পাকিস্তানে নানা হিসাব-নিকাশ
প্রকাশ : ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২০:০৯
পাকিস্তানের ব্যস্ততম শহরটিতে এক কোটি ডলার দিয়ে অনেক কিছু কেনা যায় বলে মনে হয় না। দেশটির জিহাদি নেতা হিসেবে পরিচিত লস্কর-ই-তৈয়বার প্রতিষ্ঠাতা হাফিজ মুহাম্মদ সাঈদকে ধরিয়ে দিতে গত বছর এই অর্থ পুরস্কার দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের এ ঘোষণার তোয়াক্কা না করেই পাকিস্তানের ব্যস্ততম শহর লাহোরে উন্মুক্ত জীবনযাপন করছেন হাফিজ সাঈদ। অন্য সাধারণ মানুষের মতো তার প্রকাশ্যে চলাফেরা দেখে মনে হয় না যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত এক কোটি ডলার তার জন্য যথেষ্ট। সম্প্রতি নিউইয়র্ক টাইমসের এক বিশ্লেষণে একথা বলা হয়েছে।
ধারণা করা হয়, লস্কর-ই-তাইয়েবার প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা এই হাফিজ সাঈদ। লস্কর-ই-তৈয়বার সদস্যরা ২০০৮ সালে ভারতের মুম্বাইয়ে হামলা চালিয়েছিল। এ হামলায় ১৬০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়। যাদের মধ্যে ছয় জন মার্কিনি ছিলেন। এ হামলার জন্য অভিযুক্ত লস্কর-ই-তৈয়বাকে কালো তালিকাভুক্ত করে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে মার্কিন প্রশাসন। জাতিসংঘ তাকে সন্ত্রাসীদের তালিকায় যুক্ত করেছিলো এবং তাদের দলের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিলো। এতো কিছুর পরও সাঈদের কোনো ভীতি নেই। তিনি বলেন, আমি সাধারণ মানুষের মতো চলাফেরা করি। এটাই আমার স্টাইল। ৬৪ বছর বয়সী হাফিজ বলেন, আমার ভাগ্য সৃষ্টিকর্তার হাতে, যুক্তরাষ্ট্রের হাতে নয়।
সাঈদের খোলামেলা জীবন দেখলে মনে হবে ওবামা প্রশাসন ও তাদের পুরস্কারকে তিনি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছেন। তবে অনেক পাকিস্তানি মনে করে একদিন তাকে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মার্কিন সেনারা যখন আফগানিস্তান ত্যাগের প্রস্তুতি নিচ্ছে তখন লস্কর-ই- তৈয়বার যোদ্ধারাও তাদের পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। তারা কি পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে লড়াই অব্যাহত রাখবে নাকি অস্ত্র সমর্পণ করে রাজনীতিতে যোগ দেবে, না কাশ্মীরে ফিরে যাবে তা অনেকাংশে হাফিজ সাঈদের ওপর নির্ভর করছে।
লাহোরে তার দুর্গের মতো বাড়ি, অফিস এবং মসজিদ। তার সমর্থকরা তাকে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে রাখে। কয়েকদিন আগে এক সন্ধ্যায় দেখা যায় তার বাড়ির সামনে তল্লাশি চালাচ্ছে পুলিশ। আর কিছু পুলিশ বাড়ি সংলগ্ন পার্কে পাহারা দিচ্ছে। এছাড়া অবাঞ্ছিত কেউ প্রবশে করছে কিনা তা ফ্লাড লাইটের আলোয় দেখার চেষ্টা চলছে।
বলা যায়, সাঈদ নিজের নিরাপত্তা যথাযথভাবে নিশ্চিত করে চলেন। গত বছর তিনি জনসমক্ষে ভাষণ দিয়েছিলেন। সে সময় টেলিভিশনগুলোর সংবাদের প্রধান শিরোনাম হয়েছিলেন তিনি। আর অতীতে পশ্চিমা গণমাধ্যমকে এড়িয়ে চললেও এখন প্রায় পশ্চিমা গণমাধ্যম ও ম্যাগাজিনকে সাক্ষাত্কার দেন তিনি।
গেল সপ্তাহে নিউইয়র্ক টাইমসকে দেয়া এক সাক্ষাত্কারে সাঈদ বলেন, তিনি ‘ভুল ধারণা’ ভেঙে দিতে চান। তিনি বলেন, পাকিস্তানের আদালত তাকে অব্যাহতি দিয়েছেন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র কেন পাকিস্তানের বিচার ব্যবস্থাকে শ্রদ্ধা করছে না? তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমার কোনো বিরোধ নেই। ১৯৯৪ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলেন। তখন হাউস্টন, শিকাগো, বোস্টনের সেন্টারে বক্তব্য রেখেছিলেন তিনি।
প্রথমদিকে তার দল পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই-এর নেতৃত্বাধীন যুদ্ধে বিরোধপূর্ণ কাশ্মির এলাকায় ভারতীয় সেনাদের ওপর আঘাত হানতে শরু করে। মূলত আইএসআই এই সংগঠন তৈরিতে ১৯৮৯ সালে ভূমিকা রেখেছিলো। গত দশকেই এ যুদ্ধের সমাপ্তি হয়। এরপর থেকে লস্কর-ই-তৈয়বা তাদের কার্যক্রমে পরিবর্তন আনে। জামাত-উদ-দাওয়া নাম দিয়ে তারা দাতব্য কার্যক্রম শুরু করে। বর্তমানে পাকিস্তান জুড়ে এ দাতব্য প্রতিষ্ঠানের ভালো হাসপাতাল ও স্কুলের নেটওয়ার্ক রয়েছে। ২০০৮ সালের মুম্বাই হামলা তাদের জন্য কুখ্যাতি বয়ে এনেছে। এরপর থেকে সাঈদ ভারতের বিরুদ্ধে বিভিন্ন উস্কানিমূলক বক্তব্য দিয়েছেন। সম্প্রতি তিনি আরেক বিতর্কের সৃষ্টি করেছেন। তিনি বলিউড তারকা শাখরুখ খানকে ভারত ছেড়ে পাকিস্তানে চলে আসতে বলেছেন। তিনি মনে করেন, জঙ্গিরা বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণে লড়াই করে চলেছে। কিন্তু এখন রাজনৈতিক আন্দোলন আরো বেশি শক্তিশালী। আর এ লড়াইয়ের অগ্রভাগে তাই রাজনৈতিক আন্দোলনকেই রাখা উচিত।
সাঈদের এই ভয়হীন জীবন নতুন কিছু নয় বলে মনে করেন পাকিস্তানের বিশেষজ্ঞরা। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ইউরেশিয়া গ্রুপের বিশ্লেষক ও ওবামা প্রশাসনের সাবেক কর্মকর্তা শামিলা এন চৌধুরী বলেন, এই লোকগুলো অপ্রত্যাশিতভাবে প্রকাশ্যে কথা বলছে তা নয়।
গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, গত কয়ে বছর ধরে আফগানিস্তান সীমান্তে তার দলের লোকেরা সক্রিয়। পাকিস্তানের ভেতর দিয়ে ন্যাটোর রসদ আনা-নেয়ার জন্য সাঈদই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলো। কিন্তু এরপরই তার দলের সদস্যরা এ যুদ্ধে যোগ দিল এবং পশ্চিমা সেনা ও ভারতের কূটনীতিকদের এলাকায় হামলা চালাতে শুরু করলো।
জঙ্গি নেতাদের এমন প্রকাশ্য তত্পরতার কারণে এখন একটাই প্রশ্ন, মার্কিন সেনারা আফগানিস্তান ত্যাগের পর কী ঘটবে? একটা হতে পারে, লস্কর-ই-তাইয়েবার জঙ্গিরা তাদের পুরোনো রণক্ষেত্র কাশ্মিরে ফিরে যাবে। সেটা হলে পরমাণু শক্তিধর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সংঘাত বাধার ঝুঁকি বাড়বে। তবে ভরসার কথা হলো পাকিস্তান ও পশ্চিমা কিছু কর্মকর্তা মনে করছেন, ভবিষ্যতে জঙ্গিবাদ ছেড়ে রাজনীতিতে যোগ দেবেন সাঈদ। তবে অবস্থান পরিবর্তন করা এখন কঠিন হয়ে পড়েছে সাঈদের জন্য। কারণ পাকিস্তানে হামলাকারী কিছু জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে তার দলের সদস্যরা যোগ দিয়েছে। এছাড়া অনেকেই তার জঙ্গিবাদী পরামর্শের কারণে দলে রয়েছেন। এছাড়া সমপর্যায়ের নেতাদের কারণে সাঈদ নিজেই অনেক চাপের মধ্যে রয়েছেন।
সাঈদ শুধু লাহোরে নয় বরং সারা পাকিস্তানেই বিচরণ করছেন। ফলে অনেকেই মনে করেন কিছু ভালো জিহাদির পাশে থাকার প্রয়োজন রয়েছে। তবে পাকিস্তানের বিশ্লেষকরা বলছেন, পাকিস্তান-আফগান সীমান্তে গত এক দশকে পাকিস্তানের প্রায় ৩ হাজার ৩০০ সেনা মারা গেছে। যা সেনাবাহিনীর চিন্তা-ভাবনাকে প্রভাবিত করেছে। পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বলছে, গত এক দশকে লস্কর-ই- তৈয়বার অনেক ক্ষতি হয়েছে। এখন অনেক কিছু নির্ভর করছে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর ওপর। চাইলেই এসব সংগঠন নির্মূল করতে পারবে না পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। এখন তারা পরিস্থিতি শান্ত রাখার চেষ্টা করবে। শেষ পর্যন্ত তারা কোন পথে হাঁটবে সেটা এখনই বলা সম্ভব নয়।