প্রতিবাদী পাথর গড়াতে শুরু করেছে

ফেব্রুয়ারির দিনগুলোর প্রথম দিকে তত্পরতা বিচারে কিছুটা ধীরগতির হলেও তাতে অস্থিরতার ছাপ ঠিকই পড়ে ছিল আন্দোলনে সংশ্লিষ্ট ছাত্রদের মনে। বিশেষ করে ২১ ফেব্রুয়ারির দেশব্যাপী কর্মসূচি পালনের দিন ঠিক হয়ে যাবার পর থেকে। তাদের মনে একটাই ভাবনা—একুশের কর্মসূচি যেকোন মূল্যে সফল করে তুলতে হবে। মওলানা ভাসানী তখন ঢাকায়। তখনো তিনি তার বহুকথিত কৃষক-তাঁতী-কামার-কুমার অর্থাত্ নিম্নবর্গীয়দের কর্মসূচি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েননি। তিনি সভা ডেকেছেন সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের। স্থান মুঘলটুলি অফিস। উদ্দেশ্য একুশের কর্মসূচি দেশময় সফল করে তুলতে কী কী ব্যবস্থা নেওয়া তা ভেবে দেখা। এছাড়াও কীভাবে সাধারণ মানুষজনদের সংগ্রামে নামানো যায়। তাছাড়া রয়েছে অর্থ সংগ্রহের প্রশ্ন। লক্ষ্য একটাই—একুশে ফেব্রুয়ারিতে সরকারকে একটা জমজমাট আন্দোলন উপহার দেওয়া। তবে তা হবে শান্তিপূর্ণ এবং নিয়মতান্ত্রিক পথে। শেষ কথাটা আমার নয়; মওলানা ভাসানীর। ঐ সভায় অর্থ সংগ্রহের জন্য ১১ থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারি পতাকা দিবস হিসাবে পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অবশ্য আরো একটি উপায়ে তরুণ ছাত্ররা অর্থ সংগ্রহের কাজে নেমেছিল। যেমন—মুখবন্ধ কৌটো নিয়ে মহল্লাগুলোতে চাঁদা তোলা। এ কাজের মেডিক্যাল কলেজের কয়েকজন ছাত্র পথে নেমেছিল, চাঁদাও তুলেছিল যা কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা তহবিলে জমা দেওয়া হয়। তখন পোস্টারে পোস্টারে একটা কথা লেখা থাকতো— ‘রাষ্ট্রভাষা তহবিলে মুক্ত হস্তে দান করুন’। মনে আছে, মেডিক্যাল ছাত্র মাহমুদ, মুর্শেদ, মশারফ, সিরাজ প্রমুখ চাঁদা তোলার শ্রমসাধ্য কাজে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিল। ছিল অন্য ছাত্ররাও। তবে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সমাজের পক্ষে এ কাজে সবচেয়ে সফল ভূমিকা রাখেন ছাত্র নেতা আব্দুল মতিন। তাছাড়া ছাত্র সাধারণের চেষ্টায় পতাকা দিবসগুলোও এদিক থেকে সফল হয়েছিল। অর্থ সংগ্রহ ছাড়া ভাসানীর ঐ সভায় বিভিন্ন জেলার সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টিও আলোচিত হয়। সিদ্ধান্ত হয়—ছাত্রকর্মীদের এ কাজে লাগানো হবে। তবে একুশের কর্মসূচি বাস্তবায়নে বাধাবিপত্তির আশংকা নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে সরকারের সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়েও কথা ওঠে। কেউ একজন তেমন কথা তুলতেই ভাসানী তার স্বভাব সুলভ নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলেন, ১৪৪ ধারা জারি হলেও অবাক হবার কিছু নেই। শুনে সবাই উদ্বিগ্ন। রাজনৈতিক অঙ্গনে ভাসানীকে নিয়ে একটি কথা খুব চালু ছিল, তিনি নাকি রাজনৈতিক অঘটনের আগাম গন্ধ পান ও সে অনুযায়ী তার পদক্ষেপ ঠিক করে নেন। এ সম্বন্ধে ছিল নানাজনের নানা মত। যেমন, ভাসানীর রাজনৈতিক খবর সংগ্রহের বিশেষ পদ্ধতি ছিল যা রাজনৈতিক নেতার প্রাসাদ থেকে সামরিক বড় কর্তার দুর্ভেদ্য অফিস পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। তাছাড়াও বিদেশি কূটনৈতিক দূতাবাসের সঙ্গে রয়েছে বিশেষ ক্ষমতা যা অনেকটা ঐ ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে আগাম বুঝে নেবার মতো। এ ব্যাপারে ভাসানীকে ঘিরে এক ধরনের রহস্য, কারো মনে সন্দেহ বরাবরই ছিল। এ বিষয়ে এক সময়ে কথা তুলতেই আবদুল মতিন হেসে উঠে বলেছিলেন, ‘ঠিকই, এদিক থেকে মওলানাকে আমি কখনো বুঝে উঠতে পারিনি’। আর একই বিষয়ে আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু যশোরের আফসার সিদ্দিকীর মন্তব্য আরো চমকপ্রদ। ভাসানীর সঙ্গে দীর্ঘকাল একান্তে থাকা এবং ন্যাপ সংগঠনের কাজ উপলক্ষে তার সঙ্গে নানা জেলা সফরে থাকা আফসার দু’একটি মজার ঘটনা উল্লেখ করে বলেছিল: ‘ভাসানী জাদু বোঝা বড় কঠিন। এতোদিন তার সঙ্গে একান্তে থেকেও আমি তা বুঝতে পারিনি’। তাই মুঘলটুলির সভায় হঠাত্ ওঠা ১৪৪ ধারার বিষয়টি উপস্থিত সবার মনে খটকা ও আশংকা তৈরি করে। প্রশ্ন ওঠে, সেক্ষেত্রে কী করা হবে? উপস্থিত সবাই চুপচাপ। সেই স্তব্ধতা ভেঙে ভাসানীই প্রথম বলেন, ‘সেক্ষেত্রে ১৪৪ ধারা ভাঙতে হবে’। কিন্তু অলি আহাদ তার বইতে এ সম্বন্ধে যথারীতি কিছুটা ভিন্ন বিবরণ তুলে ধরেছেন। তার ভাষায়: ‘বেশির ভাগ উপস্থিত সদস্যই আইন ভঙ্গের বিরুদ্ধে মত জ্ঞাপন করেন। কিন্তু আমি ১৪৪ ধারা ভঙ্গের পক্ষে দৃঢ়মত প্রকাশ করি’(জাতীয় রাজনীতি)। তিনি আরো বলেন, বৃদ্ধ মওলানা ভাসানী সভাপতির আসন হইতে আমার বক্তব্যের সমর্থনে জোরালো ভাষায় ঘোষণা করিয়া বলেন:‘যে সরকার আমাদের নিয়মতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ গণআন্দোলনকে ইচ্ছাকৃতভাবে বানচাল করিবার জন্য অন্যায়ভাবে আইনের আশ্রয় গ্রহণ করে, সে সরকার কর্তৃক জারিকৃত নিষেধাজ্ঞাকে মাথা নত করিয়া গ্রহণ করিবার অর্থ স্বৈরাচারের নিকট আত্মসমপর্ণ।’ অর্থাত্ ভাসানী সরকারি নিষেধাজ্ঞা মানেন না। তাই ১৪৪ ধারা জারি হলেও তা মানবেন না। অবশ্য ভাসানীর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক তত্পরতা এমনই ছিল যা বিভিন্ন সময়ে দেখা গেছে। যেমন দেখা গেছে ষাটের দশকের শেষ দিকে ১৪৪ ধারা ভেঙে সামরিক প্রশাসনকে ঘোল খাইয়ে দিতে। প্রাসঙ্গিক হওয়ায় পরের কথা আগে হলেও ১৪৪ ধারা ভাঙা সম্পর্কে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের ভূমিকা অসন্তুষ্ট ছাত্রদের সঙ্গে একমত হয়ে বলি, আমারও বিশ্বাস ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের সভায় ভাসানী উপস্থিত থাকলে তাদের সিদ্ধান্ত ১৪৪ ধারা ভঙ্গের বিপক্ষে গিয়ে বিতর্কিত হয়ে দাঁড়াত না। আর ছাত্রদের দাঁড়াতে হতো না রাজনৈতিক নেতাদের মতামতের বিরুদ্ধে। রাজনৈতিক নেতাদের এ জাতীয় আপোসবাদী চরিত্র প্রায়ই দেখা গেছে। ব্যতিক্রম দু’চারজন। আটচল্লিশের ভাষা আন্দোলন এ তিক্ত সত্যটা আরো ব্যাপক অর্থে আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছিল। সেক্ষেত্রে রাজনীতিকদের সঙ্গে শিক্ষক-বুদ্ধিজীবী একাংশেরও মেলবন্ধন ঘটেছিল, সংগ্রাম কমিটিও হয়ে ওঠে আপোসবাদী। কিন্তু বায়ান্ন সালে পৌঁছে ছাত্ররা নেতৃত্বের আপোসবাদিতা মেনে নেয়নি। অন্যদিকে ফেব্রুয়ারির ৪ তারিখ থেকে ২০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সবার পক্ষ থেকে চলেছে ২১ ফেব্রুয়ারির কর্মসূচি সফল করে তোলার তত্পরতা, বলা চলে একুশের প্রস্তুতিপর্ব। এ পর্বে ছাত্র-যুবসমাজ ও ছাত্রাবাসগুলো ছিল তত্পরতার কেন্দ্রবিন্দু। এ সময়পর্বে ছিল ছোটবড় নানান তত্পরতা যার সবকিছু ইতিহাসের পাতায় লিপিবদ্ধ নেই। তেমন অনেক ঘটনা ও বিচার ব্যাখ্যা আমাদের দিনলিপির ইতিকথায় মিলবে। যেমন মিলবে ইতিহাসের কথাও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে, হয়তোবা কিছুটা ভিন্ন বিচার ব্যাখায়। লেখক:ভাষাসংগ্রামী ও প্রাবন্ধিক