ইরানের অর্থনীতির কঠিন সময় সামনে

আপনি যখন তেহরানের রাস্তা দিয়ে হাঁটবেন তখন মনে হবে এটি যেন ইউরোপ বা যুক্তরাষ্ট্রের মতো ব্যস্ত কোন শহর। এক কোটি ২০ লাখ লোকের এ শহরটি তার ব্যস্ততা দিয়ে সবাইকে এখানে আটকে রাখছে। এখনো সেখানে জোরেসোরে নির্মাণ কাজ চলছে। স্থানীয় প্রকৌশলী এবং চীনা ব্যবসায়ীরা বহুতল বিশিষ্ট হাইওয়ের নির্মাণ কাজ শেষ করে আনছেন। রাস্তায় আপনি বিলবোর্ড দেখতে পাবেন যেখানে শোভা পাচ্ছে দক্ষিণ কোরিয়ায় উত্পাদিত বিভিন্ন ইলেকট্রনিক্স সামগ্রীর পণ্য। সুপারমার্কেটগুলোতে হাজার হাজার মানুষ কেনাকাটায় ব্যস্ত। প্রতিদিন নতুন নতুন রেস্তোরাঁর ফিতা কাটা হচ্ছে। ভোজনরসিকদেরও কমতি নেই এসব রেস্তোরাঁয়। এই হলো কয়েকদিনের আগের তেহরান শহরের বর্ণনা। যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ইরানের বিরুদ্ধে যে অর্থনৈতিক যুদ্ধ শুরু করেছে তাতে দিন দিন ইরানের তেল রপ্তানি কমে যাচ্ছে। এক হিসেবে দেখা যায়, এখন ইরানে প্রতিদিন তাদের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অন্তত ১০ লাখ ব্যারেল তেল কম রপ্তানি হচ্ছে। এর ফলে ইরানকে তার মুদ্রা ছাপতে হচ্ছে বেশি। ফলে দেশটির মূদ্রাস্ফীতি ভয়ানকভাবে বেড়েই চলেছে। তবে এর সাথে ইরান সরকারের অব্যবস্থাপনাও কিছুটা যোগ হয়েছে। সবচেয়ে বিপদের খবর হলো ইরান যে পরিমাণ তেল এখনো রপ্তানি করে যাচ্ছে তার অর্থ ব্যাংকগুলো ইরানে পাঠাতে পারছে না। সে হিসেবে পশ্চিমা দেশগুলো রপ্তানির অর্থ নিখুঁতভাবে পর্যালোচনা করতে পারছে। ওবামা প্রশাসনের একজন সিনিয়র অফিসার সমপ্রতি বলেছেন, ইরানের সামনে পরিষ্কার বার্তা আছে। তারা যদি বিতর্কিত নিউক্লিয়ার প্রোগ্রাম থেকে সরে না আসে তাহলে তেল রপ্তানি একেবারে বন্ধ করে দেয়ার প্রচেষ্টা নেয়া হবে। ওই কর্মকর্তা তেলকে ইরানের অর্থনীতির জন্য জীবন রক্ষাকারী রক্ত হিসেবে অভিহিত করেছেন। এতকিছুর পরও ইরান কিন্তু তার তর্কযুদ্ধ থামিয়ে রাখেনি। দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ এমনকি ইসরাইল সহসা তাদের মত পাল্টাতে বাধ্য হবে। কারণ ইরানকে যেমন বহির্বিশ্বের ওপর নির্ভর করতে হয়, তেমনি তাদেরকেও ইরানের ওপর অনেকাংশে নির্ভর করতে হয়। তেহরানের রাস্তায় পারফিউম বিক্রেতা সাইদ রানসিয়ান বলছেন, বিদেশি ব্রান্ডের জন্য ইরানের পারফিউম তেমন চলছে না। ইরানের দেশীয় ধনী ব্যক্তিরা বিদেশি পারফিউম কিনলেও বিদেশিরা কিন্তু ইরানে তৈরি পারফিউম বেশি কিনছেন। অপর একজন মুদি দোকানদার বলছিলেন, ইরানের লোকজন কিনছে বেশি। তারা মনে করছে পশ্চিমা অবরোধের ফলে অনেক জিনিস খুব তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যাবে। তবে কেউ একথা চিন্তা করছে না যে, বিশ্বায়নের এ যুগে আমরা একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। তবে সবচেয়ে আশ্চর্যজনক একটি তথ্য ওবামা প্রশাসনকে চমকে দিয়েছে। সিনিয়র অফিসিয়ালরা যে রিপোর্ট তৈরি করেছেন তাতে উল্লেখ আছে অর্থনৈতিক অবরোধ ইরানের যে পরিমাণ ক্ষতি করছে তার চেয়ে বেশি করছে যুক্তরাষ্ট্রের। হোয়াইট হাউসের ইরান বিষয়ক একজন চিন্তাবিদ ক্ষেপে গিয়ে বলেছেন, অর্থনৈতিক অবরোধ ইরানের লোকজনকে কষ্ট দিলেও সর্বোচ্চ নেতাকে কষ্ট দিচ্ছে না। কারণ তিনি আছেন সুরক্ষিত। অনেক কিছু তার কানে পৌঁছায় না। ওই কর্মকর্তার আশংকা, ইরানের ওপর থেকে অবরোধ তুলে নেয়া হলে তারা তাদের সক্ষমতা দেখাতে বিন্দুমাত্র পিছপা হবে না। এটি ভবিষ্যতে বিপদের কারণ হতে পারে। কারণ দেশটি এখনো পশ্চিমা অবরোধের মধ্যেও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করে যাচ্ছে। এতকিছুর পরও ইরান সরকার তাদের বক্তব্য থেকে একচুলও নড়েনি। তারা বলছেন, আগে অবরোধ তুলে নেয়া হোক তারপর চিন্তা করা যাবে। নানাদিক বিবেচনা করে ইরানের বাইরের সুপার পাওয়াররা আলোচনার কথা বলছেন। হোয়াইট হাউসের একজন সিনিয়র অফিসিয়াল নিশ্চিত করেছেন যে, এ মাসের শেষে ইরানের বিষয়ে একটি বৈঠক হতে পারে। এ বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, চীন, রামিয়া যোগ দিতে পারে। তবে কেউ কেউ বলছেন, এই আলোচনা থেকে খুব ভালো ফলাফল নাও আসতে পারে। তবে ওই কর্মকর্তা এও বলছেন যে, আগামী জুন মাসে দেশটির জাতীয় নির্বাচন। এ সময়ে ইরান সরকার কোন সমঝোতায় আসবে না। তারা মনে করছে, ইরানের লোকজন প্রয়োজনবোধে আরো দু’বছর কষ্ট করুক। কিন্তু পশ্চিমাদের সাথে কোন চুক্তি করতে গেলে তার ফলাফল খারাপ হতে পারে বলেও মত ওই কর্মকর্তার। সাবেক বুশ প্রশাসনের আন্ডার সেক্রেটারি নিকোলাস বার্ন অবশ্য বলেছেন, ইরানের সাথে আলোচনা হতে হলে তেহরানকে অবশ্যই ওবামা প্রশাসনের আস্থায় নিয়ে আসতে হবে। এক্ষত্রে ইসরাইল একটি বড় বিষয়। তেহরান যদি মনে করে আলোচনা থেকে একটি ফলাফল বেরিয়ে আসবে তাহলে তারা হয়তো আলোচনায় আসতে পারে। তবে ওবামা প্রশাসনকে অবশ্যই ইরানের সর্বোচ্চ পর্যায়ে অলোচনা করতে হবে। উল্লেখ্য, নিকোলাস বার্ন জর্জ বুশ প্রেসিডেন্ট থাকাকালে ইরানের বিষয়ে অনেক নীতি তৈরি করেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের ওপর দেয়া অর্থনৈতিক অবরোধ যে একেবারে কাজ দেয়নি তা বললে ভুল হবে। কারণ ইতিমধ্যে ইরানের ব্যবসায়ীরা দেশের বাইরে অর্থ পাঠাতে পারছেন না। ইউরোপ এই প্রথমবারের মতো ইরানের তেল আমদানি বন্ধ করে দিয়েছে। এর ফলে প্রতিমাসে ইরানের একাউন্টে চার থেকে আট বিলিয়ন মার্কিন ডলার কম জমা হচ্ছে। তবে ইরান এসব কিছুর তোয়াক্কা করছে না। তারা তেলের বিনিময়ে বিভিন্ন দেশ থেকে পণ্য নিতে শুরু করেছে। এ সুযোগে চীন এবং ভারতের লাভ হচ্ছে বেশি। ভারতীয় ওষুধ এবং চীনের বিভিন্ন ধরনের পণ্য তেহরানের রাস্তায় শোভা পাচ্ছে। ইরানের তেল রপ্তানি এখনো থেমে না যাওয়ার কারণ হচ্ছে চীন, ভারত, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবংং অন্য কয়েকটি দেশে ইরান তেল রপ্তানি করে যাচ্ছে। কিন্তু রপ্তানির এ অর্থ সংশ্লিষ্ট দেশের স্থানীয় ব্যাংকে জমা থাকছে। ইরান যদি ওই দেশ থেকে কোন পণ্য আমদানি করে তাহলেই কেবল ওই অর্থ খরচ করা যাচ্ছে। কারণ অবরোধের ফলে ব্যাংকগুলো ইরানে কোন অর্থ পাঠাতে পারছে না। তেহরানের ইউনিভার্সিটি অব ইকোনমিক সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক মোহসেন ফারসাদ ইয়েকতা বলেন, এখন হয়তো ইরান কোনভাবে চলছে। ভালোই চলছে। পণ্যের বিনিময় হচ্ছে। কিন্তু সামনে আমাদের কঠিন সময় আসছে। সরকারের অব্যবস্থাপনা এবং মুদ্রাস্ফীতি বাড়তে থাকলে আমাদের জীবনে কঠিন সময় নেমে আসবে। তখন হয়তো পরিস্থিতি সামাল দেয়া আরো কঠিন হবে।