ক্ষুব্ধ পরিস্থিতি সহায়ক হয়েছিল একুশের সাফল্যে

বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন রাষ্ট্রভাষার দাবিতে ছাত্র আন্দোলন হওয়া সত্ত্বেও এর পেছনে সহায়ক অনুঘটক শক্তি হিসাবে কাজ করেছে আরো বিভিন্ন ঘটনা ও পরিস্থিতি। রাজনৈতিক দুঃশাসন এর একটি প্রধান কারণ। মূলত এ কারণেই সামাজিক সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে অসন্তোষ ও ক্ষোভ জমা হতে থাকে। খাদ্য সংকট, লবণ সংকট, চোরাচালান, মজুতদারি, দুর্নীতি, রাজনৈতিক নেতা ও প্রশাসনিক বড় কর্তাদের দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি ইত্যাদি মিলে স্বপ্নের পাকিস্তান লাভের পরও পূর্ববঙ্গে এক নৈরাজ্যিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। রাজনৈতিক দুঃশাসনে যে অর্থনৈতিক সংকটের সৃষ্টি তা বাঙালি জনগোষ্ঠীর একাংশে তো বটেই তাদের পাকিস্তানি মুগ্ধতায়, তাদের স্বাপ্নিক প্রত্যাশায় আঘাত করতে থাকে। ভাবা যায়—স্বপ্নের ভুবনে খাদ্যাভাব ও দুর্ভিক্ষ, লবণের অভাব এবং তা দুর্মূল্য? চিনির ক্ষেত্রেও একই অবস্থা! প্রদেশের দক্ষিণ ও উত্তরাঞ্চলে দুর্ভিক্ষে মৃত্যু! কিন্তু এর বিপরীতে ছিল বিত্তবান শ্রেণির ও রাজনৈতিক নেতাদের অর্থনৈতিক সচ্ছলতা। স্বভাবত তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির সরকারি কর্মচারীদের স্বপ্নভঙ্গ হতেই পারে। দেখা দিতে থাকে অসন্তোষ ও ক্ষোভ। সেই ক্ষোভের ধারাবাহিকতা আমরা লক্ষ্য করি ১৯৫২ সালের জানুয়ারিতে পৌঁছেও। অথচ এ সময়ও সরকার ও মুসলিম লীগ নেতারা পাকিস্তানের মাঝে স্বপ্নের ফুলঝুরি ছড়িয়ে ছিটিয়ে যাচ্ছেন। মুসলিম লীগের পেছনে সমবেত হতে আহ্বান জানিয়ে চলেছেন। কারণ, সামনে প্রাদেশিক নির্বাচন। সেজন্যই পাক প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন ঢাকায় ছুটে এসেছিলেন ১৯৫২ সালের ২৫ জানুয়ারি মুসলিম লীগ কাউন্সিল সভায় যোগ দিতে। তাদের লীগ সংগঠনকে গড়ে পিটে তুলতে। আর ২৭ জানুয়ারির বক্তৃতায় শুকনো বারুদে আগুনের ফুলকি যোগ করেছিলেন রাষ্ট্রভাষা সম্পর্কে বেফাঁস মন্তব্য করে। ভাবতে অবাক লাগে, স্বপ্নের ভুবন প্রতিষ্ঠার পরও বাঙালি মুসলমান সাধারণ জনশ্রেণির অর্থনৈতিক ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটেনি। চতুর্থ শ্রেণি কর্মচারীদের ন্যূনতম দাবি-দাওয়া নিয়ে আন্দোলন ও ‘ভুখা ব্যাজ’ ধারণ, ময়মনসিংহ ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ক্ষুধার্তদের ভুখ মিছিল, খুলনায় অনাহারে মৃত্যু এসব কিছু মিলে জনমনে অসন্তোষ, ক্ষোভ পাকিস্তানি স্বপ্নের চালচিত্র পাল্টে দিতে থাকে। ময়মনসিংহ থেকে আসা মেডিক্যাল ছাত্র আনোয়ারুল ইসলামের মুখে প্রায়ই শুনেছি তাদের ক্ষুব্ধ ‘ভুখ মিছিল’-এর কথা যা মূলত বাম রাজনীতির উদ্যোগে সংঘটিত হয়। তাই অবাক হইনি, বহু পরিচিত নীলক্ষেত ব্যারাক প্রাঙ্গণে ১৯৫২ সালের জানুয়ারি মাসে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা ক্ষুব্ধ সরকারি কর্মচারীদের জমায়েত দেখে। পূর্ব অভিজ্ঞতার কারণেই বোধহয় পুলিশ তাদের প্রতিবাদ সভা করতে দেয়নি। তাদের দাবিগুলো ছিল মূলত অর্থনৈতিক। তাদের কর্মবিরতি বড় কর্তাদের জন্য অসুবিধা সৃষ্টি করে। তাই হয়তো জারি ছিল নির্যাতনমূলক দমননীতি—ভয়ভীতি প্রদর্শন, গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি, এমনকি গ্রেফতারও। এসব নিয়ে কিছু প্রতিবেদন প্রকাশ পায় সাপ্তাহিক ‘নওবেলাল’, সাপ্তাহিক ‘সৈনিক’ ও সাপ্তাহিক ‘ইত্তেফাক’ পত্রিকায়। পূর্ব অভিজ্ঞতার প্রসঙ্গে চতুর্থ শ্রেণি কর্মচারীদের আন্দোলন এবং তাতে ছাত্র সমাজের সমর্থন, সংগ্রামী কর্মচারী ও ছাত্রদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের কথা একটু হলেও বলতে হয়। ওই ঘটনার প্রভাব সাধারণ কর্মচারী থেকে ছাত্র সমাজের ওপর গভীরভাবে পড়ে মূলত সরকারি প্রশাসন এবং বিশ্ববিদ্যালয়সহ একাধিক কলেজে প্রশাসনের হঠকারী ও অযৌক্তিক সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়ায়। এক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যসহ একাধিক শীর্ষ স্থানীয় প্রশাসককে অন্যায় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য দায়ী করা যায়। নানা মেয়াদে বিশ্ববিদ্যালয় ও হল থেকে বহিষ্কৃতদের তালিকায় উল্লেখযোগ্য ছাত্রদের মধ্যে ছিলেন দবিরুল ইসলাম, অলি আহাদ, দেওয়ান মাহবুব আলী, আবদুল মতিন, জালালউদ্দিন আহমদ, হেমায়েতউদ্দিন আহমদ, আবদুস সামাদ, অরবিন্দ বসু, নুরুল ইসলাম চৌধুরী, আবদুর রহমান চৌধুরী প্রমুখ। জরিমানা দণ্ডাজ্ঞাপ্রাপ্তদের মধ্যে ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান, কল্যাণ দাসগুপ্ত, নঈমুদ্দীন আহমদ, নাদেরা বেগম, আবদুল ওয়াদুদ, লুলু বিলকিস বানু প্রমুখ ছাত্র-ছাত্রী। আর ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ থেকে বহিষ্কৃত ছাত্র আমজাদ হোসেন ও শামসুল হুদা কারাবরণ করে এবং বহিষ্কৃত হয় ফরিদপুরের আবদুল হাই। এরা বাম ও জাতীয়তাবাদী ঘরানার ছাত্র। বদরুদ্দীন উমর যথার্থভাবেই এ প্রসঙ্গে লিখেছেন, ‘পূর্ব বাঙলার রাজনৈতিক ইতিহাসে ১৯৪৯ সালের ২৫ এপ্রিল একটি গুরুত্বপূর্ণ পথচিহ্ন। এইদিনই সর্বপ্রথম ছাত্রদের সাথে বৃহত্তর জনসাধারণের সত্যিকার রাজনৈতিক সংযোগ স্থাপিত হয় এবং ছাত্র-জনতা সম্মিলিতভাবে স্বৈরাচারী সরকারের নির্যাতন ও প্রতিক্রিয়াশীল নীতির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের ভিত্তি স্থাপন করে।’ সেদিন নীলক্ষেত ও পলাশী ব্যারাকের ক্ষুব্ধ সরকারি কর্মচারী ও ছাত্রদের সঙ্গে জনসাধারণেরও মেলবন্ধন ঘটে। তাজউদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে আরমানিটোলা ময়দানে অনুষ্ঠিত সভাও প্রসঙ্গত স্মরণ করার মতো। আন্দোলন অবশ্য শুরু ৩ মার্চ থেকে। এ প্রসঙ্গে মোহাম্মদ তোয়াহার তত্পরতাও ছিল উল্লেখযোগ্য। এই প্রেক্ষাপট যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ এবং তা ভাষা আন্দোলনের সলতেতে আগুন ধরাতে কতটা সাহায্য করেছিল তার প্রমাণ মেলে বাহান্নে পৌঁছেও নীলক্ষেত ব্যারাকের কর্মচারীদের ক্ষুব্ধ তত্পরতায়, আন্দোলনে যোগদানে, সচিবালয়ের কর্মচারী আবদুস সালামের আত্মদানে (২১ ফেব্রুয়ারিতে মেডিক্যাল হোস্টেল প্রাঙ্গণে গুলিবিদ্ধ, মৃত্যু এপ্রিলে) এবং অনুরূপ ঘটনায়। একুশেকে গণআন্দোলনে পরিণত করতে এদের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য; বলতে হয় অবিস্মরণীয়। লেখক:ভাষা সংগ্রামী ও প্রাবন্ধিক