আটক এনামুলের কাছেও হত্যাকাণ্ডের তথ্য নেই
প্রকাশ : ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২২:৪৫
সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী হুমায়ন ওরফে এনামুলকে গ্রেফতার করেছে র্যাব। গতকাল ভোরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রেলষ্টেশন থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। বহুল আলোচিত এ হত্যাকাণ্ডের এক বছর পূর্ণ হচ্ছে আগামীকাল। এ পর্যন্ত এ হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত খুনীদের গ্রেফতার কিংবা হত্যার মোটিভ উদঘাটন করতে পারেনি র্যাব। হত্যাকাণ্ডের বর্ষপূর্তির শেষ মুহূর্তে এসে র্যাব পলাতক সিকিউরিটি গার্ড এনামুলকে গ্রেফতার দেখিয়ে কিছুটা হলেও হত্যার তদন্তে এক ধাপ এগিয়ে গেলো। গতকাল সকাল সাড়ে ১১টায় র্যাব সদর দফতরে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে গ্রেফতারকৃত এনামুলকে সাংবাদিকদের সামনে হাজির করা হয়। প্রেস ব্রিফিংয়ে উপস্থিত ছিলেন র্যাবের মহাপরিচালক অতিরিক্ত আইজি মোখলেছুর রহমান, অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) কর্ণেল মো. মজিবুর রহমান, গোয়েন্দা শাখার পরিচালক লে. কর্নেল জিয়াউল আহসান, লিগ্যাল এন্ড মিডিয়া শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এটিএম হাবিবুর রহমান, উপ-পরিচালক মেজর জাভেদ ও সহকারী পরিচালক ক্যাপ্টেন অভিষেক আহমেদ।
সাংবাদিক সম্মেলনে র্যাবের মহাপরিচালক বলেন, এখন পর্যন্ত র্যাবের তদন্তে খুনিদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। এমনকি সন্দেহভাজনদের মধ্যে যাদের ডিএনএ পরীক্ষা সম্পন্ন করা হয়েছে তাদের কারও সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের সম্পৃৃক্ততা পাওয়া যায়নি। সাংবাদিক সম্মেলনে জানানো হয়, এনামুল ঢাকা থেকে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল যাওয়ার জন্য রওনা দেয়। এই তথ্যের উপর ভিত্তি করে র্যাব-৯ এবং র্যাবের গোয়েন্দা দল এনামুলের পিছু নেয়। কিন্তু লোকারণ্যে তাকে খুঁজে বের করা সম্ভব হয়নি। শুক্রবার রাতে সুরমা মেইল ট্রেনে চড়ে বসে। এ খবর পাওয়ার পর র্যাবের একটি দল ঐ সুরমা মেইল ট্রেনে ওঠে। ট্রেনটি শনিবার ভোরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলষ্টেশনে পৌঁছলে এনামুল ট্রেন থেকে নেমে পড়ে এবং এক পর্যায়ে তাকে গ্রেফতার করা হয়। পলাতক এনামুলের চেহারার সঙ্গে মিল পাওয়ায় তাকে র্যাব গ্রেফতার করে। গ্রেফতারকৃত এনামুলকে ধরিয়ে দিতে গত বছরের ১০ অক্টোবর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর ১০ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছিলেন।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এনামুল জানান, ২০১০ সালের আগষ্ট মাসে মাসিক সাড়ে তিন হাজার টাকা বেতনে আদাবর এলাকার ‘শেরে-এ- খোদা’ সিকিউরিটি কোম্পানীতে গার্ড হিসেবে যোগদান করেন। ঐ কোম্পানীতে দুই বছর চাকরি করেন। ২০১০ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর মণিপুরীপাড়ার মডার্ণ সাইকিয়াট্রিক হাসপাতালে কাজ করেছিলেন এনামুল। ২০১০ সালের ৭ নভেম্বর মাত্র একদিনের জন্য ইন্দিরা রোডের ইস্টার্ন গার্ডেন অ্যাপার্টমেন্ট হাউসে কাজ করেন এনামুল। ঐ বছরের ৮ থেকে ২৭ নভেম্বর পর্যন্ত তিনি পান্থপথের ‘গগন শিরীষ’ নামের একটি আবাসিক ভবনে কাজ করেছিলেন। ২০১১ সালের ১ জুলাই থেকে ১৩ জুলাই পর্যন্ত টঙ্গীর একটি কারখানায়, ১৪ থেকে ৩১ জুলাই আগারগাঁওয়ের মনিকা টাওয়ারে এবং ১ আগস্ট থেকে ১৪ আগস্ট পর্যন্ত দ্বিতীয় দফায় ইন্দিরা রোডের ইস্টার্ন টাওয়ারে দায়িত্ব পালন করেন এনামুল। এরপর তিনি ২০১২ সালের জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে ধানমন্ডির ২৭ নম্বর সড়কে কলতান বলে একটি ভবনে দুই-তিন দিন দায়িত্ব পালন করেন। এরপর শেরে-এ খোদা কোম্পানীর সিকিউরিটি সুপারভাইজার কামরুল ইসলাম তাকে ২০১২ সালের ১ ফেব্রুয়ারি পশ্চিম রাজা বাজারের ৫৮/এ/২, শাহজালাল লজ নামের অ্যাপার্টমেন্টে সিকিউরিটি গার্ড হিসেবে দায়িত্ব পালন করার জন্য নিয়োগ করেন। তিনি ৮ ঘন্টা পরপর ডিউটি করতেন এবং ডিউটি শেষে ভবনের নীচ তলায় ম্যানেজার আবু তাহেরের পাশের কক্ষে থাকতেন।
এনামুল আরো জানান, ২০১২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি দুপুর ২টায় সিকিউরিটি গার্ড পলাশ রুদ্র পালের কাছ থেকে সিকিউরিটির দায়িত্ব বুঝে নেন এবং রাত ১০টা পর্যন্ত ডিউটি করেন। যেদিন রাতে সাগর-রুনি নিহত হন, সেদিন রাত ১০টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত পলাশের ডিউটি ছিল। ভোর ৬টায় পলাশের কাছ থেকে এনামুল ডিউটি বুঝে নেন। ১১ ফেব্রুয়ারি সাগর-রুনি’র লাশ উদ্ধারের পর সকাল ৯টার দিকে এনামুলকে শেরেবাংলা নগর থানায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। রাত ১০টার দিকে ডিবি পুলিশ তাকে ডিবি অফিসে নিয়ে যায়। জিজ্ঞাসাবাদের পর মধ্যরাতে আবার শেরেবাংলা নগর থানায় দিয়ে যায়। প্রায় ১০/১২ জনকে নয় দিন থানার একটি রুমে হ্যান্ডকাফ লাগিয়ে আটক করে রাখা হয়। নয় দিন পর তাকে ও পলাশ রুদ্র পালকে আবারও শাহজালাল লজে নিয়ে গিয়ে পূর্বের মতো ডিউটি পালন করতে দেয়। ১০/১২ দিন পর মাসের বেতন পাওয়ার পর এনামুল কোম্পানী পরিবর্তন করে ফার্মগেটের রয়েল সিকিউরিটি কোম্পানীতে যোগদান করেন। কোম্পানীর পক্ষ থেকে বিভিন্ন বাসা বাড়ী বা অফিস বিল্ডিং-এ ডিউটি করতেন এবং দিনের বেলা রয়েল সিকিউরিটি এর গ্রীন রোডস্থ ব্যারাকে থাকতেন। আর রাতে ডিউটি না থাকলে র্যাব ও পুলিশের ভয়ে মসজিদে ও সিনেমা হলে ঘুমাতেন। মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে পালানোর আগে তিনি রয়েল সিকিউরিটি কোম্পানীতে চাকরি করেছেন।
র্যাব জানায়, সাগর-রুনি হত্যা মামলা তদন্তে এ পর্যন্ত ১২৭ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।
খুনিদের তথ্য নেই: র্যাবের তদন্ত সূত্র জানায়, হত্যাকাণ্ডের এক বছরের মাথায় সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডে জড়িত খুনিদের সম্পর্কে কোন তথ্য খুঁজে পায়নি র্যাব। হত্যার মোটিভও উদঘাটন করতে পারেনি। গ্রেফতারকৃত পুরস্কার ঘোষিত সিকিউরিটি গার্ড এনামুলের কাছেও খুনিদের বিষয়ে তেমন কোন তথ্য পাওয়া যায়নি।