‘অন্যতম রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’
প্রকাশ : ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২২:৪৫
১৯৫২ সালের জানুয়ারির শেষ দিনটিতে পুরান ঢাকায় বার লাইব্রেরি হলে মওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে যে কর্মীসভা অনুষ্ঠিত হয় তার গুরুত্ব ছিল অসামান্য। তা শুধু সর্বদলীয় রাষ্ট্র সংগ্রাম পরিষদ গঠনের জন্যই নয়—অসাধারণত্ব সেখানে গৃহীত দু’একটি প্রস্তাবে। তবে একথাও মানতে হবে যে, সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের কাছে সংগ্রামী ছাত্রদের যে প্রত্যাশা ছিল তা সামান্যই পূরণ করতে পেরেছিল পরিষদের নেতৃত্ব। তাদের চরিত্রে ছিল পূর্বাপর আপসবাদিতার লক্ষণ। যেমন দেখা গেছে, ১৯৪৮ সালের মার্চের আন্দোলন স্থগিত করার ক্ষেত্রে তত্কালীন সংগ্রাম কমিটির ভূমিকায়। এবং জিন্নাহর বাংলা বিষয়ক নেতিবাচক বক্তৃতার পর সংগ্রাম কমিটি নিষ্ক্রিয়তায়।
ওই সভার একটি প্রস্তাবে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে গ্রহণের পাশাপাশি উর্দুকে অনুরূপভাবে গ্রহণের ক্ষেত্রে পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণের মতামতের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়। কারণ উর্দু পশ্চিম পাকিস্তানের কোনো প্রদেশের মূল ভাষা নয়, যদিও পাঞ্জাবে তা প্রচলিত। অন্যদিকে সিন্ধি, বেলুচি ও পশ্তু যথাক্রমে সিন্ধ,ু বেলুচিস্তান ও সীমান্ত প্রদেশের জনগণের ভাষা। স্বভাবতই গণতান্ত্রিক নীতি অনুযায়ী এসব ভাষারও রাষ্ট্রভাষা হিসাবে গৃহীত হবার অধিকার রয়েছে। পরোক্ষে এ দাবি নিহিত ছিল কর্মীসভার প্রস্তাবে (দৈনিক আজাদ:১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২)। সভাপতির ভাষণে মওলানা ভাসানী বিষয়টা উল্লেখ করেন, কিন্তু যে কারণেই হোক তা পত্রিকার প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি।
একটি বহুজাতিক, বহুভাষী দেশের রাষ্ট্রভাষা যে একাধিক হতে পারে এবং অবস্থা বিশেষে হওয়া যুক্তিগ্রাহ্য ও প্রয়োজনীয় তা বলার অপেক্ষা রাখে না। পাকিস্তানের ক্ষেত্রে তা ছিল বিশেষভাবে সত্য। কারণ ভাষা ও জাতিগত বৈশিষ্ট্যের ক্ষেত্রে পাকিস্তানের অন্তত কয়েকটি প্রদেশ ছিল একে অন্য থেকে সম্পূর্ণ পৃথক। বিশেষ করে বাংলা ভাষা-সাহিত্য সংস্কৃতির সঙ্গে ছিল পশ্চিমা প্রদেশগুলোর বৈপরীত্য। আবার লক্ষণীয়, বালুচ ও পাখতুনদের সঙ্গে পাঞ্জাবিদের পার্থক্য। যে কারণে ওই দুই প্রদেশের জনগোষ্ঠী দেশভাগের সময় থেকেই স্বায়ত্তশাসনের দাবি তুলেছে, এমনকি তারা বিচ্ছিন্নতার দাবিতে লড়াইও করেছে, এখনো করছে। সীমান্তের বাদশা খান (গাফফার খান) তো জীবনপাত করলেন এ দাবির পক্ষে তার অব্যাহত লড়াইয়ে।
একটি জনগোষ্ঠীর জাতীয় অধিকার অর্থাত্ ভাষা ও জাতিগত অধিকারসহ মৌল অধিকার রক্ষা ও আদায়ের দাবি যে গণতান্ত্রিক রীতিনীতি সম্মত, এমনকি প্রয়োজনে বিচ্ছিন্ন হবার অধিকারও স্বীকার্য এ সত্যটি মৌলিক হওয়া সত্ত্বেও স্বৈরাচারী বা আধিপত্যবাদী শক্তি অনেক সময়ই তা মানতে চায় না। ভাষা আন্দোলনে এ গণতান্ত্রিক সত্যটির প্রকাশ ওই সভায় প্রচ্ছন্নভাবে আসার দিন তিনেক পর পূর্ববঙ্গের অসংগঠিত কমিউনিস্ট পার্টি সংগঠনের সার্কুলারে তা স্পষ্ট করে তুলে ধরা হয় (২ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২)। তাদের বক্তব্যে উর্দুর অধিকার নিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ আলোচনা করা হয়েছে যুক্তি উত্থাপন করেই। কিন্তু সেই সঙ্গে গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে নৃতাত্ত্বিক, জনতাত্ত্বিক বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে পাকিস্তানের বিভিন্ন ভাষাভাষী ও নিজস্ব সংস্কৃতির জনগোষ্ঠীর মৌলিক অধিকার নিয়ে। সেখানে রয়েছে গ্রহণযোগ্য বিজ্ঞানসম্মত যুক্তি।
প্রত্যেক জাতিসত্তার ব্যবহারিক অধিকার ও মর্যাদাদানের পক্ষে যুক্তি উদ্ধার করে ওই সার্কুলারে বলা হয়: ‘যদি বিভিন্ন ভাষাভাষী জনগণকে নিজের মাতৃভাষায় শিক্ষালাভ ও রাষ্ট্রের কাজ চালাইবার অধিকার দেওয়া না হয় তাহা হইলে বিভিন্ন ভাষাভাষী জাতির ভিতর সংহতির পরিবর্তে আসিবে জাতিগত ও প্রদেশগত রেষারেষি ও বিভেদ।
পাকিস্তানের বিভিন্ন ভাষাভাষী জাতির ভাষা ও কৃষ্টিগত উন্নতির উপরই পাকিস্তানের সামগ্রিক উন্নতি নির্ভর করে। ...বাঙালি, পাঞ্জাবী, পাঠান, সিন্ধি, বেলুচি- প্রত্যেকেই নিজ নিজ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি অনুযায়ী উন্নতি লাভ করুক, সমস্ত ভাষা যেমন উর্দু, বাঙলা, পশতু, পাঞ্জাবী, সিন্ধি—সমস্ত ভাষাকেই রাষ্ট্রে সমান অধিকার দেয়া হোক—ইহাই পাকিস্তানবাসী সকল জাতির কাম্য। ...তাই বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করা ও সকল ভাষার সমমর্যাদাদানই পাকিস্তানের সকল ভাষাভাষী ব্যক্তির দাবি।’
এদের পরবর্তী সার্কুলার সব কয়টিই ছিল নীতিগতভাবে একই ধারার। আটচল্লিশে বহু রাষ্ট্রভাষার দাবি নিয়ে জিন্নাহর সঙ্গে তোয়াহা-অলি আহাদদের তর্কও ছিল নীতিগতভাবে একই ধরনের যা জিন্নাহ সাহেব মানতে চাননি। তবে পাকিস্তানি শীর্ষ নেতাদের ভূমিকার কারণে শেষ পর্যন্ত বায়ান্নর আন্দোলনের নেতা-কর্মীরা বহু রাষ্ট্রভাষার দাবি নিয়ে আর উচ্চবাচ্য করেননি। বিশেষ করে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে তেমন সাড়া না পাওয়ার কারণে। তাই আমাদের অবশেষে স্লোগান হয়ে ওঠে:‘অন্যতম রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’।
লেখক:ভাষাসংগ্রামী ও প্রাবন্ধিক