সারাদেশে বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার চুরির নিয়ন্ত্রক দুই সিন্ডিকেট

দুইটি সিন্ডিকেটের অধীনে সারাদেশে বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার চুরি হয়ে থাকে। একটি সিন্ডিকেট চুরি করা ট্রান্সফরমারের বৈধ কাগজপত্র তৈরির পাশাপাশি খনিজ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের প্রভাবশালীদের সঙ্গে লিয়াজোঁ করে। অন্য সিন্ডিকেট মাঠে-ময়দানে ট্রান্সফরমার চুরি করে বেড়ায়। দুই সিন্ডিকেটের মূল হোতা একজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা। তার পৃষ্ঠপোষকতায় অন্তত ৭৫ জন চুরিতে সক্রিয়। এই চক্রের ১২ জনকে পুলিশ হত্যাকারী হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। একজন গ্রেফতার হলেও বাকি ১১ জন ঢাকার বাইরে পলাতক আছে। গত ৩ ফেব্রুয়ারি মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় ট্রান্সফরমার চুরিচক্রের সদস্যদের হাতে ডিবির এস আই শরীফুল খুনের পর ঘটনা তদন্তে এমনই তথ্য পেয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। গোয়েন্দা পুলিশ ট্রান্সফরমার চুরিচক্রের সদস্যদের মোবাইল ফোনের কথোপথনও রেকর্ড করেছে। এরকম একটি ফোনালাপের রেকর্ডে রয়েছে, ‘একটা পুলিশরে শোয়াইছি। কিছুই হইব না। খালি আইওরে (তদন্ত কর্মকর্তা) ১০ হাজার মাইরা দিবি। দেখবি, খালাস।’ এই দুই সন্দেহভাজন এখন গোয়েন্দা জালে বন্দী। এ ঘটনায় জড়িত আরও কয়েকজনকে শনাক্ত করেছে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। তাদের গ্রেফতার করতে রাজধানীর বাইরে বিভিন্ন জেলায় অভিযান চলছে। গত ৩ ফেব্রুয়ারি এস আই শরীফুল খুনের সময় পুলিশের ছোঁড়া গুলিতে আহত হয়ে ট্রান্সফরমার চোরদলের ট্রাকচালক শিপন ধরা পড়ে। সে বর্তমানে গোয়েন্দা পুলিশের হেফাজতে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিত্সাধীন। তার দেয়া তথ্য অনুযায়ী গাজীপুরের কোনাবাড়ি এলাকায় চোরাই ট্রান্সফরমার কারখানা আবিষ্কৃত হয়েছে। সেখান থেকে কারখানার দুই কর্মচারী জুয়েল ও আনোয়ারকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গোয়েন্দা হেফাজতে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এদিকে সন্দেহভাজন দুই খুনির মোবাইল ফোনের কথোপথন ছাড়াও এক চোরের স্ত্রীর সঙ্গে আরেক চোরের মোবাইল ফোনের কথোপথনও রেকর্ড করা হয়েছে। এস আই শরীফুল হত্যার ঘটনা তদন্ত সংশ্লিষ্ট এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, গুলিবিদ্ধ ট্রাকচালক শিপনকে দেখতে হাসপাতালে গিয়েছিলেন তার স্ত্রী। বাসায় ফিরে তিনি চোরদলের অপর এক সদস্যের কাছে মোবাইল ফোন করে দুঃখের কথা জানান। মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের রেকর্ড করা কথোপথন অনুযায়ী শিপনের স্ত্রী মোবাইল ফোনের অপর প্রান্তের ব্যক্তিটিকে বলছেন, ‘লোকটারে দেইখ্যা আইলাম, খুবই অসুস্থ। মনে হইল এইবার শক্ত জায়গায় ধরা খাইছে। কে ধইরা দিছে, তাও কইছে। ওর কারণেই আমাগো কারখানা চিইন্যা ফালাইছে পুলিশ। ইহজনমের ভাত উইঠ্যা গেছে। ওরে খায়া ফালামু।’ তখন অপর প্রান্ত থেকে বলা হয়, ‘চিন্তা কইরেন না ভাবী, ত্রিশালে চুরি করতে গিয়ে চাইরজন (চারজন) গণপিটুনিতে মরেছিল। তখন তো আমাগো একটা লোকও ধরা খায় নাই। পরে সেলিম গাড়িও উদ্ধার কইরা আনছে। শুধু কোর্টে দুই লাখ টাকা ঢালতে হইছে।’ সূত্র জানায়, সমপ্রতি ময়মনসিংহের ত্রিশাল এলাকায় ট্রান্সফরমার চোর সন্দেহে চার ব্যক্তি গণপিটুনিতে নিহত হয়। চোরদলের সদস্যদের কথোপথনে ওই ঘটনার চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ হয়েছে। নিহত ব্যক্তিরা আসল চোরদলের কেউ না। যারা পুলিশ হত্যা করেছে তারাই ওই এলাকায় ট্রান্সফরমার চুরি করেছে। পরে নিরাপদে পালিয়ে যাওয়ার পর অন্য লোকজনকে সন্দেহভাজন হিসেবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, দুইটি সিন্ডিকেটের অধীনে সারাদেশে ট্রান্সফরমার চুরি হয়ে থাকে। একটি সিন্ডিকেট চুরি করা ট্রান্সফরমারের বৈধ কাগজপত্র তৈরির পাশাপাশি খনিজ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের প্রভাবশালীদের সঙ্গে লিয়াজোঁ করে। অন্য সিন্ডিকেট মাঠে-ময়দানে ট্রান্সফরমার চুরি করে বেড়ায়। দুই সিন্ডিকেটের মূল হোতা একজন প্রভাবশালী নেতা। তার পৃষ্ঠপোষকতায় অন্ততপক্ষে ৭৫ জন চুরিতে সক্রিয়। এই চক্রের ১২ জনকে পুলিশ হত্যাকারী হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। একজন গ্রেফতার হলেও বাকি ১১ জন ঢাকার বাইরে পলাতক আছে।