শিবিরের হামলা, ভাংচুর, গুলি

রাজধানীর কাওরান বাজার, পান্থপথ ও মতিঝিল এলাকায় গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে হঠাত্ রাস্তায় নেমে তাণ্ডব চালিয়েছে ছাত্রশিবির। এক থেকে দেড় ঘন্টা রাস্তায় অবস্থান করে নির্বিচারে গাড়ি ভাংচুর, ব্যাপক বোমাবাজি চালিয়ে পালিয়ে যায়। জবাবে পুলিশ টিয়ারসেল, রাবার বুলেট ও গুলি চালায়। পুলিশের বিরুদ্ধে গুলিও চালিয়েছে শিবির। শিবিরের হামলায় শতাধিক গাড়ি ভাংচুর হয়েছে। দুপক্ষের মধ্যে গোলাগুলিতে একজন পুলিশ কর্মকর্তাসহ অন্তত ১৫ জন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। কাওরান বাজার এলাকায় গাড়িতে করে যাওয়ার সময় গ্লাস ভেঙ্গে আহত হয়েছেন প্রথমআলোর সম্পাদক মতিউর রহমান। নয়াদিগন্ত অফিসের সামনে একটি মাইক্রোবাসে কে বা কারা আগুন ধরিয়ে দেয়। এতে অফিসের নিচের গোডাউনের অনেক কাগজ পুড়ে গেছে। এছাড়া বিকালে জুরাইনে নয়াদিগন্তের ছাপাখানায় কে বা কারা আগুন ধরিয়ে দেয়। আগুনে ছাপাখানায় রাখা ২০/২৫ রীম কাগজ পুড়ে যায়। পুলিশ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে হামলা ও ভাংচুরের ঘটনায় ৭৩ জামায়াত-শিবিরের নেতা-কর্মীকে গ্রেফতার করেছে। প্রসঙ্গত গতকাল ছিল জামায়াত-শিবিরের পূর্ব নির্ধারিত বিক্ষোভ কর্মসূচি। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গতকাল দুপুর দেড়টার দিকে কাওরান বাজার এলাকা থেকে শিবিরের শতাধিক নেতা-কর্মী একটি মিছিল বের করে। মিছিলটি ওয়াসা ভবনের পাশ দিয়ে বেরিয়ে ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটিয়ে গাড়ি ভাংচুর করতে করতে সোনারগাঁ মোড় হয়ে পান্থপথের দিকে যায়। কিছুক্ষণের মধ্যে আরো কিছু শিবির কর্মী তাদের সঙ্গে যোগ দিয়ে ভাংচুর শুরু করে। এ সময় পুলিশ রাবার বুলেট ছুঁড়লে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে থাকা সাভারের গার্মেন্টস কর্মী হাফিজা বেগম (২০) গুলিবিদ্ধ হন। এ সময় পুলিশ কবির (২৬) নামে এক শিবির কর্মীকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় গ্রেফতার করে। তাদের দু’জনকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিত্সা দেয়া হচ্ছে। এ সময় শিবিরও পাল্টা গুলি চালায়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, পুলিশের সঙ্গে শিবির কর্মীদের গোলাগুলির সময় প্রথমআলোর প্রকাশনা প্রথমা ভবনের সামনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের গাড়িতে ছিলেন প্রথমআলোর সম্পাদক মতিউর রহমান। এ সময় একটি গুলি তাদের গাড়ির কাঁচে লাগে। এতে মতিউর রহমান গুরুতর আহত হন। তবে গুলি না কাঁচের টুকরো লেগে তিনি আহত হয়েছেন তা নিশ্চিত করা যায়নি। ঘটনার পর থেকে মতিউর রহমান বন্ধু-স্বজন ও সাংবাদিকসহ কারোই ফোন ধরছেন না। ইত্তেফাকের পক্ষ থেকেও তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে পাওয়া যায়নি। তবে প্রথমআলোর বিশেষ প্রতিনিধি কামরুল হাসান দাবি করেন, মতিউর রহমান সুস্থ আছেন। তবে ঘটনা সম্পর্কে প্রথমআলোর সাংবাদিকরা জানিয়েছেন, শিবির কর্মীরা কাওরান বাজারে এলোপাতাড়ি ঢিল ছুঁড়লে একটি ঢিলে ঐ গাড়ির কাঁচ ভেঙ্গে যায়। এতে মতিউর রহমান গুরুতর আহত হন। পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার মঞ্জুরুল কবির ইত্তেফাককে বলেন, জামায়াত-শিবির কর্মীরা হঠাত্ ভিড়ের মধ্যে থেকে বেরিয়ে ভাংচুর ও বোমাবাজি শুরু করে। এ সময় তারা পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলিও চালায়। এতে পুলিশের তেজগাঁও জোনের সহকারী কমিশনার আবদুল জলিলসহ দুই কর্মকর্তা আহত হন। আত্মরক্ষার্থে পুলিশও টিয়ারসেল, রাবার বুলেট ও গুলি চালিয়েছে। কাওরান বাজার থেকে হামলা চালিয়ে শিবির কর্মীরা কয়েকটি গ্রুপে ভাগ হয়ে সার্ক ফোয়ারা মোড় দিয়ে পান্থপথের দিকে যেতে থাকে। এ সময় ৪টি মোটর সাইকেলে শিবির কর্মীরা এলাপাতাড়ি ককটেল নিক্ষেপ করতে থাকে। বসুন্ধরা শপিংমলের পূর্বগেট পর্যন্ত শিবির কর্মীরা অন্তত ৪০/৫০ ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটায়। পান্থপথ মোড়ের দিক থেকে শিবির কর্মীদের বাধা দেয় পুলিশ। এ সময় শিবির কর্মীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল ও ককটেল নিক্ষেপ করে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শিবির কর্মীরা কয়েকটি গ্রুপে ভাগ হয়ে বসুন্ধরা শপিংমলের সামনে বোমাবাজির সময় পুলিশ রাবার বুলেট ছুঁড়তে থাকে। এ সময় তেজগাঁও ও কলাবাগান থানার সিভিল টিমের পুলিশ সদস্যরা পিস্তল দিয়ে ফাঁকা গুলি করেন। পুলিশের শটগানের গুলির তোপের মুখে টিকতে না পেরে শিবির কর্মীরা ফার্নিচার মার্কেটের বিভিন্ন গলিতে ঢুকে পড়ে। এ সময় শিবিরের মামুনুর রশিদ, শাকুর, সাদ্দাম, ফারাজী মফিজুর রহমান, মোস্তাফিজুর রহমানসহ ১০ জন শিবির কর্মী গুলিবিদ্ধ হন। পরে পুলিশ তাদের গ্রেফতার করে তেজগাঁও থানায় নিয়ে যায়। অন্যদিকে, পুলিশের রাবার বুলেটে ফার্নিচার মার্কেটের স্বপন ফার্নিচারের মালিক আব্দুল রহিম (৪৫), ফার্নিচার দোকানের কর্মচারী মজনু (৪০), ফুটপাতে চায়ের দোকানি খলিল (৪০) গুলিবিদ্ধ হয়। তাদের শমরিতা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। দুপুর ২টার দিকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার কিছু সময় পর পান্থপথের একটি বহুতল ভবনের ওপর থেকে কে বা কারা পুলিশকে লক্ষ্য করে একটি ককটেল ছুঁড়ে মারে। এরপর পুলিশ পান্থপথ মোড়ে শিবির কর্মীকে লক্ষ্য করে রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে ছত্রভঙ্গ করে। বিকাল ৩টার দিকে রাসেল স্কয়ারে কে বা কারা পরপর দুটি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটালে পুলিশ সেখানে কয়েক রাউন্ড রাবার বুলেট ও টিয়ারসেল নিক্ষেপ করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে। প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ জানায়, দুপুর ২টার দিকে মতিঝিলে সিটি সেন্টারের সামনে শিবিরের কর্মীরা মিছিল বের করে। এক পর্যায়ে শিবির কর্মীরা রাস্তায় কয়েকটি গাড়ি ভাংচুর করে। এ সময় পুলিশ তাদের ধাওয়া করলে তারা বিভিন্ন অলিগলিতে ঢুকে পড়ে। এ সময় পুলিশ রাবার বুলেট ও ফাঁকা গুলি ছোঁড়ে। একই সময় নটরডেম কলেজের সামনের সড়কে শিবির কর্মীরা মিছিল বের করে। তারা রাস্তায় পুরাতন কাপড় জড়ো করে আগুন ধরিয়ে দেয়। এ সময় পুলিশ তাদের ধাওয়া করে। নয়াদিগন্তের সামনে গাড়িতে আগুন নয়াদিগন্তের প্রত্যক্ষদর্শী সাংবাদিকরা জানান, দুপুর আড়াইটার দিকে মতিঝিলের আরামবাগে দৈনিক নয়াদিগন্ত অফিসের সামনে কে বা কারা একটি মাইক্রোবাসে আগুন ধরিয়ে দেয়। কারা আগুন ধরিয়েছে সে ব্যাপারে নয়াদিগন্ত পত্রিকা কর্তৃপক্ষ নির্দিষ্ট কাউকে শনাক্ত করেনি। মাইক্রোবাসের আগুন অফিসের নীচতলার ছাপাখানায় রাখা কাগজের রীমে ধরে যায়। প্রায় ৭/৮টি রীম (প্রত্যেকটি আড়াই টন করে) পুড়ে যায়। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। এ ঘটনার পর মতিঝিল থানা পুলিশ ও ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের দুটি টিম নয়াদিগন্ত অফিসে তল্লাশি চালায়। পুলিশের অভিযোগ, মতিঝিলে পুলিশের ওপর হামলাকারী শিবির কর্মীরা নয়াদিগন্ত অফিসে আত্মগোপন করেছে। তবে পুলিশ ঐ অফিস থেকে কাউকে আটক করতে পারেনি। অন্যদিকে, বিকাল ৪টার দিকে জুরাইনে নয়াদিগন্তের ছাপাখানায় কে বা কারা আগুন ধরিয়ে দেয়। আগুনে ছাপাখানার কোন মেশিনের তেমন ক্ষতি হয়নি। নয়াদিগন্ত কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অগ্নিকাণ্ডে ছাপাখানায় রাখা ২০/২৫ রীম কাগজ পুড়ে যায়। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া এন্ড পাবলিক রিলেশন বিভাগের উপ-কমিশনার মাসুদুর রহমান জানান, হামলা, ভাংচুর ও বোমাবাজির ঘটনায় রাজধানীর বিভিন্ন জায়গা থেকে ৭৩ জন শিবির কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। শিবিরের গুলিতে একজন কর্মকর্তাসহ তিন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। তাদের রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।