পাঁচ শতাব্দী পর রাজা রিচার্ডের সন্ধান!
প্রকাশ : ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২০:০৯
গত ৪ ফেব্রুয়ারি ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ রহস্যের সমাধান করে ব্রিটেন। পাঁচ শতাব্দিরও বেশি সময় পর তারা খুঁজে বের করে ইংলিশ রাজা তৃতীয় রিচার্ডকে। বলা হয়ে থাকে, ইংরেজদের ইতিহাসে তিনিই ছিলেন শেষ রাজা, যিনি যুদ্ধে নিহত হয়েছিলেন। ১৪৮৫ সালে বসওয়ার্থ যুদ্ধে মাত্র ৩২ বছর বয়সে নিহত এই ইংলিশ রাজা পরাজিতের খাতায় নাম লেখালেও ৫২৮ বছর পর ইতিহাস খুঁড়ে জাতি তাকে উদ্ধার করলো সাহসী বীর যোদ্ধা হিসেবে। কিন্তু প্রশ্ন, রিচার্ডকে নিয়ে রহস্যটাই বা কী?
ইংল্যান্ডের রাজপরিবার সে সময় দু’টি ধারায় বিভক্ত ছিলো। একটি হলো হাউজেস অব ল্যানসেস্টর, অন্যটি হাউজেস অব ইয়র্ক। ল্যানসেস্টর পরিবারের প্রতীক ছিলো লাল গোলাপ আর ইয়র্ক পরিবারের প্রতীক সাদা গোলাপ। ১৪৫৫ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে দু’টি পরিবারের অনুগতদের মধ্যে বিক্ষিপ্ত সংঘাতের ঘটনা ঘটে। ইতিহাসে এসব যুদ্ধকেই ‘ওয়ারস অব রোজেস’ বলা হয়। যাতে কোন রাজাই স্বশরীরে অংশ নেননি, শুধুমাত্র বসওয়ার্থের যুদ্ধ ছাড়া।
১৪৮৫ সালে বসওয়ার্থে ল্যানসেস্টর রাজবংশের হেনরি টিউডর বা সপ্তম হেনরির অনুগত বিদ্রোহী বাহিনীর মুখোমুখি হন কিং রিচার্ড। বিপুল বিক্রমে লড়াইয়ের একপর্যায়ে ঘোড়া যখন মাটি-কাদায় আটকে যায়, ঠিক তখন বিশ্বাসঘাতকের প্রাণঘাতী আঘাতে চূর্ণ হয় তার শিরস্ত্রাণ। ইতিহাসবেত্তাদের মতে, হেলমেটের লোহা মাথায় ঢুকে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান রিচার্ড। এরপর উলঙ্গ করে ঘোড়ায় বেঁধে টানা দু’দিন বিভিন্ন এলাকায় প্রদর্শন করা হয় তার মরদেহ। এত অমর্যাদার পরও রাজকীয় অনুষ্ঠান ছাড়াই তা সত্কারের জন্য তুলে দেয়া হয় লেনসেস্টার এলাকার গ্রে ফ্রাইয়ার্সের খ্রিস্টান সন্ন্যাসীদের হাতে। রোমের পোপের সাথে সম্পর্কের চিড় ধরলে অস্টম হেনরি সন্ন্যাসীদের বিতাড়িত করে ঐ কবরস্থানও নিশ্চিহ্ন করেন। বলা হতো, রিচার্ডের দেহাবশিষ্ট তুলে নদীতে ফেলে দেয়া হয়। আর এখানেই রহস্য। একজন বীর যোদ্ধা, যিনি রাজা হয়েও বিদ্রোহীদের হাত থেকে জন্মভূমিকে বাঁচাতে প্রচণ্ড সাহসের সাথে লড়াই করে যুদ্ধের ময়দানে প্রাণ দিলেন, সেই কিং রিচার্ডের ভাগ্যে জোটেনি ন্যূনতম শ্রদ্ধা। ইতিহাসবেত্তা, কবি-সাহিত্যিকরাও বিজয়ীর পক্ষেই সাফাই গাইতে গিয়ে মৃত রাজার প্রতি অসম্মান দেখিয়েছেন। রিচার্ডকে তারা বর্ণনা করেছেন খুনি ও স্বেচ্ছাচারী হিসেবে। এমনকি ইংলিশ মহাকবি শেক্সপিয়ারের ঐতিহাসিক নাটকগুলোতেও হেনরিকে দেখানো হয়েছে একজন কুঁজো, বিকলাঙ্গ ক্ষমতালোভী ভিলেন হিসেবে। পাঁচশ’ বছর একরকম অস্বস্তিতে ভোগার পর বোধোদয় ঘটে ব্রিটিশদের। ১৫ বছর আগে এ নিয়ে লিখতে শুরু করেন নাট্যকার ফিলিপা ল্যাঙলে। তিনি জানান,‘রিচার্ড ন্যায়পরায়ণ ছিলেন এবং তিনি সম্মানের যোগ্য’। মার্কিন ইতিহাসবিদ পল মারে কেনডলের এমন গবেষণা নিবন্ধ পড়ার পর তাঁর দৃষ্টি খুলে যায়। ল্যাঙলে মনে করেন, নিজেদের ভুল নিজেদেরকেই শোধরাতে হবে। তিনি খুঁজতে শুরু করেন নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া গ্রে ফ্রাইয়ার্স কবরস্থান।
ল্যাঙলের সন্দেহ, রিচার্ডকে নদীতে ফেলা হয়নি। কিন্তু সমস্যা হলো, গ্রে ফ্রাইয়ার্স খুঁজে পেলেও তিনি বুঝবেন কিভাবে, কোনটা রাজা রিচার্ড! এর পরপরই ইতিহাস গবেষক জন অ্যাশডন-হিল তার গবেষণায় খুঁজে পান গ্রে ফ্রাইয়ার্স এবং কিং রিচার্ডের বড় বোন অ্যান অব ইয়র্কের এক বংশধরকে। বংশধরদের সাথে ডিএনএর মিল ও কাল নির্ণয়ের কার্বন-ডেটিং পরীক্ষার পর গত ৪ ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত ঘোষণা দেয়া হয়, কঙ্কালটি বীর যোদ্ধা রাজা তৃতীয় রিচার্ডের।