আমার কথা

আমার বাবার খুব বই পড়ার ঝোঁক ছিলো। আমাদের কালের অনেক বাবার চাইতে একেবারেই পৃথক ছিলেন তিনি। আমি যখন তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্র, তখনই তিনি আমার হাতে তুলে দিয়েছিলেন হ্যারিয়েট বিচার স্টোর লেখা বিশ্ববিখ্যাত ‘আঙ্কেল টমস কেবিক’-এর সরল বাংলা অনুবাদের একটা বই। ভীষণ ভালো লেগেছিলো। তারপর থেকে এটা-সেটা লিখতে শুরু করি। আমার সেসব এলোমেলো গদ্য রচনা পরে অবশ্য ছিঁড়ে ফেলেছিলাম। ছড়া লিখতে শুরু করি খেয়ালের বশে। রেল গাড়ির চলার যে ছন্দ, সেই ছন্দের অনুকরণে জীবনের প্রথম ছড়া লিখি। ১৯৬৪ সালে তখনকার ‘সোনার বাংলা’ পত্রিকার ছোটদের পাতায় প্রকাশিত ছড়া দিয়েই আমার সাহিত্য-জীবনের শুরু। জীবনের প্রথম লেখা প্রকাশ করেছিলেন রফিকুল হক দাদুভাই। তাঁর কাছে কৃতজ্ঞতার অন্ত নেই। তার আগে দুটো ছোটগল্প ছাপা হয়েছিল। ইত্তেফাকের মহিলা বিভাগে। ছাপা হয়েছিল আমার মা আর আমার নাম মিলিয়ে তৈরি করা আয়শা আখতার খাতুনের নামে। আমার প্রস্তুতি ছিল কথাসাহিত্যিকের। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হয়ে গেলাম শিশুসাহিত্যিক। ‘সোনার বাংলা’য় আমার ছড়া যেদিন প্রকাশিত হয়, সেদিনকার অনুভূতি সহজে প্রকাশ করার নয়। সেদিন একাই চারটি পত্রিকা কিনেছিলাম। বন্ধুদের চা-বিস্কুট খাইয়েছিলাম। তারপর থেকে ছড়া লেখা যেন নেশার ব্যাপার হয়ে দাঁড়ালো। ছোটবেলায় আমার অনেক কিছুর শখ ছিলো। অনেক কিছু হবো বলেও স্বপ্ন দেখতাম। হতে চেয়েছিলাম ভালো ছবি আঁকিয়ে। গেলো সেই শখ। হতে চেয়েছিলাম ভালো ক্রিকেটার, ফুটবলার, ব্যাডমিন্টন খেলোয়াড়, গেলো সেই ইচ্ছে। এমনকি হাতে ন্যাড়া বেঁধে গায়ক হওয়ার তালিম নিতে শুরু করেছিলাম ওস্তাদ ইয়াসিন খায়ের কাছে। কিন্তু মাসকয়েক তা-না-না করার পর কেটে গিয়েছিলো সেই শখও। শেষ যখন কলেজে ভর্তি হলাম, ভয়ানকভাবে ইচ্ছে করতো অধ্যাপক হওয়ার, শিক্ষক হওয়ার। কিন্তু আশা আমার ভয়ানকভাবে উবে গিয়েছিলো। ১৯৬৫ সালের রেল ধর্মঘটে আব্বার জেলে যাওয়া এবং জেল থেকে বেরোবার পর তাঁর পাক্কা পাঁচ বছর চাকরি না থাকার ঘটনা আমাকে আর শিক্ষার জীবনের এগোতে দেয়নি। জীবন-সংগ্রাম সব কেড়ে নিয়েছে। আমার প্রিয় লেখা কোনটিকে ছেড়ে কোনটির কথা বলি। আমার বেশকিছু ছড়া আছে, যেগুলো আমার খুবই প্রিয়। বেশকিছু কিশোর কবিতাও আমার খুব প্রিয়। তবে এসবের মধ্যে সবচেয়ে প্রিয় লেখা আমার ‘ওগো ও বটের বুড়ো’ শিরোনামের কিশোর কবিতাটি। স্মরণীয় স্মৃতি জার্মানির হোটেলে ডিস মাজতে গিয়ে যখন ভয়ানক সংকোচে পড়ে গিয়েছিলাম। ব্যাপারটা দেখে আমার যে জার্মান সহকর্মী ছিল সে বলেছিল, ‘আখতার, তুমি জার্মানিতে এসেছো। তুমি দেশে কি করতে ভুলে যাও। তুমি জানো আমি ডক্টরেট করছি বিশ্ববিদ্যালয়ে। সামারে আমি তোমার মতোই একই কাজ করছি। কই, আমার তো লজ্জা বা সংকোচের বালাই নেই। অনেক স্মরণীয় স্মৃতির মধ্যে আমার এই স্মৃতিটাও আমি ভুলে যাইনি। জন্ম আমার আব্বার রেলের কর্মস্থল আমনুরায় ১৯৪৫ সালের ১ নভেম্বর। পড়াশোনা সেন্ট জোসেফ স্কুল খুলনা, আমনুরা, পাকশী, গফরগাঁও প্রাইমারী ও হাইস্কুলে। অসমাপ্ত কলেজ জীবন ময়মনসিংহের আনন্দমোহনে। দেশের নেতৃস্থানীয় পত্রপত্রিকায় কাজ করেছি সম্পাদনা সহকারী, সাব-এডিটর, সাহিত্য ও ফিচার সম্পাদক হিসেবে। বর্তমানে কর্মরত প্রথম আলো গ্রুপের প্রথমা প্রকাশনে পান্ডুলিপি সম্পাদক হিসেবে। উল্লেখযোগ্য বই: ‘সমুদ্র অনেক বড়’, ‘হৈ হৈ রৈ রৈ’, ‘উল্টোপাল্টা’, হালচাল, ‘রামধনুকের সাঁকো’, দি টাইগার ও অন্যান্য গল্প’, ফ্রিডম ফাইটার’, ‘আমার দুটো ডানা’ এবং ‘ছোটদের চারণ কবি মুকুন্দ দাস’ ইত্যাদি। বেশকিছু সম্পাদিত গ্রন্থও রয়েছে। পেয়েছি আলাওল সাহিত্য পুরস্কার (১৯৭৯), বাংলাদেশ শিশু একাডেমী পুরস্কার (২০০৭), বাংলা একাডেমী পুরস্কার (২০১১)সহ বেশকিছু সম্মাননা ও সংবর্ধনা।