ভাষা সমর্থক ইংরেজি দৈনিক ‘অবজারভার’র ওপর নিষেধাজ্ঞা
প্রকাশ : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২২:৫৪
ফেব্রুয়ারির দিনগুলো দ্রুত পার হয়ে যাচ্ছে। ছাত্রাবাসগুলোতে রাজনীতিমনস্ক ছাত্রদের ব্যস্ততার কমতি নেই। পোস্টার লেখা, ইস্তেহার ছাপা ও বিতরণ, ছাত্রাবাসে-ছাত্রাবাসে যোগাযোগ যেন নিত্যদিনের কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একুশের কারিগরদের সঠিক ধারণা ছিল না মুসলিম লীগ কী কেন্দ্রে, কী প্রদেশে কতটা ফ্যাসিস্ট চরিত্রের। দেশবিভাগের পরপরই উত্তরাঞ্চলের কৃষক আন্দোলন বিশেষত তেভাগা এবং কমিউনিস্ট নেতাকর্মীদের দমনে পূর্ববঙ্গ সরকার কী ভয়াবহ দমননীতির স্টিমরোলার চালিয়েছিল পত্রপত্রিকায় তা প্রায় অপ্রকাশিত থেকে গেছে। এমন কি ইলা মিত্রের ওপর অমানুষিক দৈহিক নির্যাতনের কাহিনীও। এসব সম্বন্ধে ছাত্রসমাজ সামান্যই অবহিত ছিল। জানা ছিল না রাজশাহী জেলে খাপড়া ওয়ার্ডে রাজবন্দিদের ওপর গুলি চালনার মতো বীভত্স ঘটনা। অবশ্য বায়ান্ন সালে পৌঁছে লীগ শাসনের ধার আপাত দৃষ্টিতে কিছুটা কমে এলেও বাস্তবে তা প্রায় এক রকমই ছিল- ক্ষেত্র বিশেষে, পাত্র বিশেষে কিছুটা ভিন্নতা- এই যা। পূর্ববঙ্গের রাজধানী ঢাকায় অধিকাংশ দৈনিক পত্রিকাই তখন সরকার সমর্থক- মর্নিং নিউজ, সংবাদ, আজাদ ইত্যাদি। ঢাকায় তখন হাতে গোনা কয়েকটি দৈনিক। এদের মধ্যে ইংরেজি দৈনিক ‘পাকিস্তান অবজার্ভার’ আন্তর্দলীয় কোন্দলের কারণে সরকার-বিরোধী ভূমিকায়—সেই হিসাবে ভাষা আন্দোলনের খবর ছাপা বা সম্পাদকীয় নিবন্ধে বাংলার পক্ষে, প্রতিবাদী ছাত্রদের পক্ষে।
১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এ কাজটি অবজার্ভার ভালোভাবেই করে আসছিল। কিন্তু সামান্য সতর্কতার অভাবে একটি অবাঞ্ছিত সম্পাদকীয় লেখার অভিযোগে নুরুল আমিন প্রশাসন তাদের মাথায় পেরেক ঠুকে দেয়। এক ঝাঁকের পাখি হওয়া সত্ত্বেও অবজার্ভার পত্রিকার মালিক হামিদুল হক চৌধুরীর বিরুদ্ধে একহাত নেবার সুযোগ ছাড়বেন কেন মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিন? ওই তারিখের কাগজে ‘ক্রিপটো ফ্যাসিজম’ শিরোনামের সম্পাদকীয়তে প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনের স্বজনপ্রীতির (যা দুর্নীতিরই নামান্তর) বিরুদ্ধে সমালোচনামূলক মন্তব্য তুলে ধরা হয় এবং সে সূত্রে হজরত ওসমানের স্বজনপ্রীতির উল্লেখ মওলানাদের ক্ষেপিয়ে তোলে। তাছাড়া ‘ফ্যাসিজিম’ শব্দটিও দুঃশাসনের প্রতীক। রচনাটি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক অঙ্গনে যতটা তার চেয়ে অনেক বেশি উগ্র প্রতিক্রিয়া প্রকাশ পায় রক্ষণশীল মওলানা-রাজনীতিকদের উত্তেজিত বক্তব্যে ও তত্পরতায়। এদের মধ্যে প্রধান ব্যক্তি মওলানা আকরম খাঁ, মওলানা রাসিব আহসান, মাওলানা দীন মুহম্মদ প্রমুখ। তারা বিবৃতি দিয়েই ক্ষান্ত থাকেন; পল্টন ময়দানে জনসভা আহ্বানেরও সিদ্ধান্ত নেন। উদ্দেশ্য রাজনৈতিক অঙ্গন দূষিত করা, উত্তেজিত করা যা একুশের প্রস্তুতি ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে বাধ্য। এমনকি খাঁ সাহেব এমন হুমকিও দেন যে, সরকার এ ব্যাপারে ব্যবস্থা না নিলে দেশের মুসলমান সমাজই এ বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেবে। স্বভাবতই সরকার পরদিনই জন নিরাপত্তা আইনে ‘পাকিস্তান অবজার্ভার’ পত্রিকার প্রকাশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। পত্রিকার স্বত্বাধিকারী হামিদুল হক চৌধুরী ও সম্পাদক আবদুস সালামকে গ্রেফতার করা হয়। যদিও পরে তাদের জামিনে মুক্তি দেয়া হয়। বন্ধ করে দেয়া হয় তাদের ছাপাখানা। অবজার্ভার গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে এতটা কড়াকড়ির পেছনে আজাদের ইংরেজি দৈনিক ‘মর্নিং নিউজ’-র হাত ছিল বলে সে সময়ে অনেকের ধারণা—প্রতিযোগী বলে কথা।
সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে অবজার্ভারের বিরুদ্ধে সেসব অভিযোগ আনা হয় তাতে রাষ্ট্র বিরোধিতা, সরকার বিরোধিতা, অন্তর্ঘাতমূলক কার্যকলাপ ইত্যাদি বিষয়ই প্রাধান্য পায় যা ছিল নিছক বানোয়াট। অন্যদিকে সরকারের এই অগণতান্ত্রিক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে ছাত্র-যুব সমাজ সঙ্গত কারণে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। যুবলীগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসমাজ, সাপ্তাহিক ইত্তেফাক ও নওবেলাল অবজার্ভারের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে নিন্দাজ্ঞাপক প্রস্তাব গ্রহণ করে। পূর্বপাকিস্তান যুবলীগ সরকার সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা জানায়। তাদের মতে দেশের গণ আন্দোলন বিশেষ করে ভাষা আন্দোলনকে দুর্বল করার উদ্দেশ্যে এই পদক্ষেপ দেয়া হয়েছে। এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগঠিত করার আহবান জানায় যুবলীগ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত ছাত্রসভায় সরকারের স্বৈরাচারী পদক্ষেপের নিন্দা জানিয়ে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবার আহবান জানানো হয়। তাদের মতে, ভাষা আন্দোলনের কর্মসূচি ব্যাহত করার উদ্দেশ্যেই আন্দোলনের সমর্থক একমাত্র পত্রিকাটি বন্ধ করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ বিষয়ে প্রতিবাদ জানাতে মেডিক্যাল হোস্টেল কমনরুমেও ছোট একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। দাবি জানানো হয়, অবজার্ভারের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে। সংবাদপত্রের মধ্যে ‘মর্নিং নিউজ’ সরকারি সিদ্ধান্তের পক্ষে সমর্থন জানিয়ে সরকারের প্রতি অভিনন্দন জ্ঞাপন করে। তাদের অভিযোগ, এ ধরনের জনগণের ধর্মীয় চেতনার প্রতি আঘাত ছাড়া অন্য কিছু নয় যা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সাপ্তাহিক ‘নওবেলাল’ অবশ্য একাধিক যুক্তি টেনে এবং জনগণের বরাত দিয়ে অবজার্ভারের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আহবান জানায়। শুধু অবজার্ভারের ওপর নিষেধাজ্ঞা বলে কথা নয়, এ সময় ফেব্রুয়ারির প্রতিটি দিন নানাভাবে হয়ে ওঠে একুশের কর্মসূচি সফল করে তোলার জন্য পরিপূরক দিন। একুশে ফেব্রুয়ারি যত এগিয়ে আসছে ছাত্রাবাসে ততই উত্তাপ বাড়ছে একটু একটু করে। সেই সঙ্গে তত্পরতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। [লেখক:ভাষাসংগ্রামী ও প্রাবন্ধিক]