ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধনের প্রস্তাব মন্ত্রিসভায় অনুমোদন

যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের যে কোন রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ ও সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিও আপিল করার সুযোগ পাচ্ছে। এছাড়া প্রস্তাবিত সংশোধীত আইনে, আপিল করার পর ৪৫ দিনের মধ্যে এ মামলা নিষ্পত্তি করার বিধান রাখা হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ মামলা নিষ্পত্তি করতে না পারলে গ্রহণযোগ্য কারণ লিপিবদ্ধ করে আরো ১৫ দিন সময় বাড়াতে পারবে। অর্থাত্ সর্বোচ্চ ৬০ দিনের মধ্যে আপিল নিষ্পত্তি করতে হবে। এমন বিধান সম্বলিত যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধনের খসড়ায় চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। গতকাল সোমবার সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে এ অনুমোদন দেয়া হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ জানিয়েছেন, মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত সংশোধীত আইনের খসড়াটি বিল আকারে জাতীয় সংসদের চলতি অধিবেশনেই উপস্থাপন করা হবে। মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোশাররাফ হোসেন ভুঁইয়া প্রেসব্রিফিংয়ে বলেন, মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধনের খসড়ায় আপিল করার বিষয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে সমতা আনা হয়েছে। বর্তমান আইন অনুযায়ী, আসামি যে অভিযোগ থেকে খালাস পাবেন, কেবল ওই খালাসের রায়ের বিরুদ্ধেই সরকার আপিল করতে পারবে। সংশোধীত আইনটি সংসদে অনুমোদন পেলে পুরো রায়ের বিরুদ্ধেই বাদী-বিবাদী উভয় পক্ষই আপিল করতে পারবে। তিনি বলেন, যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের তৃতীয় এই সংশোধনীতে আরো বিধান রাখা হয়েছে, রায়ের ৩০ দিনের মধ্যে করা আপিলের ৪৫ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হবে। তবে এ সময়ের মধ্যে করতে না পারলে তা গ্রহণযোগ্য কারণ দেখিয়ে আপিল বিভাগ আরো ১৫ দিন সময় পাবে। অর্থাত্ সর্বোচ্চ ৬০ দিনের মধ্যে আপিল নিষ্পত্তি করতে হবে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত আইন সংশোধনের খসড়াটি বিল আকারে জাতীয় সংসদের চলতি অধিবেশনেই উপস্থাপন করা হবে। জাতীয় সংসদে অনুমোদন হলে তা গেজেট আকারে প্রকাশ করা হবে। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী মামলায় ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে সংশোধিত আইনেই আপিল করা যাবে বলে আশা করা যায়। মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত খসড়ায় আগের আইনের ২১(২) ধারায় ‘সরকার’ শব্দের পর ‘অথবা যেকোনো সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি’ ও খালাস শব্দের সঙ্গে ‘অপর্যাপ্ত দণ্ড’ এবং ২১(৩) ধারায় দণ্ডের সঙ্গেও ‘অপর্যাপ্ত দণ্ড’ শব্দ যুক্ত করা হয়েছে। উল্লেখ্য, ১৯৭৩ সালে প্রণীত যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে সরকারের আপিলের কোনো সুযোগ ছিল না। পরে ২০০৯ সালে আইন সংশোধন করে এতে খালাসের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ রাখা হয়। তবে দণ্ড বাড়াতে আপিলের কোন সুযোগ নেই। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ গত ৫ ফেব্রুয়ারি আব্দুল কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন সাজার আদেশ দেয়ার পর দণ্ডের মাত্রা বাড়াতে আপিলের সুযোগ না থাকার বিষয়টি উঠে আসে। ওইদিন বিকাল থেকেই কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবিতে সর্বস্তরের মানুষ রাজধানীর শাহবাগের প্রজন্ম চত্বরে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। একাত্তরে ‘মিরপুরের কসাই’ হিসেবে পরিচিত কাদের মোল্লাসহ সকল যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে দেশজুড়ে শুরু হয়েছে জাগরণ। এই প্রেক্ষাপটে আইন সংশোধনের এই উদ্যোগ গ্রহণ করে সরকার। গত রবিবার সচিবালয়ে বৈঠকের পর আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ বলেন, আইন সংশোধনের পর প্রসিকিউশন ও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি উভয়েই আপিল করতে পারবে। এ সংশোধন নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনো সুযোগ নেই, আসামিপক্ষ এবং প্রসিকিউশনের সমান অধিকার সৃষ্টির জন্যই আইন সংশোধন হচ্ছে। এদিকে মন্ত্রিসভা সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) আইন-২০১৩-এর খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে। এ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, আন্তঃরাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসসহ বিভিন্ন সন্ত্রাসকে সজ্ঞায়ন ও আইনকে আরো যুগোপযোগী করতে এ সংশোধন করা হচ্ছে। তিনি বলেন, বৈশ্বিক সমস্যা এবং ক্রস বর্ডার টেরোরিজম বাড়ছে। তাই আন্তঃরাষ্ট্রের সহযোগিতা ছাড়া কার্যকরভাবে সন্ত্রাস দূর করা যায় না। এছাড়া ‘দি পার্টনারশিপ (সংশোধন) আইন-২০১৩-এর নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। এর মধ্য দিয়ে বিভিন্ন সেবার ফি বাড়ানো হয়েছে উল্লেখ করে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, বিভিন্ন সার্ভিসের ফি চার টাকা, ১০ টাকা এমনকি দেড় টাকাও ছিল, যা সেকেলে। এসব সার্ভিস ফি সামঞ্জস্য করা হয়েছে। এর ফলে সরকারের রাজস্ব আয়ও বাড়বে। বাংলাদেশ পানি সুরক্ষা আইন-২০১৩-এর খসড়াও চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। গত বছরের ২১ মে এই আইনটির নীতিগত অনুমোদন দেয়া হয়। এ প্রসঙ্গে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, পানি সম্পদের সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করাই আইনের মূল লক্ষ্য। পানি নিয়ে একটি নীতি আছে কিন্তু একটি আইনি কাঠামো থাকলে নীতি বাস্তবায়ন সহজ ও কার্যকর হয়। এছাড়া প্রতিবন্ধীদের অধিকার সংজ্ঞায়িত করে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার সুরক্ষা আইন-২০১৩ এ নীতিগত অনুমোদন দেয়া হয়েছে। আইনটি লঙ্ঘন করলে তিন বছরের কারাদণ্ড ও পাঁচ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। সড়ক সংরক্ষণ তহবিল বোর্ড আইন ২০১৩-এর খসড়াও চূড়ান্ত অনুমোদন পেয়েছে মন্ত্রিসভার বৈঠকে। গত বছরের ১০ সেপ্টেম্বর মন্ত্রিসভা কিছু পর্যবেক্ষণ রেখে এই আইনের খসড়ার নীতিগত অনুমোদন দেয়। এছাড়া মন্ত্রিসভা ‘দি সোসাইটিস রেজিস্ট্রেশন (সংশোধন) আইন ২০১৩’র খসড়ার নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে।