বিশ্ববাজারে গদখালির ফুল প্রধান স্থান দখল করবে

ফুলের রাজধানী গদখালি এসে মুগ্ধ হলেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান ডব্লিউ মজীনা। আবেগ আর উচ্ছ্বাসের সবটুকু ফুটে উঠল তার কণ্ঠে। বললেন, ‘বিশ্ববাজারে যশোরের গদখালির ফুল প্রধান স্থান দখল করবে। আমি স্বপ্ন দেখি গদখালির ফুল যেন মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, আমেরিকায় রফতানি হয়। মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়ে বাংলাদেশ হয়ে উঠে স্বপ্নের সোনার বাংলায়। রয়েল বেঙ্গল টাইগারের দেশ বাংলাদেশ হয়ে উঠুক এশিয়ার বাঘ।’ গতকাল সোমবার সকালে যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার পানিসারা গ্রামের একটি মাঠে ফুলচাষীদের সমাবেশে তিনি এসব কথা বলেন। মার্কিন রাষ্ট্রদূত বললেন, চীন নয়, বাংলাদেশই হয়ে উঠবে পোশাক শিল্পের প্রধান রফতানিকারক দেশ। পাশাপাশি জাহাজ, জুতা ও চামড়াজাত দ্রব্য, ফার্মাসিউটিক্যালস, সিরামিক, সিল্ক ও পাটজাত পণ্য রফতানি করে বাংলাদেশ হয়ে উঠবে সম্ভাবনার দেশে। বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল আই-এর ‘হূদয়ে মাটি ও মানুষ’ অনুষ্ঠানের পক্ষ থেকে এই সমাবেশের আয়োজন করা হয়। বক্তৃতার শুরুতেই মার্কিন রাষ্ট্রদূত সমবেত ফুলচাষীদের ‘আসসালামু আলাইকুম’ এবং ‘শুভ সকাল’ জানান। প্রবেশ গেট থেকে মঞ্চ পর্যন্ত হরেক রং ও বাহারি ফুলে সাজানো পরিবেশে আবেগাপ্লুত মজীনা হাত নেড়ে সবাইকে অভিবাদন জানান। তিনি বলেন, ‘বিশ্বের অনেক জায়গায় থেকেছি। অনেক মঞ্চে বক্তৃতা করেছি। কিন্তু এ জায়গার মতো এত সুন্দর জায়গায় কখনো দাঁড়াইনি।’ তিনি বলেন, ‘ঢাকায় গিয়ে বিদেশের নয়, শুধু বাংলাদেশে উত্পাদিত ফুল কিনতে চাই। এরচেয়েও বেশি কিছু চাই। তাহলো বাংলাদেশের ফুলই যেন বিশ্ব বাজার দখল করে রাখে।’ অনুষ্ঠানে ইউএস এইড মিশন প্রধান রিচার্ড গ্রিন বলেন, বাংলাদেশের কৃষকদের সম্ভাবনা রয়েছে। এখানকার কৃষকদের পরিশ্রম আর বিনিয়োগের ফলাফল এখানকার সুন্দর সুন্দর ফুল। তিনি উন্নত বীজ, বাজারজাত ও সংরক্ষণ সমস্যা সমাধানের মাধ্যমে ফুলের রফতানি বাণিজ্যের অপার সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন। চ্যানেল আই-এর পরিচালক (বার্তা) শাইখ সিরাজ বলেন, এখানকার কৃষকরা নিজেদের জ্ঞান, বুদ্ধি দিয়ে যা করেছেন, তা পৃথিবীর অনেক দেশেই সম্ভব নয়। তিনি ফুলচাষী ও ব্যবসায়ীদের ২২টি সংগঠনের পক্ষ থেকে তুলে ধরা দাবি ও প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে গদখালিতে একটি অত্যাধুনিক ফুল প্রক্রিয়াজাতকরণ (প্যাকেজিং ও গ্রেডিং) প্রতিষ্ঠান ও হিমাগার স্থাপন, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটে একটি ফুল গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন, ফুলের উন্নত চারার জন্য একটি টিস্যু কালচার ল্যাব স্থাপনের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। সে সঙ্গে ঢাকায় একটি কেন্দ্রীয় ফুলের বাজার স্থাপনে ভূমিকা রাখার জন্য মার্কিন রাষ্ট্রদূত ও ইউএসএআইডির দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। সকাল ৭টায় ফুলের পাইকারি বাজার গদখালিতে পৌঁছে মজীনা ফুলচাষীদের সাথে কথা বলেন। সৈয়দপাড়া গ্রামের সাইফুল ইসলাম, হাড়িয়ার বিল্লাল হোসেন, কেশচন্দ্রপুরের আব্দুল মালেক, মাঠুয়াপাড়ার মফিজুল, হাজী মো. নিজামউদ্দিন প্রমুখ ফুলচাষীর সাথে আলাপকালে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ফুলচাষের নানা বিষয় জানতে চান। চাষীরা জানান, ফুলের পর্যাপ্ত পাইকারি বাজার, কোলস্টোরেজ, বীজ সংরক্ষণাগার না থাকার সমস্যায় তারা ভোগেন। রাষ্ট্রদূতের প্রশ্নের জবাবে নারাঙ্গালী গ্রামের লিয়াকত জানান, গ্লাডিউলাসের চেয়ে রজনীগন্ধার দাম কম হলেও একবার চাষাবাদে টানা দুই বছর ফুল পাওয়া যায়। একটি গ্লাডিউলাসের উত্পাদন খরচ তিন টাকা এবং ভ্যালেন্টাইনস ডে সামনে রেখে তা সাত টাকা লাভে বিক্রি করছেন বলে জানান আব্দুল মালেক। রাষ্ট্রদূত এখান থেকে পানিসারা গ্রামে রুস্তম আলী সরদারের জারবেরা ফুলের বাগানে যান। এখানে বাইশ শতক জমিতে বিশ লাখ টাকা ব্যয়ে জারবেরা চাষ করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে ফুলচাষী কল্যাণ সমিতির সভাপতি আব্দুর রহিমও বক্তব্য রাখেন। দেশের প্রথম ফুল চাষী শের আলী সরদার, ফুল চাষী মীর বাবর জান বরুন, মোহাম্মদ ইসমাইল, মোহাম্মদ শাহজাহানসহ পাঁচ শতাধিক ফুল চাষী ও ব্যবসায়ী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। বেনাপোল বন্দর পরিদর্শনে মজীনা বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ডব্লি¬উ ড্যান মজিনা বেনাপোল কাস্টমস, বন্দর ও ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট পরিদর্শন করেন। বেলা ১১টায় বেনাপোল কাস্টমস হাউজের হল রুমে কাস্টমস ও বন্দর কর্মকর্তাদের সাথে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। বৈঠকে সাংবাদিকদের ঢুকতে দেয়া হয়নি। সভায় উপস্থিত একটি সূত্র জানায়, এ সময় ড্যান মজীনা বেনাপোল বন্দরে ওয়েববেইজ টার্মিনাল গড়ে তোলার ওপর মতামত ব্যক্ত করেন। বৈঠক শেষে কাস্টম হাউজের অনলাইন সিস্টেম ঘুরে দেখেন। পরে বেনাপোল চেকপোস্ট ইমিগ্রেশন ও বেনাপোল বন্দরের আমদানিকৃত পণ্য ওঠা-নামা পরিদর্শন করেন। তবে তিনি বন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় অসন্তোষ প্রকাশ করেন। বন্দরের পণ্য চুরি প্রতিরোধে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা ও স্ক্যানিং মেশিন স্থাপনের পরামর্শ দেন। পরিদর্শন শেষে মার্কিন রাষ্ট্রদূত সাংবাদিকদের বলেন, বাংলাদেশ একটি সম্ভাবনাময় দেশ। এখানকার মানুষ পরিশ্রমী। এ সময় তার সাথে ছিলেন স্ত্রী গ্রেস মজীনা, ইউএসএইড মিশন প্রধান রিচার্ড গ্রিন, প্রেস সেক্রেটারি কেনিলেকার্থি ও ব্যক্তিগত সচিব কারসন নাইট ওয়ান। বেনাপোল কাস্টমস কমিশনার মাসুদুল কবির, বন্দর পরিচালক আব্দুল আওয়াল, কাস্টমস যুগ্ম-কমিশনার আকবর হোসেন ও শার্শা উপজেলা নির্বাহী অফিসার কামরুল আরিফ উপস্থিত ছিলেন। কলারোয়ার ‘ইতালিনগর’ পরিদর্শন কলারোয়া (সাতক্ষীরা) সংবাদদাতা জানান, গতকাল দুপুরে কলারোয়া উপজেলার ‘ইতালিনগর’ খ্যাত মির্জাপুর পালপাড়ার টালি কারখানা পরিদর্শন করেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান ডব্লিউ মজীনা। তিনি টালি নির্মাণের বিভিন্ন কলাকৌশল ঘুরে দেখেন। স্থানীয় টালি মালিক-শ্রমিকরা মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে কাছে পেয়ে আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন। মার্কিন রাষ্ট্রদূত স্থানীয় সংবাদ কর্মীদের সাথে কোন প্রতিক্রিয়া না জানিয়ে শুধু বলেন, তার প্রতিটি মিনিট ব্যস্ততার সাথে কাটছে। এই মুহূর্তে কথা বলা সম্ভব নয়। টালির মালিক ও শ্রমিকরা জানান, টালি উত্পাদন করে দেশের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করলেও এর দিকে তেমন নজর নেই কারোর। যদি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া যায়, তাহলে কারখানাগুলোর উত্পাদন মান আরো বিকশিত হতো। প্রতিদিন শত শত শ্রমিকের শ্রমের বিনিময়ে এখানে তৈরি হয় এক একটি টালি। কারিগরদের হাতে গড়া টালি চলে যায় সভ্যতা, তথ্য, প্রযুক্তি ও সম্পদে ভরা উন্নত দেশ ইতালিতে। সেখানে রয়েছে টালির শোরুম। ইতালিসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এ দেশের মাটি দিয়ে গড়া এই টালি মেঝেতে, ছাদে, দেয়ালে টাইলস হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এ সময় অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সহকারী জুবাইন মাসুম, জাতীয় ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের উপ-পরিচালক বিদ্যুত্ কুমার, কলারোয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার হুসাইন শওকত, উপজেলার টালি মালিক সমিতির সভাপতি ও ক্লে টাইস ফ্যাক্টরির স্বত্বাধিকারী গোষ্ঠ চন্দ পাল।