আমি কান পেতে রই...

‘ভ্যালেন্টাইন ডে’ বা ‘বিশ্ব ভালোবাসা দিবস’ শুনলে প্রথমেই যে কথাটি মনে হয় তা হলো প্রেমিক-প্রেমিকা যুগল কিংবা স্বামী-স্ত্রী একসাথে ঘুরে বেড়ানো আর আনন্দ-ফূর্তিতে কাটানো সুন্দর একটি দিন। মধুর সম্পর্কে কাছের মানুষ পাশে থাকলে সময় আরো সুন্দর হয়ে ওঠে। তবে এখানে একটি বিষয় মনে রাখতে হবে, পরিবারের সদস্যগণ এবং বন্ধু-বান্ধবসহ আমাদের আশপাশের প্রিয় মানুষদের একের প্রতি অপরের ভালোবাসা প্রকাশের বা ভালোবাসাকে সম্মান দেখিয়ে শুধু একটি দিন পালন করা নয় বরং সারা জীবন ভালোবাসার বন্ধনে অটুট থাকা। তবে সামাজিক জীব হিসেবে পরস্পরের প্রতি যে ভালোবাসা বা মমত্ব থাকে তা প্রকাশের জন্য যদি একটি বিশেষ দিন থাকে তাহলে সেটা উপরি পাওনা। আর বিশ্ব ভালোবাসা দিবসের চল আমাদের দেশে খুব বেশি দিনের না হলেও মানুষের মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে এবং সব বয়সের মানুষ উত্সাহ নিয়েই তা পালন করে। এর পেছনে মূল কারণ মানুষের ভালোবাসার রূপ চিরন্তন। তা স্থান-কাল কিংবা পাত্র বিচারে ভিন্ন হয় না। যেহেতু ভালোবাসা মানুষের মনের শ্রেষ্ঠ অনুভূতিগুলোর মধ্যে অন্যতম তাই এই দিনকে ঘিরে সারা বিশ্বের মানুষের মাঝে এতো উত্সাহ। ফাল্গুনের বাসন্তী রঙের রেষ কাটতে না কাটতে ভালোবাসার বারতা জানান দিয়ে আসে বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। আমাদের দেশে প্রথমে আসে ফাল্গুন। এর ঠিক পরের দিনই বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। তাই দিনটি যেন আরো বেশি রঙিন হয়ে ধরা দেয় আমাদের দেশের মানুষের কাছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে এই পবিত্র সম্পর্কে ভালোবাসার থেকে কখনো কখনো হিংস্রতা-বর্বরতা আমাদের হকচকিয়ে দেয়। প্রতিনিয়ত পত্রিকা কিংবা টেলিভিশনের সামনে বসলে দেখা যায় নারীর উপর বর্বরতার নির্মম চিত্র। আমাদের দেশে নারীরা বিয়ের পূর্বে পরিবারের সদস্যদের দ্বারা নানা ধরনের নিপীড়নের শিকার হয়, বিয়ের পরে স্বামী কিংবা স্বামীর বাড়ির পরিবারের মানুষদের দ্বারা নির্যাতিত হয় আর স্বামীর নির্যাতন তো প্রকাশ্যে-গোপনে চলেই। আবার নারীরা দেখা যায় নীরবে নিভৃতে এগুলো সহ্য করে যাচ্ছেন। অনেক সময় প্রেমিক তার প্রেমিকার সাথে করে নির্মম আচরণ। যখন ভালোবাসার কথা, গল্পে, কবিতায় স্বপ্নে সময়টা রঙিন হওয়ার কথা, তখন কোনো এক স্বার্থ, দুরভিসন্ধি বয়ে আনে বিপর্যয়, ভালোবাস হারায় রঙ। এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে চাইলে সবার আগে প্রয়োজন মানুষে-মানুষে, নারী-পুরুষের মধ্যে ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে তোলা। এক অপরকে সম্মান করা। শুধু নারী-পুরুষের সম্পর্ক-ই না মানুষে মানুষে আজ যে এতো বিভেদ তা দূর করতে ভালোবাসা ছাড়া অন্য কোনো পন্থা নেই। অনেক সময় দেখা যায় সন্তান বৃদ্ধ বাবা-মায়ের সাথে দুর্ব্যবহার করে, গৃহ পরিচারিকার সাথে খারাপ ব্যবহার করে, সমাজের উঁচু স্তরের প্রায় প্রতিটি মানুষ তার থেকে নিম্ন স্তরের মানুষের সাথে খারাপ ব্যবহার করে। কিন্তু মানুষকে ভালোবেসে, তার পদ-পদবি কিংবা সামাজিক অবস্থা বিচার না করে মানুষ হিসেবে সবাইকে বিচার বিবেচনা করলে আর এই ধরনের ঘটনা ঘটে না। এজন্যই বিজ্ঞজনেরা পারিবারিক শিক্ষা আর মানবিক মূল্যবোধকে শানিত করার উপর জোর দেন সবসময়। দুই যুগ আগের সাথে বর্তমান সময়ের তুলনা করলে দেখা যাবে আমাদের দেশের শহর কিংবা গ্রামের চিত্রে প্রভূত রকমের পরিবর্তন এসেছে। এই পরিবর্তনের কারণে আমরা বাইরে বের হলে দেখি নারী-পুরুষ বন্ধু হয়ে, প্রেমিক-প্রেমিকা হয়ে রাস্তায় বের হয়। যা সময়ের পরিক্রমায় সহজ থেকে সহজতর হয়েছে। এর ভালো এবং খারাপ দুটি দিকই আছে। ভালো দিকটি হলো নারী আরো এগিয়ে যাচ্ছে, সাবলম্বী হচ্ছে। সর্বোপরী দেশের উন্নতি হচ্ছে। আর খারাপ দিকটি— নারী নির্যাতনের কিংবা হয়রানির শিকার হচ্ছে। আর দুটি দিন পার হলেই চলে আসবে বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। এই দিবস দিয়ে অন্যান্য বারের মতো এবারও আমাদের দেশের মানুষের মাঝে, বিশেষ করে তরুণ-তরুণীদের মাঝে উদ্দীপনা চোখে পড়ার মতো। এই উদ্দীপনা তরুণদের পাশাপাশি বয়স্কদের মাঝেও দেখা যায়। প্রযুক্তির কল্যাণে আর পুঁজিবাদি আগ্রাসন, পুরুষতান্ত্রিক সমাজ মানুষে মানুষে ভালোবাসাকেও পুঁজি করে ফেলে। বিশ্ব ভালোবাসা দিবসকে কেন্দ্র করে আসে জমকালো সব অফার। ভালোবাসা দিবসকে স্বার্থক করতে চেষ্টার যেন অন্ত নেই। তবে এই চেষ্টার মাঝে থাকা চাই কিছু মহান ভালোবাসার উদাহরণ, যা এই প্রজন্মের ছুটে চলা অস্থির তরুণ-তরুণীদের স্থিরতা ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করবে। হাতে মোবাইল, তার মধ্যে ইন্টারনেট, সকালে ক্লাস, বিকালে প্রাইভেট পড়া আর চলতে ফিরতে সহজেই প্রেমে পড়া এই প্রজন্ম অল্প সময়ের মধ্যেই বিচ্যুত হয় ভালোবাসা থেকে। ভালোবাসা একটি দিন দিয়ে বাড়ানো কিংবা কমানো যায় না। তবে এই দিনে এসে অন্তত এইটুকু উপলব্ধি করা যায় মানুষে মানুষে ভালোবাসা ছাড়া সম্পর্কগুলোর কোনো মূল্য থাকে না বা সম্পর্কগুলো সুখহীন হয়ে পড়ে। সম্পর্কগুলো তখন আর সম্পর্ক না থেকে বোঝা হয়ে পড়ে। তাই সকল মানুষের প্রতি ভালোবাসার মাধ্যমে আমরা আমাদের জীবনকে আরো সুন্দর করে তুলবো— আমি কান পেতে রই... সেই সত্য সুন্দর চিরন্তন ভালোবাসার জন্য।