তারুণ্যের জয় হবেই
প্রকাশ : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২১:১৯
এই যে ছেলেমেয়েগুলো দিনরাত জেগে, রাতে বাসায় না ফিরে, খোলা আকাশের নিচে খাওয়া-দাওয়া, ঘুম হারাম করে স্বাভাবিক জীবন যাপনের শৃঙ্খল ভেঙে শাহবাগের মোড়ে গোঁয়ারের মতো বসে রয়েছে, কী লাভ ওদের? রায় দিয়েছেন কোর্ট, রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবীরা আপিল করবেন উচ্চতর আদালতে; এ ছেলেমেয়েগুলোর গলা ফাটিয়ে নাওয়া-খাওয়া-ঘুম হারাম করে এই একরোখা গোঁয়ার্তুমির মানে কী? প্রশ্ন তোলেন সংশয়বাদীরা।
বাংলার সব ছেলেমেয়ে হয়তো এ গণজাগরণে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করছে না। কিন্তু এ ছেলেমেয়েগুলো সমস্ত তরুণ সমাজের প্রতিনিধি। যে তারুণ্যের কোলাহল কোনো বাধা মানে না, বারণ মানে না, বিধি-নিষেধ মানে না, কোনো সীমারেখায় তাদের আটকে রাখা যায় না। এই তারুণ্যের চোখে-মুখে ভাসে নজরুল-সুকান্তের মুখচ্ছবি। যাদের আইনের বিধি-নিষেধ দিয়ে কখনোই দাবিয়ে রাখা যায়নি। সেই তরুণ নিজের মধ্যে ধারণ করে সালাম, রফিক, বরকত, জব্বার, নূর হোসেনের মতো শহীদদের। যাদের ১৪৪ ধারা দিয়ে বেঁধে রাখা যায়নি। যারা জীবনকে ঠুনকো জ্ঞান করে বন্দুকের নলের মুখে দাঁড়িয়ে বুকে ‘স্বৈরাচারী নিপাত যাক’ লিখে গণতন্ত্র মুক্তির ডাক দেয়। মৃত্যু হবে জেনেও বুকের তাজা রক্ত ঢেলে ন্যায্য দাবি-দাওয়াগুলো আদায় করে নেয়। হয়তো এটা বাঙালি তরুণের তারুণ্যের ধর্ম।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, এই তরুণেরা আন্দোলনের জন্য রাস্তায় নেমে খালি হাতে কখনোই ফিরে আসেনি। আন্দোলনে নেমে দাবি আদায় না করে ফিরে আসাটা এই তরুণদের রক্তে নেই। অধিকার ও দাবি আদায়ের সংগ্রামে শাহবাগ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং এর আশেপাশের এলাকা ইতিহাসের সাক্ষী। এই এলাকা নিজেই কালের সাক্ষী হয়েছে বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের সকল আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে। কালের সাক্ষী হয়ে রয়েছে ৫২-র ভাষা আন্দোলন, ৬৬-র ৬ দফা, ৭ই মার্চের ভাষণ, মুক্তিযুদ্ধের গৌরবগাঁথা— এই তরুণ প্রজন্ম হয়তোবা আন্দোলনগুলোতে শরিক হতে পারেনি। কিন্তু নিজের মধ্যে ধারণ করে পূর্ব-পুরুষদের সংগ্রামী ঐতিহ্যকে। যুগে যুগে এদেশ পেয়েছে সেই সাহসী প্রজন্মকে যারা পরিবর্তন এনেছে ভাষাতে, সংস্কৃতিতে, রাজনীতিতে। আইনের ঠুনকো বিধি-নিষেধ কখনোই বাধার দেয়াল হয়ে দাঁড়াতে পারেনি।
আজ এ তরুণ প্রজন্ম শাহবাগে হাজির হয়েছে ইতিহাসের অংশ হতে যা তাদের ঐতিহ্যগতভাবেই হাতছানি দিয়ে ডাকছে, যে ইতিহাস হবে নিজেদের কলঙ্ক মোচনের ইতিহাস, ভাই হত্যা, পিতৃহত্যার প্রতিশোধ, মা-বোনের ইজ্জতের মর্যাদা রক্ষার ইতিহাস। আমরা হয়তো ফিরে পাবো না আমাদের ভাইকে, বাবাকে, সেই সকল বুদ্ধিজীবী-শিক্ষক-গবেষকদের যাঁরা আমাদের নিয়ে যেতে পারতেন বিশ্ব সিংহাসনে, হয়তো ফিরে পাবো না সেই মা-বোনদের, যাঁদের হারিয়েছি ঐ সকল রাজাকার-আলবদর-আলশামসদের হাতে। এক কাদের মোল্লা, বাচ্চু রাজাকার, মুজাহিদ, নিজামী, গোলাম আযমের ফাঁসিতে হয়তো ৩০ লাখ শহীদ ও ২ লাখ মা-বোনের ইজ্জতের শাপমোচন হবে না, তবু এটুকু সান্ত্বনা হয়তো পাবো— যাঁরা আমাদের মুখের ভাষা দিয়ে গেছেন, আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশ উপহার দিয়ে গেছেন নিজেদের রক্তের বিনিময়ে, আজ ৪১ বছর পর হলেও তাঁদের বিদেহী আত্মা হয়তো একটু হলেও শান্তিতে ঘুমাতে পারবে।
অনেক দেরিতে হলেও এই তরুণ প্রজন্ম কলঙ্কমোচনের এই ইতিহাসের সাক্ষী হওয়া থেকে নিজেদের বঞ্চিত করবে না। কোনো ছাড় বা আপস চলে না এই যৌক্তিক আন্দোলনের সঙ্গে। আইনের জন্য মানুষ নয়, মানুষের জন্য আইন। আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়াটা যেমন জনগণের কর্তব্য তেমনি জনগণের ন্যায্য দাবিগুলোর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়াটাও আইনের কর্তব্যের বাইরে নয়। আইন যদি সকলের জন্য সমান হয় তবে একজন বিবাদীর যেমন সুযোগ আছে মৃত্যুদণ্ড থেকে খালাস হয়ে ন্যায়বিচার পাওয়ার, তেমনি বাদী পক্ষেরও সুযোগ থাকা উচিত প্রকৃত অপরাধীকে খালাস থেকে মৃত্যুদণ্ডের মাধ্যমে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দাবি তোলার। এটাই হওয়া উচিত আইনের সমতাবিধান। ইতিহাসের কলঙ্কমোচনের এই কালে আইনের দোহাই কোনো অজুহাত হতে পারে না।
পরিশেষে সে সকল গোঁয়ার, একরোখা তরুণদের জানাই ইতিহাসের কারিগর হওয়ার আগাম শুভেচ্ছা। ইতিহাস একদিন আপনাদের স্মরণ করবে। আজ যেমন ইতিহাসের বীরদের আমরা স্মরণ করি, আপনাদের পরবর্তী প্রজন্মও একইভাবে গর্বের সঙ্গে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে আপনাদের। শাহবাগের এই স্ফুলিঙ্গ থেকেই আগুন জ্বলবে। তারুণ্যের জয় হবেই।
ঢাকা