কৃষক-শ্রমিক জনতা লীগের কাউন্সিল

শাহবাগ থেকে বার্তা নিন সর্বদলীয় বৈঠক ডাকুন

বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা বলেছেন, দেশ এখন এক বিশেষ পরিস্থিতির মুখোমুখি। শাহবাগের ‘গণজাগরণ মঞ্চে’ তারুণ্যের প্রতিবাদের প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য দ্রুত একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান বের করা অত্যন্ত জরুরি। তারা বলেন, নতুন প্রজন্মের এই স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন থেকে বার্তা নিয়ে রাজনীতিবিদদেরই সমাধান বের করতে হবে। এজন্য জরুরি ভিত্তিতে সর্বদলীয় (জামায়াত ছাড়া) বৈঠক ডাকার জন্য তারা প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। একইসঙ্গে শাহবাগের আন্দোলনকে কোনো মহল যেন রাজনীতিকীকরণ কিংবা দলীয়করণ করতে না পারে সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখার জন্য তারা তরুণ প্রজন্মকে পরামর্শ দিয়েছেন। গতকাল শনিবার রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (আইইবি) চত্বরে অনুষ্ঠিত কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের দ্বিবার্ষিক সম্মেলনের উদ্বোধনী পর্বে নেতৃবৃন্দ এই আহ্বান জানান। জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে কাউন্সিলের উদ্বোধন করা হয়। সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিকল্পধারা প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী জাতীয় ও কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম দলীয় পতাকা উত্তোলন করেন। জাতীয় পার্টি-জেপি চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ছাড়াও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা এ সময় উপস্থিত ছিলেন। অধ্যাপক একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী তার বক্তৃতায় বলেন, দেশ আজ তীব্র সংকটের মুখোমুখি। শাহবাগে তারুণ্যের প্রতিবাদী কণ্ঠ জেগে উঠেছে। ’৭১-এর মতো প্রতিবাদী হয়ে উঠেছে দেশের তরুণ-তরুণীরা। সারাদেশ আজ উত্তাল। তিনি বলেন, ভয়েস অব পিপল, ভয়েস অব গড। জনতা যে সিদ্ধান্ত দেয় সেটি সরকারকে মানতেই হবে। সংবিধান, সংসদ, ট্রাইব্যুনাল, আইন- সবকিছুর সমন্বয়ে সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিতে হবে যেন দেশে শান্তি আসে। দেশ যেন সাংঘর্ষিক অবস্থায় চলে না যায়, সেজন্য জাতীয় দায়িত্ব থেকে প্রধানমন্ত্রীর উচিত অনতিবিলম্বে সব দলকে নিয়ে বসা। বি. চৌধুরী বলেন, এখান থেকে এটাই প্রমাণিত হয় যে, যারা মনে করেন সহজেই বাংলাদেশকে দাবিয়ে রাখা যায় তা আসলে সম্ভব নয়, সহজও নয়। শাহবাগের প্রতিবাদ মঞ্চ থেকে তাদের এই বার্তা নিতে হবে। তিনি অভিযোগ করেন, শাহবাগের আন্দোলনকে আওয়ামী লীগ দলীয়করণের চেষ্টা করছে। সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, এটা করবেন না, করলে ভবিষ্যতে মুশকিল আছে। কারণ ট্রাইব্যুনালের বিচারের পিছনে রাজনৈতিক আঁতাত আছে বলে লোকে মনে করছে। কিন্তু যারা হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করেছে তাদের ক্ষমা করা যায় না। বিকল্পধারা প্রেসিডেন্ট সরকারের উদ্দেশে আরও বলেন, নিজেদের অধীনে নির্বাচন করার চেষ্টা করবেন না। দেশকে গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিবেন না। এটা করলে মস্তবড় ভুল করবেন। কারণ দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে না যাবার বিষয়ে আমরা অনড়। তিনি সরকারকেই এর সমাধান বের করার আহ্বান জানান। কাউন্সিলের উদ্বোধনী পর্বে স্বাগত বক্তব্যে কাদের সিদ্দিকী বলেন, শাহবাগে সাধারণ মানুষ নিজ থেকে মেতেছে। শুধু রাজাকারদের নয়, যারা তাদের পুনর্বাসন করেছে, সেই বাবাদেরও ফাঁসি চাই। মন্ত্রিসভায় ‘রাজাকার’ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রেখে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা যায় না। তিনি বলেন, শাহবাগে নতুন প্রজন্মের দাবির প্রতি সম্পূর্ণ সমর্থন জানাই। তবে এই মঞ্চ যদি আওয়ামী লীগের ইশারায় পরিচালিত হয় তাহলে আমাদের সমর্থন নাই। সেখানে ‘জয়বাংলা’ স্লোগান চলছে। যদিও এটা ছিল মুক্তিযুদ্ধের সার্বজনীন স্লোগান, কিন্তু এখন আওয়ামী লীগ এটাকে দলীয় স্লোগান বানিয়ে ফেলেছে। আগামী সংসদ নির্বাচনকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার জন্য যদি এই খেলা হয় তাহলে জনগণ এর বিরুদ্ধে দাঁড়াবে। ওরা (নতুন প্রজন্ম) ছোট বলে রাস্তায় দাঁড়িয়েছে। তাই বলে সেখানে বীর মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীকে পানির বোতল মারা হবে তা মেনে নেয়া যায় না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে ব্যর্থ হলেও সফল রাজনৈতিক কর্মী সাহারা খাতুনও সেখানে অপমানিত হয়েছেন। তিনি বলেন, রাজনীতিবিদরা আজ অপমানিত। এজন্য দায়ী দুই দল। ব্যবসায়ী, বাটপার ও লুটেরাদের দখলে আজ জাতীয় সংসদ। গামছা (কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের নির্বাচনী প্রতীক) দিয়ে গলা পেঁচিয়ে তাদের সেখান থেকে বের করে দিতে হবে। কাদের সিদ্দিকী আরো বলেন, কম অপরাধে আবুল কালাম আজাদের মৃত্যদণ্ড হয়েছে। আর তারচেয়ে বেশি গুরুতর অপরাধে কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন দেয়া হয়েছে। এতেই বোঝা যায়, এখানে রাজনৈতিক আপোস রফার বিষয় আছে। আওয়ামী লীগের উদ্দেশে তিনি বলেন, যদি জামায়াতের সঙ্গে বিএনপি না যেত তাহলে আপনারা বিশ বছরেও ক্ষমতায় আসতে পারতেন না। বিএনপি রাজাকারদের সঙ্গে নিয়ে নিজেরাও রাজাকার হয়ে গেছে। এই রাজাকারের সঙ্গ না ছাড়লে জনগণ বিএনপির দিকে মুখ তুলে তাকাবে না। বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল নোমান বলেন, আমরা এখন সর্বগ্রাসী মহাসংকটে। এই সংকট বিরোধী দলগুলো তৈরি করেনি, করেছে সরকার। দেশে এখন আইনের শাসন নেই, আছে দলীয় শাসন। শাসনের নামে চলছে শোষণ, নির্যাতন-নিপীড়ন। এই ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন ঘটাতে দরকার গণঅভ্যুত্থান ও গণআন্দোলন। এজন্য প্রয়োজন জাতীয় ঐক্যের। জেএসডি সভাপতি আ.স.ম আব্দুর রব বলেন, দেশে এখন একটি বিশেষ পরিস্থিতি বিরাজ করছে। ‘জয়বাংলা’ স্লোগান কীভাবে এলো তা সিরাজুল আলম খান ও আমিসহ কয়েকজন ছাড়া আর কেউ জানে না। অথচ আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে এখন নিজ দলীয় স্বার্থে কাজে লাগাতে চায়। আমরা নতুন ধারার ও তৃতীয় রাজনৈতিক শক্তির জন্য রাজনীতি করছি। এ আন্দোলন সফল করতে জাতিকে ’৭১-এর মত আবার ঐক্যবদ্ধ হতে হবে, আরেকটি মুক্তিযুদ্ধ করতে হবে। জাতীয় পার্টি-জেপি মহাসচিব শেখ শহীদুল ইসলাম বলেন, দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, আইন-শৃঙ্খলা, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব সবকিছু নিয়েই আজ প্রশ্ন উঠেছে। শাহবাগ চত্বর প্রমাণ করে আমরা এখন এগুলোর অনেককিছুই হারাতে বসেছি। রাজনীতিবিদরা একে অপরকে বিশ্বাস করতে পারি না। এখন দেখছি আমরা জনগণকেও বিশ্বাস করতে পারছি না। যারা জাতীয় ঐক্যের কথা বলছেন তাদের বলবো—লুণ্ঠনকারীদের সঙ্গে নিয়ে জাতীয় ঐক্য হয় না, এতে দেশের উন্নয়নও সম্ভব না। জাতীয় পার্টি-জাপা মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার বলেন, মুক্তিযুদ্ধের পর রাজনৈতিক কারণে আমাদের মধ্যে মতপার্থক্য হয়ে গেছে। দুটি দলের কারণে দেশের অগ্রগতি থেমে গেছে। এভাবে দেশ চলতে পারে না। শাহবাগের নতুন প্রজন্মের ঢল এবার জাতিকে আবার জাগিয়ে তুলেছে। দেশকে আরও অনেক ধাপ এগিয়ে নিতে আজ বিভেদ ভুলে জাতীয় ঐক্য দরকার। নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, শাহবাগে সরকারি দলের লোকজন আনাগোনা করছে, যেন এই আন্দোলন তাদের বিপক্ষে না যায়। কেন কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় হল না এর জবাব কে দেবে? আওয়ামী লীগও যদি ফাঁসি চায় তাহলে রায় বদলে দেয়ার তরিকা কি? রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা বললেন আপীল করা হবে। কিন্তু এটা ধোঁকাবাজি। অন্যদিকে বিএনপিও খুব হিসেবি কথা বলছে। তারা কি চায় তাও পরিষ্কার নয়। আসলে এই দুটি দলের মোহ থেকে আমাদের মুক্ত হতে হবে। এই দুটি দল আমাদের মুক্তির ভিসা দিতে পারবে না। সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্পে অনিয়মের সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততা সম্পর্কে বলেন, কোনো মুরব্বী অনুরোধ জানালে কথা শোনা আমাদের সংস্কৃতি। সুতরাং এটা যদি অন্যায় হয়ে থাকে কিছু যায় আসে না। আমি প্রয়োজনে পাঁচ হাজার বার মুরব্বীর কথা শুনব। গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসীন মণ্টু বলেন, শাহবাগে জাতীয় বিস্ফোরণ ঘটেছে। আমরা যারা রাজনীতি করি তারা দেয়ালের লিখন পড়ি না। নিজেদের রাজা ও সম্রাজ্ঞী মনে করি। কিন্তু শাহবাগে এবার নতুন প্রজন্ম দেখিয়ে দিয়েছে যা খুশি তা করা যায় না। তিনি বলেন, আজাদকে ফাঁসি দিয়ে কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন দেয়া পাতানো রাজনৈতিক খেলা। তিনি শাহবাগ থেকে সরকারকে শিক্ষা নেয়ার আহ্বান জানান। জেএসডির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মালেক রতন বলেন, শাহবাগের আন্দোলনকে নিজেদের পক্ষে নেয়ার চেষ্টা চলছে। এই ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে নতুন প্রজন্মকে সজাগ থাকতে হবে। কোনো দলের ইঙ্গিতে হলে এই আন্দোলন বিফলে যাবে। শাহবাগের ‘গণজাগরণ মঞ্চ’ থেকে মাত্র তিনশ গজ দূরে অনুষ্ঠিত কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের এই কাউন্সিলে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন:জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদ ও বিকল্পধারার মহাসচিব মেজর (অব.) আবদুল মান্নান। সন্মেলনে অন্যান্যের মধ্যে কাদের সিদ্দিকীর স্ত্রী নাসরিন সিদ্দিকী, বোন সেলিনা খান এবং দলের সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমানও বক্তব্য রাখেন।