‘আজি দখিন দুয়ার খোলা...’
প্রকাশ : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২২:৩৮
‘আজি দখিন দুয়ার খোলা/এসো হে এসো হে এসো হে আমার বসন্ত’-বাংলার কবি এভাবে বরণডালা সাজিয়েছেন বসন্তের আগমনের। এলো বসন্ত মাতাল হাওয়ায়, কুসুম বনের বুকের কাঁপনে, উতরোল মৌমাছিদের ডানায় ডানায়, নিরাভরণ গাছে গাছে নব কিশলয় জেগে উঠবার আভাসে, আর বনতলে কোকিলের কুহুতানে। আজ পয়লা ফাল্গুন। কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ভাষায় ‘ফুল ফুটুক আর নাই ফুটুক/আজ বসন্ত...। আজ হূদয়দল খোলার দিন। শীতের রিক্ততা মুছে দিয়ে প্রকৃতিজুড়ে আজ সাজসাজ রব। হিমেল পরশে বিবর্ণ প্রকৃতিতে জেগে উঠছে নবীন জীবনের ঢেউ। নীল আকাশে সোনাঝরা আলোকের মতই হূদয় আন্দোলিত। ‘আহা! কি আনন্দ আকাশে বাতাসে..। আহা আজি এ বসন্তে/কত ফুল ফোটে কত বাঁশি বাজে/কত পাখি গায়.. । কুঁড়িদের ওষ্ঠপুটে লুটছে হাসি, ফুটছে গালে টোল’..। অশোকে-অশ্বত্থে-শিরীষে-শালে-পিয়ালে হাওয়ার নাচন, আলোর কাঁপন যখন তখন, মাতামাতির দিন। ঋতুরাজ বসন্তের মাতাল হাওয়া মন উতল করে দেয়, কে জানে কিসের জন্য! এ ফাগুন সুখের মতো এক ব্যথা জাগিয়ে দেবে চিত্তে-‘এতটুকু ছোঁয়া লাগে, এতটুকু কথা শুনি/তাই দিয়ে মনে মনে রচি মম ফাল্গুনী..।’
সেই প্রাচীন ‘প্রাকৃত পৈঙ্গলে’র দিকে তাকালে দেখা যায় সেকালের কবিরাও বসন্তরানির করতলে প্রেমের অর্ঘ্য তুলে দিয়েছেন। ফাল্গুনে প্রেমিকার বিরহ বেদনার মর্মস্পর্শী চিত্রকল্প তখনও কবির কাব্যভাবনায় নানাভাবে মূর্ত হয়েছে । ভানুসিংহ ঠাকুরের উতলা চিত্তে ‘বসন্ত আওলরে! মধুকর গুনগুন,/অমুয়া মঞ্জুরী কানন ছাওলরে।/মরমে বহই বসন্ত সমীরণ, মরমে ফুটই ফুল/মরমকুঞ্জ’পর বোলই কুহুকুহু অহরহ কোকিলকুল..।’ ‘এমনি দিনে প্রিয়তম যদি ঘরে ফিরে না আসে, তাহলে কি ভাবব ভালোবাসার দেবতা নেই, না বসন্ত নেই! এখানে ভালোবাসার দেবতাই বসন্ত।’ হাজার বছরের বাঙালি জীবনে এই ভালোবাসার দেবতা ও বসন্তের প্রভাব অনিবার্য, অলঙ্ঘনীয়।
সাগর, নদী, ভূ-ভাগ গ্রীষ্মের তাপ বাষ্প নিঃশ্বাস ফেলার আগে ফাল্গুনে পায় শেষ পরিতৃপ্তি। নৈসর্গিক প্রকৃতি বর্ণচ্ছটায় বাঙ্ময় হয়ে ওঠে। কচি পাতায় আলোর নাচনের মতই বাঙালি তরুণ মনে লাগে দোলা। মন হয় উচাটন। বন-বনান্তে পারিজাতের রঙের উচ্ছ্বাস। ‘ফুলের বনে যার পাশে যাই তারেই লাগে ভালো..’ কবিগুরুর এই পুলকিত পংক্তিমালা বসন্তেই কি সকলের বেশি মনে পড়ে? বনে বনে রক্তরাঙা শিমুল-পলাশ, অশোক-কিংশুকে বিমোহিত জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায়, ‘এলো খুনমাখা তূণ নিয়ে/খুনেরা ফাগুন..।’ বসন্ত বাতাসে পুলকিত ভাটিবাংলার কণ্ঠ শাহ আবদুল করিমের বাউল-কণ্ঠ :‘বসন্ত বাতাসে..সই গো/বসন্ত বাতাসে/বন্ধুর বাড়ির ফুলের গন্ধ আমার বাড়ি আসে...।’
আমাদের ঋতুরাজ বসন্তের আবাহন আর পশ্চিমের ভ্যালেন্টাইন-ডে যেন এক বৃন্তের দুইটি কুসুম। এ যেন এক সুতোয় গাঁথা দুই সংস্কৃতির দ্যোতনা। মানুষের মতই এ সময় পাখিরাও প্রণয়ী খোঁজে। বাসা বাঁধে। রচনা করে নতুন পৃথিবী। আজ প্রহর গুনবে কেউ মিলন পিয়াসী হূদয় নিয়ে। ‘সে কি আমায় নেবে চিনে, এই নব ফাল্গুনের দিনে?’
বসন্ত মানেই যৌবনের গান। প্রাণের ভেতর যে প্রাণ আছে, জীবনের ভেতরে আরেক জীবন আছে, আত্মার গহীনে যে রূপ-অরূপের আকাঙ্ক্ষা আছে, জীবন ও প্রকৃতির সমান্তরালে তাকে অনুভব ও উত্সারণের নামই কি বসন্ত? মানুষের কথার ভেতরে কিছু কথা আছে, কথার অন্তরালে কিছু সূক্ষ্ম বার্তা আছে, প্রাত্যহিকের যাপিত গদ্যের ছায়ায় অদৃশ্য সুর ও গান আছে এবং সীমাবদ্ধ বাঁধনের তারে অসীমের তরঙ্গ স্পর্শ আছে। এই অদৃশ্য তরঙ্গের স্পন্দন, জীবনের দোলা, বাণী আর সুরের মূর্ছনায়-রূপে-রসে-মন-মননে ও প্রকৃতিতে জমে উঠে মায়ার খেলা- প্রাণের খেলা। যার হূদয় আছে সে টের পায় কেউ আসছে, কেউ জেগে উঠছে। কারো উন্মেষ হচ্ছে। কে সে? কার এই জাগরণ? সীমার ভেতরে অসীমের মূর্তিতে কার এই সম্ভোগ অভিসার? কার এই নীরব-গোপন আহবান? দেহে-মনে-পুলকে-শিহরণে-বোধে-মননে এই আহবানকে স্পর্শ করার যে ইচ্ছা-সময়; বাঙালি তারই তো নাম রেখেছে বসন্ত।
হালে শহরের যান্ত্রিকতার আবেগহীন সময়ে বসন্ত যেন কেবল বৃক্ষেরই, মানুষের আবেগে নাড়া দেয় কমই। তারপরও আজ বসন্তের পয়লা দিনে নানা আয়োজনে আলোড়িত হবে ঢাকা। এবারের বসন্ত দিন একাকার হয়ে গেছে তারুণ্যের উচ্ছ্বাসে। সারাদেশ এখন ভাসছে তারুণ্য জোয়ারে। তাই এবারের পয়লা ফাল্গুন বাংলায় আসছে নতুন বার্তা নিয়ে।