগিতাপূর্ণ সহাবস্থানের শিক্ষায় মানব চরিত্রকে সংশোধনের জন্য এ পৃথিবীতে আর্বিভূত হন। সে সময় সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় সকল ক্ষেত্রে ভয়াবহ ও বিশৃঙ্খল অবস্থা বিরাজ করছিল। সকল ক্ষেত্রে হতাশা অনিশ্চয়তার মধ্যে বিশ্ব নবীর এ পৃথিবীতে আগমন নি:সন্দেহে মহান আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ। আল্লাহ তা‘আলা পবিত্র কুরআন পাকে বলেন- আল্লাহ মুমিনদের প্রতি অবশ্যই অনুগ্রহ করেছেন যে, তিনি তাদের নিজেদের মধ্য হতে তাদের নিকট রাসূল প্রেরণ করেছেন, তাঁর আয়াতসমূহ তাদের নিকট তেলাওয়াত করে, তাদিগকে পরিশোধন করে এবং কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেয়, যদিও তারা পূর্বে স্পষ্ট বিভ্রান্তিতেই ছিল। (সূরা আলে-ইমরান-১৬৪) তিনি সমাজের সকল ক্ষেত্রে যে সংস্কার বাস্তবায়ন করেন তা আজো সারা বিশ্বের শত কোটি মানুষের জন্য প্রেরণার উত্স। নিম্নে রাসূল (স.) এর সমাজ সংস্কারের কিছু অংশ তুলে ধরা হল:প্রাক-ইসলামী যুগে সমাজে গোত্রে গোত্রে কলহ, হানাহানি, নিন্দা ছিল নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যাপার। তুচ্ছ ঘটনা নিয়ে বিদ্রোহ, মারামারি একবার শুরু হলে বছরের পর বছর ধরে চলতো। নিহত হতো শত শত মানুষ। এদের মধ্যে বিবাদে জড়ানোর দিক থেকে আউস ও খাজরাজ গোত্র ছিল সবার শীর্ষে। বিশ্ব নবীর শান্তি ও স্বস্তির পরশে ঐ সকল যুদ্ধবাজ জাতিকে এক পতাকাতলে আনতে সক্ষম হয়েছিলেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন- তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জু দৃঢ়ভাবে ধর এবং পরষ্পর বিছিন্ন হইও না। তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ স্মরণ কর :তোমরা ছিলে পরষ্পর শত্রু এবং তিনি তোমাদের হূদয়ে প্রীতির সঞ্চার করেন, ফলে তাঁর অনুগ্রহে তোমরা পরস্পর ভাই হয়ে গেলে। তোমরা তো অগ্নিকুণ্ডের প্রান্তে ছিলে, আল্লাহ উহা হতে তোমাদিগকে রক্ষা করেছেন। এরূপে আল্লাহ তোমাদের জন্য তাঁর নিদর্শনসমূহ স্পষ্টভাবে বিবৃত করেন যাতে তোমরা সত্ পথ পেতে পারো (সূরাহ আলে-ইমরান-১০৩)। রাসূল (স.) এর নবুওয়াত প্রাপ্তির পূর্ব সময় আরব সমাজে মদ-জুয়া, অনাচার-ব্যভিচার, সুদ-ঘুষ, চরিত্রহনন, মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড ছিল প্রতিদিনের নিয়মিত ঘটনা। ক্রীতদাসের প্রতি অমানবিক আচরণ ও নারীদেরকে সমাজের বোঝা মনে করা হতো। তাছাড়া শিশু কন্যাদেরকে জীবন্ত কবর দেয়া হতো। কুরআনের ভাষায়- যখন তাদের কন্যা সন্তানের সুসংবাদ দেয়া হয়, তখন তার মুখ কালো হয়ে যায় এবং অসহ্য মনোস্তাপে ক্লিষ্ট হতে থাকে। তাকে শোনানো সুসংবাদের দুঃখে সে লোকদের কাছ থেকে মুখ লুকিয়ে থাকে। সে ভাবে অপমান সহ্য করে তাকে থাকতে দেবে, না তাকে মাটির নিচে পুঁতে ফেলবে। শুনে রাখো, তাদের ফায়সালা খুবই নিকৃষ্ট (সূরা আন-নাহল-৫৮-৫৯)। এ প্রসঙ্গে আবু দাউদ শরীফে বর্ণিত, জনৈক সাহাবী তাঁর ইসলাম গ্রহণপূর্ব ঘটনার বর্ণনায় বলেন- আমি আমার ছোট্র মেয়েটি পুতে ফেলার জন্য একটি কুয়া খুঁড়ে তাঁকে দূর থেকে লোভ দেখিয়ে ডাকলাম আর সে কুয়াতে পড়ে গেলে আমি নিজ হাতে মাটি টেনে গর্ত বন্ধ করলাম অথচ তখনো সে আববা ! আববা ! চিত্কার করছিল। অথচ আল্লাহ বলেছেন কন্যা সন্তান জন্মগ্রহণ করলে তোমাদের খুশি হওয়া উচিত। হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে- যখন কন্যা সন্তান ভূমিষ্ঠ হয় তখন আল্লাহ পাক ফেরেশতাদের প্রেরণ করেন। তারা এসে বলে-পরিবারের সকলের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। অতঃপর তারা তাদের বাহু দিয়ে কন্যা সন্তানটিকে আবেষ্টন করে এবং তার মাথায় হাত রেখে বলে- এক অবলা হতে আর এক অবলা বের হয়েছে। যে ব্যক্তি এর রক্ষণাবেক্ষণে মনোযোগী হবে সে কেয়ামত পর্যন্ত সাহায্য পাবে। রাসূলে কারীম (স.) আরো বলেন- কারো কন্যা সন্তান ভূমিষ্ঠ হলে সে যদি তাকে পুঁতে না ফেলে, তাকে যদি সে অপমানিত না করে এবং তাকে উপেক্ষা না করে এবং তাকে উপেক্ষা করে যদি সে পুত্র সন্তানের পক্ষপাতিত্ব না করে, তাহলে আল্লাহ পাক তাকে জ্ান্নাতে প্রবেশ করাবেন (আবু দাউদ শরীফ)। এদেরকে মুক্তি দেয়া ও সমাজে সম্মানের আসনে বসানোর জন্য নবী করীম (স.) আল-কুরআনের শিক্ষা বাস্তবায়ন করেন। ফলে সমাজের মধ্যে এই জঘন্য অপরাধ দূরীভুত হল। তত্কালীন আরব সমাজে দাস প্রথার প্রচলন ছিল। মনিবগণ গোলামদের জীবন মরণের প্রভূ ছিল বলে তাদের ওপর অমানুষিক অত্যাচার করত।মানুষ হিসেবে তাদের কোন অহঙ্কার ছিল না। দাস-দাসিগণকে বাজারে পণ্য দ্রব্যের মত ত্রুয়- বিত্রুয় করা হতো। শান্তিপ্রিয় নবী (স.) দাস-দাসীদেরকে মানুষের মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেন এবং তাদের মুক্তির পথ নির্দেশ করেন। তিনি ঘোষণা করেন- গোলামকে মুক্তিদানের চেয়ে শ্রেষ্ঠতর কাজ আল্লাহর কাছে আর কিছুই নেই। সেনাপতিত্ব দান করেন ক্রীতদাস যায়েদ (রা.) কে। ইসলামের প্রথম মুয়াজ্জিন নিযুক্ত করেন হাবশী ক্রীতদাস হযরত বিলাল (রা.) কে। সামাজিক মর্যাদা লাভে সক্ষম হন আনাস, সালমান ফারসী ও সুহায়েব রুমি (রা.) এবং অপারপার ক্রীতদাসগণ। সে সময় ইয়াতিমরা ছিল সবচেয়ে বেশি অবহেলিত। সমাজে তাদের কোন নিরাপত্তা ছিল না। ইয়াতিমের সম্পদ ভোগ-দখল, লুটপাট করা সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছিল। রাসূল (স.) ইয়াতিমদেরকে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনলেন। বুদ্ধি জ্ঞান ও প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়া সাপেক্ষে তাদের সম্পদ ফিরিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করেন। তাদের মালামাল অন্যায়ভাবে খাওয়ার ব্যাপারে কঠোর হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করেন- যারা ইয়াতীমের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করে তারা তো তাদের উদরে অগ্নি ভক্ষণ করে; তারা অচিরেই জ্বলন্ত আগুনে জ্বলিবে (সূরাহ আন-নিসা-১০)। মহানবী (স.) এর গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সংস্কারের মধ্যে নারীকে যথাযোগ্য মর্যাদায় প্রতিষ্ঠা করা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রাক-ইসলামী যুগে নারী পণ্য দ্রব্যের মত অবহেলিত ছিল। নারীদের নিয়ে এ সকল মনুষ্যত্বহীন কার্যকলাপের বিরুদ্ধে ইসলাম সোচ্চার হয়ে উঠে এবং এ সকল অবহেলিত, লাঞ্চিত, বঞ্চিত, নিপীড়িত, অসহায় নিঃস্ব নারীদেরকে একমাত্র ইসলামই মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করে।