শাহবাগের আন্দোলন নিয়ে সতর্ক বিএনপি
প্রকাশ : ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২২:৪০
শাহবাগে ‘গণজাগরণ মঞ্চ’ তৈরি ও ছাত্র-জনতার আন্দোলন নিয়ে এক ধরনের রাজনৈতিক অস্বস্তিতে ভুগছে বিএনপি। মুক্তিযুদ্ধকালে মানবতা বিরোধী অপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে তারুণ্যের প্রতিবাদী কণ্ঠ তীব্রতর হওয়ায় একরকম রাজনৈতিক চাপও অনুভব করছে দলটি। বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটে জামায়াত অন্যতম শরিক হওয়ায় এই চাপ। যে কারণে শাহবাগের আন্দোলন নিয়ে অত্যন্ত সতর্ক অবস্থানে রয়েছে দলটি। আন্দোলন, সরকার ও জামায়াত-শিবিরের কার্যক্রম এবং গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছেন দলটির নীতি-নির্ধারকরা। উদ্ভূত পরিস্থিতি কোনদিকে মোড় নেয় কিংবা এর পরিণতি কোনদিকে গড়ায় তা পরিষ্কার হওয়ার পরেই দলীয়ভাবে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা হবে বলে জানিয়েছেন দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা। বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য এম কে আনোয়ার গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, শাহবাগে আন্দোলনের কারণে বিএনপির চাপে পড়ার কোনো কারণ নেই এবং উত্সাহিত হওয়ারও কিছু নেই। তারুণ্যের অনুভূতি কিংবা সেন্টিমেন্টের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা রয়েছে। তবে সরকার এই মঞ্চকে দলীয়করণ করছে। সরকারি দল ও প্রশাসন সরাসরি নানাভাবে এই আন্দোলনে সহযোগিতা করছে, রাজনৈতিক হীন উদ্দেশ্যে তরুণদের উত্সাহ যোগাচ্ছে। এম কে আনোয়ার আরো বলেন, যারা মনে করছেন, শাহবাগের আন্দোলনের কারণে বিএনপি রাজনৈতিক চাপ অনুভব করছে, তাদের জানা উচিত যে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়ে আমাদের অবস্থান পরিষ্কার ও সুস্পষ্ট। এই বিচার আমরাও চাই, তবে তা হতে হবে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আ.স.ম হান্নান শাহ বলেছেন, শাহবাগের এই আন্দোলন রাষ্ট্রীয়ভাবে বন্দোবস্ত করা। সরকার ও প্রশাসন বিভিন্নভাবে এখানে সমর্থন-সহযোগিতার যোগান দিচ্ছে। এই আন্দোলনকে ‘সাজানো নাটক’ আখ্যায়িত করে তিনি বলেন, ট্রাইব্যুনালে প্রভাব বিস্তার করে রায়ের ক্ষেত্রে দ্বৈতনীতির মাধ্যমে পরিস্থিতি সৃষ্টি করে সরকার পরিকল্পিতভাবে এই ঘটনা ঘটাচ্ছে। অবশ্য তিনি এ-ও বলেছেন, শাহবাগের আন্দোলন থেকে যদি বিশ্বজিত হত্যা, পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্পে দুর্নীতি, শেয়ারবাজার ও হল-মার্ক কেলেঙ্কারিসহ সরকারের ‘স্বেচ্ছাচারিতা’র প্রতিবাদও জানানো হয় তাহলে বিএনপি সেটিকে সাধুবাদ জানাবে।
ঢাকা মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক সাদেক হোসেন খোকাও বলেছেন, তারুণ্যের আবেগের প্রতি তাদের সম্মান রয়েছে। তবে সেই আন্দোলন থেকে যদি আগামীতে দেশে একটি অবাধ নির্বাচনের জন্য নির্দলীয় সরকার ব্যবস্থার দাবি এবং বিশ্বজিত হত্যার প্রতিবাদও উচ্চারিত হতো তাহলে এটা সত্যিকারের আমজনতার প্রতিধ্বনি হিসেবে বিবেচিত হতো।
শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চে ছাত্র-জনতার জমায়েত ও চলমান আন্দোলন সম্পর্কে সরকার ও সরকারি দলের ভূমিকা নিয়ে সন্দেহ-সংশয় থাকলেও বিএনপি ও ১৮ দলীয় জোটের বিভিন্ন পর্যায়ে কথা বলে জানা গেছে, যত অভিযোগ বা সন্দেহই থাকুক না কেন, এই আন্দোলনকে ছোট করে দেখছেন না তারা। তারুণ্যের এই উচ্চারণকে গুরুত্ব না দেয়া ঠিক হবে না বলে মন্তব্য করে তারা জানান, এ কারণে বর্তমানে জামায়াত-শিবিরকে সঙ্গে নিয়ে জোটগত কোনো কর্মসূচি আপাতত তারা পালন করতে চাচ্ছেন না। কারণ কোনো কর্মসূচি দেয়া হলে জামায়াত-শিবির সেটিকে নিজেদের প্রয়োজনে ব্যবহারের সুযোগ নিতে পারে। বর্তমান পরিস্থিতিতে এনিয়ে জনমনে দেখা দিতে পারে বিরূপ প্রতিক্রিয়া। যাতে রাজনৈতিকভাবে মুশকিলে পড়তে পারে বিএনপি।
জানা গেছে, কার্যত এই কারণেই শনিবার নয়াপল্টনে ১৮ দলের পূর্বঘোষিত বিক্ষোভ সমাবেশ কৌশলে স্থগিত করেছে বিএনপি। পুলিশের অনুমতি না পাওয়ার কারণ দেখিয়ে এটা স্থগিত করা হলেও মূলত শাহবাগের আন্দোলনের কারণেই এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। বিএনপির নির্ভরযোগ্য সূত্র ইত্তেফাককে নিশ্চিত করেছে, শাহবাগের আন্দোলনের সমাপ্তির অপেক্ষায় রয়েছেন তারা। এর আগ পর্যন্ত ১৮ দলের জোটগত কোনো কর্মসূচি গ্রহণ করবে না বিএনপি।
তবে পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী আজ সোমবার জেলা-উপজেলায় কালো পতাকা মিছিল করবে বিএনপিসহ ১৮ দলীয় জোট। ইলিয়াস আলী ও চৌধুরী আলমসহ সব ধরনের গুম, খুন ও অপহরণের প্রতিবাদে আজকের এই কর্মসূচি। এছাড়া দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও তেল-গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে আগামী ১৮ ফ্রেব্রুয়ারি সব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় ঘেরাও ও স্মারকলিপি পেশ কর্মসূচি পালন বা স্থগিতের বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
এদিকে, একাত্তরের মানবতা বিরোধী অপরাধের বিচারে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ভেঙ্গে দেয়া ও এই বিচার বন্ধের দাবিতে লাগাতার হরতাল দেয়া হবে বলে জামায়াত আগাম হুমকি দিলেও সেখান থেকে পিছু হটেছে। আগামীকাল মঙ্গলবার দেশব্যাপী বিক্ষোভ কর্মসূচি দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। গতকাল এক বিবৃতিতে দলের ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান এ কর্মসূচির ঘোষণা দিয়ে তা শান্তিপূর্ণভাবে পালন করতে দলের নেতা-কর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
জামায়াত সূত্রে জানা গেছে, মূলত শাহবাগের আন্দোলনের কারণেই অবস্থান পরিবর্তন করে হরতালের পরিবর্তে বিক্ষোভ কর্মসূচি এবং তা শান্তিপূর্ণভাবে পালনের আগাম ঘোষণা দিয়েছে জামায়াত। এছাড়া বিএনপির পক্ষ থেকে আপাতত জোটগত আন্দোলনে সায় না পাওয়ার কারণেও পৃথকভাবে একক এই কর্মসূচি দেয়া হয়েছে।
যেসব দাবি বা প্রতিবাদে কর্মসূচি দেয়া হয়েছে সেখানেও এবার জামায়াত কৌশলী পরবির্তন এনেছে। ট্রাইব্যুনাল ভেঙ্গে দেয়া এবং একাত্তরে মানবতা বিরোধী অপরাধের অভিযোগে আটক দলের শীর্ষ নেতাদের মুক্তির দাবির সঙ্গে এবার যুক্ত করা হয়েছে সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান পুনর্বহাল করা, সরকারের জুলুম-নির্যাতন বন্ধ, বিরোধী দলের সব নেতা-কর্মীর মুক্তি এবং জনদুর্ভোগ লাঘবের দাবিও।
বিবৃতিতে রফিকুল ইসলাম খান অভিযোগ করেন, ট্রাইব্যুনালের বিচারিক কার্যক্রম প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যেই সরকার পরিকল্পিতভাবে সারাদেশে সন্ত্রাস ও নৈরাজ্য সৃষ্টি করছে। ট্রাইব্যুনালকে নিজস্ব ছকে চলতে বাধ্য করার জন্য সরকারের মন্ত্রী, এমপি ও আওয়ামী লীগের কেন্দ ীয় নেতারা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বক্তব্য দিচ্ছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।