গাছ আমাদের সন্তান

রিঙ্কার মাথায় নাকি একটা ভাবনা-ঘর আছে। সে কথা ওর মা’র। সারা দিন-রাত্তির কোন কিছু নিয়ে ভাবতে ভালো লাগে রিঙ্কার। রিঙ্কার বাবা নেই। মামাদের আশ্রয়ে সুখে-দুঃখে দিন কাটে। সেই শৈশব থেকেই ভাবনার পোকা রিঙ্কাকে কুট-কুট করে কামড়ায়। এখন সে অষ্টম শ্রেণিতে উঠেছে। ভাবনাগুলো ডালপালা মেলে সারাক্ষণই ওকে জড়িয়ে রাখে। স্কুলের পথে গাছ-পালা, পুকুর, লতা-পাতা কত কি দেখে রিঙ্কা। আকাশ তো ওকে হাতছানি দিয়ে সবসময় ডাকে। মা’র কাছে ওর হাজারো প্রশ্ন। মা’র কি সব প্রশ্নের জবাব জানা আছে? নাকি সবসময় এত প্রশ্নের উত্তর দিতে ভালো লাগে। মা মাঝে-মাঝে বিরক্ত হয়ে বলেন, একটু চুপ করবি? ওর অধ্যাপক মামা বলেন, আপু বাচ্চাদের চুপ করিয়ে দিতে নেই। ওদের আশা ভঙ্গ হয়। মনটা কুঁকড়ে যায়। তুমি সে সব প্রশ্নের জবাব জান না তা জমিয়ে রাখবে। আমি বলে দেব। মা বলেন, তোমার যেন কত জানা আছে ওর প্রশ্নের উত্তর? বলো তো, পেঁপে, ডালিম, আনারস, আম, কাঁঠাল, জাম, লিচু একই মাটিতে জন্মায়। তা ওদের রঙ ও স্বাদ আলাদা কেন? মাটির রঙ তো কালো কালো ছাই ছাই, তা কি করে তরমুজের রঙ অত মনকাড়া হয়? আর ফুট বা বাঙ্গিই বা আলাদা হয় কেন? রিঙ্কার মামাও ভাবনায় পড়েন। এসব কঠিন কঠিন প্রশ্ন কেন রিঙ্কার মাথায় আসে? ভিন্ন ভিন্ন চারা বীজ থেকে ভিন্ন ভিন্ন গাছ আর ফল হয়। এ তো সহজ সমাধান। রিঙ্কাকে কি এই সহজ সমাধান দিয়ে খুশি করা যাবে? ওর মা বলেন, ওদের স্কুলে এক টিচার আছেন, তিনি সব উদ্ভট উদ্ভট কথা বলেন। উনিই তো ছাত্রীদের মাথায় ঢুকিয়েছেন, গাছের পাতা বিষ শুষে নেয়। কার্বন-ডাই-অক্সাইড হল বিষ। কাজেই মনের বিষও গাছ শুষে নিতে পারে। আর মনে বিষ জমে দুঃখ পেলে, কষ্ট পেলে, মনে মেঘ জমলে গাছের কাছে গিয়ে দাঁড়ালে নাকি মনের দুঃখ-কষ্ট দূর হয়ে যায়। মনের মেঘ কেটে যায়। মামা বলেন, অদ্ভুত কথা তো? তা এর মধ্যে যে সত্য নেই তাতো অস্বীকার করতে পারি না? রিঙ্কা অনেক বই পড়ে। মামা কলেজ লাইব্রেরী থেকে বই নিয়ে আসেন। এখানে শহীদ স্মৃতি পাঠাগার নামে একটা সমৃদ্ধ পাঠাগার আছে। রিঙ্কা ঐ পাঠাগারের সদস্য। রিঙ্কা বাইরের বই যেমন পড়ে তেমনি পড়ার পাঠ্যবইও মন দিয়ে পড়ে। ক্লাসে ওর প্রথম স্থানটি আজ পর্যন্ত কেউ কেড়ে নিতে পারেনি। একদিন রিঙ্কা স্কুল থেকে ফিরে মাকে জড়িয়ে ধরে বলে, আজ বিপ্লব স্যার একটা মজার গল্প বলেছেন। মজার যেমন, অদ্ভূতও তেমন। মা বলেন, এখন গল্প শোনার সময় নেই। তোমার মামা এলে তাকে বলো। রিঙ্কা মামার অপেক্ষায় থাকে। মামা আসেন বেলা আড়াইটায়। রিঙ্কা ওর গল্পটি বলার ঘোষণা দেয়। সবশেষে খাওয়া-দাওয়ার পর রিঙ্কা গল্পের আসরের মধ্যমণি হয়ে বসে। নিঃসন্তান মামা-মামীর চোখের মণি রিঙ্কা। আর রিঙ্কা তো এক দুঃখী মেয়ে। দুঃখী নয়ত কি? জন্মের আগেই রিঙ্কা বাবাকে হারিয়েছে। মামা-মামীর আদরে-স্নেহে রিঙ্কা বাবার অভাব তেমন অনুভব করে না। তবু বাবা বলে কথা। মামার প্রশ্রয়ে রিঙ্কার ভাবনার জগত্টা বেড়েই চলে। রিঙ্কা মা আর মামীকেও ওর গল্পের আসরে বসায়। তোমরাও শোন— একটা অদ্ভূত গল্প। আসলে এটা গল্প নয়। সত্যি ঘটনা, ঘটনাটা গল্পের মতই। রিঙ্কা চোখে আলো ফুটিয়ে বলে, জানো মামা আজ ক্লাসে বিপ্লব স্যার আমাদের পরিবেশের উপর পাঠ দিচ্ছিলেন। এখন তো পরিবেশ রক্ষার জন্য কত না আয়োজন চলছে। নাকি পরিবেশ রক্ষা করো। পরিবেশ সুন্দর রাখো। আর এজন্য প্রথমে সকলে যে কথাটা বলেন, তাহলো, গাছ বাঁচাও। গাছ লাগাও। ঢাকায় তো গাছ বাঁচাবার জন্য বেশ একটা আন্দোলন চলছে। নো বৃক্ষ নিধন, নো বৃক্ষ কর্তন। বরং এর পাশাপাশি গাছ লাগাও। বিপ্লব স্যার এই বৃক্ষ আন্দোলনের উপর এক অদ্ভূত গল্প শোনালেন। স্যার বললেন, গাছ সংরক্ষণের আন্দোলন হাল-আমলের নয়। অনেক অনেক বছর আগে বৃক্ষ বাঁচাও আন্দোলন শুরু হয়েছিল। মামা, তুমি কি “চিপকো আন্দোলনের” কথা শুনেছ কখনো? মামা নিজের অজ্ঞতা প্রকাশ করে ভাগ্নীকে উস্কে দিলেন। — তাহলেই বোঝো, পৃথিবীতে কত কি জানার আছে। কত কিছু যে আমাদের অজানা রয়েছে। বিপ্লব স্যার বললেন- ‘চিপকো’ শব্দটির অর্থ হল জড়িয়ে ধরা। অনেক অনেক আগে, তা ধরো শতবর্ষ আগে উত্তর ভারতের এক সমৃদ্ধশালী গ্রামে ছিল অনেক বড় বড় গাছের বাগান। এই গাছগুলোই গ্রামের পরিবেশটাকে সুন্দর করে রেখেছিল। গ্রামের মানুষ গাছের স্নিগ্ধ ছায়ায় বসে গা জুড়াতো। গৃহবধূরা গাছের ডালপালা, পাতা দিয়ে রান্না-বান্না করত। আর কত পাখ-পাখালির বাসাই না ছিল ঐ গাছের ডালে ডালে। তবে গাছগুলো ছিল যেমন লোভনীয়, তেমনি মূল্যবানও। ঐ গাছগুলোর দিকে লোভের দৃষ্টি আটকে গেল রাজার। রাজা বললেন, ঐ গাছ আমার চাই। সরকারি কর্মকর্তাদের হুকুম দিলেন, অনেক কাঠুরে নিয়ে ঐ গাছগুলো কেটে নিয়ে এসো। রাজার হুকুম গ্রামে বাতাসের আগে ছুটে যায়, গ্রামের মানুষ মাথায় হাত দিয়ে বসে। রাজার হুকুম তো অমান্য করা যাবে না! গাছগুলো ধ্বংস হলে গ্রামটা যে একেবারে বিরান হয়ে যাবে। গাছগুলো যে ওদের সন্তানের মত। পুরুষরা যখন আশা ছেড়ে হতোদ্যম হয়ে বসে আছে তখন মহিলারা একে একে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। নিজেদের মধ্যে ওরা অনেক শলা-পরামর্শ করলো। পুরুষরা যেখানে উপায় খুঁজে পাচ্ছে না গাছগুলোকে বাঁচাবার তখন মহিলারা গাছ বাঁচাবার এক নতুন উপায় বের করলো। শত শত মহিলা কাঠুরেরা গ্রামের পথে পা রাখার আগেই এক একটা গাছের কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। তারপর মা যেমন সন্তানকে রক্ষা করার জন্য বুকে আগলে রাখে তেমনি মহিলারা প্রত্যেকে এক একটি গাছ জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে রইলো। কাঠুরেরা গাছে কুড়ালের কোপ বসাবার আগে কোপ বসাবে মহিলাদের গায়ে। তখন রাজাকে মানুষ হত্যার দায় বইতে হবে। কাঠুরেরা গ্রামে ঢুকে এই অদ্ভূত কাণ্ড দেখে একেবারে হতবাক। তারা মহিলাদের গাছ ছেড়ে দেবার জন্য প্রথমে অনুরোধ করলো। তারপর রাজার হুকুম জানিয়ে হুমকি-ধামকি দিতে শুরু করলো। মহিলারা তো ভয়-ভীতিতে এতটুকু টলে না। সময় বয়ে চলে। গরমে ঘামে মহিলারা শ্রান্ত ক্লান্ত, তখন গাছেরও তো প্রাণ আছে? অনুভূতি আছে? তবে ভাব প্রকাশের জন্য আমাদের মতো ভাষা নেই। কিন্তু নিজেদের মধ্যে ওরা আলাপন করতে পারে। সেই আলাপচারিতার মোদ্দাকথা হল, দেখ এই মায়ের জাত আমাদের রক্ষার জন্য কেমন বুকে জড়িয়ে রেখেছে আমাদের। এসো আমরা বাতাস বইয়ে ওদের শরীর শীতল করে দিই। ওদের শ্রান্তি-ক্লান্তি দূর করে দিই। অবশেষে ঠান্ডা বাতাসে মহিলারা যেন নব জীবন ফিরে পেল। এখন ওরা আরও উত্সাহের সাথে ভালবাসা আর আদর দিয়ে গাছগুলোকে পরম মমতায় জড়িয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। তখন সন্ধ্যা নেমেছে। অন্ধকারে ছেয়ে যাবে চারদিক। কাঠুরে এবং সরকারি কর্মকর্তারা মনঃক্ষুণ্ন হয়ে ফিরে গেল। রাজার আদেশ পালন না করতে পেরে ওরা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছিল ঠিকই কিন্তু গ্রামের এই মহিলাদের বৃক্ষ-প্রীতি আর বৃক্ষ রক্ষার অভিনব কৌশল দেখে মনে মনে খুশিও হয়েছিল। বিপ্লব স্যার বললেন, এ হলো গাছকে বাঁচাবার জন্য এক অভিনব আন্দোলন। এটাকে ইতিহাসেও কিন্তু আন্দোলন নামে অভিহিত করা হয়েছে। এটাই হল “চিপকো আন্দোলন”। রিঙ্কার গল্প বলা শেষ হলে ওর মামা মিটি-মিটি হেসে বললেন, রিঙ্কা ভবিষ্যতে একজন গাল্পিক হবে। মা বললেন, আরে সেজন্যই তো যত রাজ্যের ভাবনা এসে ওর মনের রাজ্যে সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকে। তা, মা রিঙ্কা, তুমি তোমার বিপ্লব স্যারকে আমাদের ধন্যবাদ জানিয়ে দিও—মামী হাসতে হাসতে বললেন।