গণপরিবহনে নৈরাজ্য : সিটিং চিটিং...

মোশারফ হোসেন (মামুন)

 

গণপরিবহন ব্যবস্থাপনায় নৈরাজ্য ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। রাজধানীতে সিটিং সার্ভিসের নামে চলছে রীতিমতো চিটিং। ঢাকাসহ সারা দেশে বেশিরভাগ বাসেই বিআরটিএ নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, যাত্রীদের সঙ্গে খারাপ আচরণ, ধাক্কা দিয়ে গাড়ি থেকে ফেলে দেওয়ার ঘটনা ঘটছে প্রায়ই।  প্রায় ৯৪ শতাংশ সিএনজি চালিত অটোরিকশা চলছে মিটারের বদলে। বিআরটিএ অনুমোদিত যে সিট রাখার কথা বলা হয়েছে তার বেশি সংখ্যক রাখার ফলে সাধারণ যাত্রীদের নানা রকম অসুবিধা হয় এবং জড়োসরো হয়ে বসতে হয়। গাড়ির ভাঙা জানালা, ভাঙা সিটের কারণে অনেক সময়ে কাপড়-চোপড় ছিঁড়ে গিয়ে রক্তাক্ত হওয়ার ঘটনাও ঘটে থাকে। গাড়িতে ধরার মতো কোনো হাতল না থাকায় দাঁড়ানো যাত্রীদের হঠাত্ ব্রেক কষলে অন্যের গায়ে পড়ার মতো বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়।

বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালানো, ফিটনেস বিহীন গাড়ি, লাইসেন্স বিহীন ড্রাইভার, ওভারটেকিং, ওভারলোডিং, রাস্তার মাঝখানে গাড়ি থামিয়ে যাত্রী ওঠানো-নামানো, মহাসড়কে রাস্তার মোড়ে পুলিশ স্থানীয় নেতা প্রভাবশালী লোকজনের ছত্রছায়ায় প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি, অপরিকল্পিতভাবে সড়ক সংস্কার, টোল আদায়, বিচারহীনতার সংস্কৃতি, প্রশিক্ষণহীন ড্রাইভার, অকেজো সিগন্যাল বাতি, অতিরিক্ত গতি, ড্রাইভারদের মাদক সেবন ইত্যাদি সড়ক দুর্ঘটনার জন্য দায়ী—এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অনেক ক্ষেত্রে উদাসীন। সড়ক দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণ করে বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউট বলছে, ৫৩ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটে অতিরিক্ত গতিতে চালানোর কারণে। বেপরোয়া মনোভাবের কারণে দুর্ঘটনা ঘটে ৩৭ শতাংশ। ২০১৬ সালের মার্চ থেকে ২০১৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সংঘটিত দুর্ঘটনার তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে প্রতিষ্ঠানটি।

বাংলাদেশে পরিবহন চালক ও পরিবহন শ্রমিকদের আর্থ-সামাজিক অবস্থা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তাদের বেশিরভাগই সমাজের নিম্ন, নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসা। এদের মধ্যে অনেকেই নিজ পরিবার থেকে বঞ্চিত লেখাপড়া, সুযোগ-সুবিধা, সুন্দর পরিবেশ থেকে—মৌল মানবিক চাহিদা পূরণ না হওয়া, অনিচ্ছা সত্ত্বেও পরিবারের চাপে পড়ে আসে এই পেশায়। আর্থিক-মানসিক-শারিরিক নিপীড়ন, নির্যাতন-অবহেলা-তাচ্ছিল্যের মধ্য দিয়ে জীবন পার করে থাকে। এসব সুবিধা বঞ্চিত ড্রাইভার দ্বারা কর্তব্য অবহেলা, জীবনবোধের উন্নত চিন্তা না থাকায় তাদের দ্বারা সংঘটিত হয় মৃত্যুর মিছিল। পরিবহন চালক বা শ্রমিকদের বেতন-মজুরি, শ্রম ঘণ্টার বিষয়টির সঙ্গে দুর্ঘটনা ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।

গণপরিবহনের নৈরাজ্য-অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা নিরসনে যেসব বিষয়ে নজর দেওয়া অতীব জরুরি—  

চালক যাত্রীদের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধিতে ক্যাম্পেইন কর্মসূচি, আশপাশের জেলার সঙ্গে রেলপথ সংযোগ, ঢাকার আশপাশে নদীগুলোতে ওয়াটার বাস চালু করা, নদীর পাড়ে অবৈধ স্থাপনা দখল উচ্ছেদ করে নৌপথকে সহজ করা। মালিক-শ্রমিক-পুলিশ সবাইকে জবাবদিহিতায় আনা, উড়াল সেতু নির্মাণ, মেট্রোরেল চালু করা, ফিটনেস বিহীন গাড়ির পরিবর্তে উন্নত প্রযুক্তির যানবাহন আমদানি, ফুটওভারব্রিজগুলো ব্যবহার উপযোগী করা, অটোমেটিক আধুনিক সিগনাল বাতি, ট্রাফিক আইনের সংস্কার, রাস্তা মেরামত-নকশা প্রণয়ন,  টোল বাণিজ্য বন্ধ, লাইসেন্স প্রদানে কড়াকড়ি, পুলিশ এবং প্রভাবশালীদের চাঁদাবাজি বন্ধকরণ, পথচারীদের রাস্তা পারাপারের জন্য জেব্রাক্রসিং, ডবল ডেকার বাস প্রদান, প্রতিটি জেলায় ড্রাইভিং স্কুল গড়ে তোলা। মহাসড়কে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা বসানো। উন্নত দেশের মতো গাড়ির গতিসীমা ৫০ কিলোমিটারের মধ্যে রাখতে হবে। কারণ যত গতি তত ক্ষতি। পরিবহন মালিক-শ্রমিক নেতা, বিআরটিএ, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, সিটি করপোরেশন সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সুপারিশগুলোর যথাযথ বাস্তবায়ন জরুরি।

ঢাকা