গন্তব্য কোথায়?
প্রকাশ : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২২:৫৩
যতই সময় গড়াচ্ছে ততোই ফুঁসছে শাহবাগের ‘গণজাগরণ মঞ্চ’। সমাবেশ ঘটছে আমজনতার। আন্দোলনে সামিল হচ্ছেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী, রাজনৈতিক-সংস্কৃতি কর্মী ও বিভিন্ন পেশাজীবী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ। শাহবাগ থেকে সারাদেশ-ছড়িয়ে পড়ছে আন্দোলন। দেশের সীমানা পেরিয়ে এই আন্দোলন এখন একাকার হয়ে গেছে বিশ্বের যেখানেই বাঙালি আছে সেখানেই। সর্বত্র গগণবিদারী একটিই স্লোগান, একটিই দাবি- ‘কাদের মোল্লাসহ একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি চাই’। কিন্তু কেউ জানে না, এই আন্দোলনের গন্তব্য কোথায়, কবে কীভাবে নিষ্পত্তি ঘটবে নতুন প্রজন্মের এই অভাবনীয় সুন্দরতম জাগরণের, কিংবা এই যাত্রার শেষ কোথায়।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মনেও যে এই প্রশ্নের উদ্রেক হয়েছে তা স্পষ্ট প্রতীয়মান রবিবার জাতীয় সংসদে রাখা তার বক্তব্যে। আন্দোলনকারী নতুন প্রজন্মকে উদ্দেশ্য করে সংসদে তিনি বলেছেন ‘তোমরাই আগামী দিনে বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেবে। তোমাদের এই আন্দোলন বৃথা যাবে না। আন্দোলনের পাশাপাশি তোমরা লেখাপড়াও চালিয়ে যাও। একটি সময়সীমা ঠিক করে আন্দোলন করো।’
গণজাগরণের উদ্যোক্তা কিংবা চলমান আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারীরাও এর গন্তব্য সম্পর্কে এখন পর্যন্ত সুস্পষ্টভাবে কিছু জানাননি। তাদের একটিই কথা, একটিই শপথ- দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তারা ঘরে ফিরবেন না। তবে কোনদিন, কখন, কীভাবে এই দাবি বাস্তবায়ন হয়েছে বা হবে বলে নির্ধারণ করা হবে, সেই প্রশ্নেরও উত্তর এখন পর্যন্ত আজানা। এ যেন মিলিয়ন ডলার প্রশ্ন।
এ ব্যাপারে সুশাসনের জন্য নাগরিক, সুজন সাধারণ সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, কীভাবে এর নিষ্পত্তি হবে বলা দুরূহ। তবে আমার বিশ্বাস, তরুণ সমাজ যে সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছে, তারা সামনে প্রজ্ঞারও স্বাক্ষর রাখবেন। তিনি বলেন, দেশের তরুণ সমাজের এ এক স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ, অভাবনীয় বিস্ফোরণ। এটা আমাদের জন্য অত্যন্ত আশার, ভরসার কথা। প্রজন্ম চত্বর থেকে তারা যেসব দাবি তুলেছেন সেগুলো অত্যন্ত যৌক্তিক, এগুলোর নিষ্পত্তি হওয়া অত্যাবশ্যক। কারণ এগুলো মানুষের প্রাণের দাবি, মনের কথা। তরুণদের উদ্দেশে বলতে চাই-তোমাদের লাখো সালাম, জয় হোক তারুণ্যের, জয় হোক বাংলার মানুষের, অবসান ঘটুক সমাজের সকল অবিচার-দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়নের, বন্ধ হোক জঙ্গীবাদ, বিদায় নিক সাম্প্রদায়িক ও ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতি।
এদিকে, গণজাগরণ চত্বরের এই তাপ তপ্ত করে তুলছে দেশের সার্বিক রাজনীতিকেও। বিরাজ করছে এক ধরনের গুমোট পরিস্থিতি। অরাজনৈতিক মঞ্চ থেকে তরুণ প্রজন্ম কেবলমাত্র যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবি জানাচ্ছেন। তবে তাদের অজান্তেই এই মঞ্চকে কেন্দ করে রাজনীতিতে চলছে পক্ষ-বিপক্ষের বাতাস। শুরু হয়েছে পারস্পরিক দোষারোপের ভিন্ন এক নতুন খেলা। তবে কোনো কোনো রাজনৈতিক সংগঠন ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রশ্নে কোনো আপোষ নেই। এনিয়ে তর্ক-বিতর্কও কাম্য নয়।
রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এরকম বহুমাত্রিক বক্তব্য-মন্তব্যের মধ্যেই ধারণা করা হচ্ছে, আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার একাত্তরের মানবতা বিরোধী অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত জামায়াতের নায়েবে আমীর দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলার রায় হবে। রায়ের আগে আজ মঙ্গলবার দেশব্যাপী বিক্ষোভ করবে জামায়াত। যদিও জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান রবিবার এ কর্মসূচির ঘোষণা দিয়ে তা শান্তিপূর্ণভাবে পালন করতে দলের নেতা-কর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তারপরেও জনমনে বিরাজ করছে শঙ্কা।
আর এক সপ্তাহ পরেই আসছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। এর আগে চলমান গণআন্দোলনের ন্যায্য নিষ্পত্তি না হলে একুশের প্রথম প্রহরে কিংবা এর পরবর্তী সময়ে গণজাগরণ মঞ্চের সঙ্গে সরাসরি সংহতি প্রকাশ না করা রাজনৈতিক সংগঠনগুলো কেন্দ ীয় শহীদ মিনারসহ সারাদেশে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানাতে যেতে পারবেন কিনা তা নিয়েও আগাম উদ্বেগ রয়েছে। সামগ্রিক এই পরিস্থিতিতে আগামী কয়েকটি দিনকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন পর্যবেক্ষকমহল।