রাজধানীর পাঁচ স্থানে শিবিরের হামলা
প্রকাশ : ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২২:৫২
রাজধানীর মতিঝিল, যাত্রাবাড়ী, পল্টন, দৈনিক বাংলা ও শ্যামলী এলাকায় বুধবার ভোর থেকেই জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়েছে। কয়েকটি স্থানে শিবির কর্মীরা পুলিশের উপর হামলা ও গুলি চালিয়েছে। সংঘর্ষে দৈনিক বাংলা মোড়ে শিবির কর্মীরা একটি যাত্রীবাহী বাসে আগুন ধরিয়ে দেয়। পুলিশের গুলি ও রাবার বুলেটের সামনে শিবিরও পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি ছোঁড়ে। এতে পুলিশের মতিঝিল বিভাগের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার মেহেদী হাসান গুলিবিদ্ধ হন। এই এলাকায় পুলিশের এলোপাতাড়ি রাবার বুলেট ছোঁড়ায় পথচারীরা গুলিবিদ্ধ হয়েছে। পুলিশের রাবার বুলেটে আবু তাহের (২০), সাইফুল (২৫), আব্দুস সামাদ (২৪), আরিফ ফয়সাল (২২), রিজয়ানুল করিম (২৫) ও মনিরুল ইসলাম (২২) আহত হয়েছেন। মতিঝিল এলাকার ফুটপাতের দোকানী আব্দুল হাফিজ (১৫), ডাব বিক্রেতা নবী হোসেন (২৫), পথচারী জাফর মুন্সী, ননী গোপাল, সৌরভ (২৩), শাফিক আহমেদ ও শ্যামলী পরিবহন বাসের সুপারভাইজার রাজন (২৩) পুলিশের রাবার বুলেটে আহত হয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিত্সাধীন রয়েছেন। সংঘর্ষ চলাকালে পুলিশ এসব এলাকা থেকে প্রায় তিনশ’ জামায়াত-শিবির কর্মীকে গ্রেফতার করেছে। এদের মধ্যে বেশিরভাগই গ্রেফতার হয়েছেন সদরঘাট ও কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে। সকাল থেকে মতিঝিল এলাকার এ সংঘর্ষের খবর এমনই আতংকের সৃষ্টি করে যে অনেকেই ব্যক্তিগত গাড়ি রাস্তায় নামায়নি। ফলে সকাল থেকেই রাজধানীর বেশিরভাগ সড়ক ছিল অনেকটা যানজটমুক্ত।
পুলিশ জানায়, বুধবার সকাল থেকে রাজধানীর বাইরে থেকে শিবির কর্মীরা জড়ো হওয়ার খবর আগেই জানা ছিল। এ তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ, র্যাব ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা ভোর থেকে কমলাপুর রেলস্টেশন, সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল, সায়দাবাদ বাস টার্মিনাল, গাবতলী বাস টার্মিনাল ও মহাখালী বাস টার্মিনালে অবস্থান নেয়। সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে দেশের দক্ষিণাঞ্চল থেকে যে লঞ্চ ভেড়ার পর অভিযান চালিয়ে ৮৩ জন শিবির কর্মীকে গ্রেফতার করে।
প্রত্যক্ষদর্শী পুলিশ জানায়, সকাল সাড়ে ৭টার দিকে মতিঝিল এলাকায় শতাধিক জামায়াত-শিবির কর্মী লাঠি নিয়ে ঝটিকা মিছিল বের করে। তারা শাপলা চত্বরে পৌঁছানোর পর পুলিশ ধাওয়া দিলে তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। এরপর দ্বিতীয় দফা মিছিল শুরু হয় সাড়ে ৮টার দিকে। এ পর্যায়ে শিবির কর্মীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি ছোঁড়ে। শিবির কর্মীরা ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে। এতে পুলিশের মতিঝিল বিভাগের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার মেহেদী হাসান গুলিবিদ্ধ হন। তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পুলিশ এসময় টিয়ার সেল ও রাবার বুলেট ছোঁড়ে। এক পর্যায়ে পুলিশ পিস্তল দিয়ে ফাঁকা গুলি করতে থাকে। এসময় মতিঝিলের অফিস এলাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আতংক ছড়িয়ে পড়ে। এসময় শিল্প ভবনের সামনে শিবির কর্মীরা এক পুলিশ সদস্যের শটগান কেড়ে নিয়ে তাকে মারধর করে। এসময় অন্য পুলিশ সদস্যরা এগিয়ে এসে সেখান থেকে ৬ শিবির কর্মীকে গ্রেফতার করে। পুলিশ তখন রাবার বুলেট ছুঁড়ে শিবির কর্মীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। প্রায় ২০ মিনিট ধরে চলে পুলিশের রাবার বুলেট নিক্ষেপ। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে দিলকুশা, বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম, পল্টন, কাকরাইল এলাকার বিভিন্ন অলিগলি থেকে এক সঙ্গে ঝটিকা মিছিল বের করে জামায়াত-শিবির কর্মীরা। এ সময় তারা রাস্তায় গাড়ি ভাংচুর করে। পুলিশ বাধা দিলে শিবির কর্মীরা ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকে। পুলিশ ধাওয়া দিয়ে এবং ফাঁকা গুলি ছুঁড়ে মিছিলকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। সকাল ১০টার দিকে দৈনিক বাংলা মোড় এলাকায় একটি যাত্রীবাহী বাসে আগুন দেয় শিবির কর্মীরা। পরে ফায়ার সার্ভিস গিয়ে আগুন নিভিয়ে ফেলে। সকাল ১১টার দিকে শ্যামলী ক্রসিংয়ে শিবির ঝটিকা মিছিল বের করে। এসময় পুলিশ বাধা দিলে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। পুলিশ রাবার বুলেট ছুঁড়ে শিবির কর্মীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার আনোয়ার হোসেন বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশকে বেশ কয়েকবার ফাঁকা গুলি ছুঁড়তে হয়েছে। সংঘর্ষের এ খবরে গোটা রাজধানীতে ব্যক্তিগত গাড়ি চলাচল কমে যায়। অনেকেই ভাংচুরের আতংকে রাস্তায় তাদের গাড়ি বের করেননি। ঢাকা মহানগর পুলিশের মিডিয়া এ্যান্ড কমিউনিকেশন শাখার উপ-কমিশনার মাসুদুর রহমান বলেন, রাজধানীতে শিবিরের হামলার সময় প্রায় ৩শ’ শিবির কর্মীকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। এসময় শিবির কর্মীরা একটি বাস জ্বালিয়ে দিয়েছে।
রাজধানীর বাইরে সারাদেশে গতকাল জামায়াত-শিবিরের তত্পরতা বন্ধে পুলিশের ব্যাপক ধর-পাকড় চলে। কোথাও কোথাও পুলিশের সাথে তাদের সংঘর্ষ ঘটে, চোরাগোপ্তা হামলা ও ভাংচুরের ঘটনাও ঘটে।
চট্টগ্রাম অফিস জানায় শিবিরকর্মীরা গতকাল বুধবার নগরীর বিভিন্নস্থানে রাজপথ অবরোধ করার চেষ্টা করলেও পুলিশী বাধায় তা পুরোপুরি সফল হয়নি। সমাবেশ করতে না দেয়া এবং দলীয় নেতৃবৃন্দের মুক্তির দাবিতে নগরীর কর্নেলহাট, বহদ্দারহাট এক কিলোমিটার ও কর্ণফুলী সেতু এলাকায় অবরোধ কর্মসূচি পালন করে। দুপুর ১২টায় অবরোধ শুরুর কিছুক্ষণ পর শিবিরের প্রায় ৩০০ কর্মী পাহাড়তলী থানার কর্নেলহাট এলাকায় ঝটিকা মিছিল বের করে। এসময় তারা কয়েকটি গাড়ি ভাংচুরের পর অগ্নিসংযোগের চেষ্টা করে। ঘটনাস্থলে দুই বস্তা লাঠি ও দুই বোতল পেট্রোল উদ্ধার করা হয়। প্রায় একইসময়ে শিবিরকর্মীরা বাকলিয়া থানার কর্ণফুলী সেতু সংলগ্ন গোলচত্বর এলাকায় টায়ার জ্বালিয়ে রাস্তায় যান চলাচল বন্ধ করার চেষ্টা করে। পুলিশ কর্নেলহাটে ৪ জন এবং বাকলিয়া থেকে ২ শিবির কর্মীকে গ্রেফতার করেছে। মহানগর শিবিরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে পুলিশের বাধা সত্ত্বেও অবরোধ কর্মসূচি সফল হয়েছে এবং পুলিশ শিবিরকর্মীদের ওপর চড়াও হয়ে মারধর করে বলে দাবি করা হয়।
রাজশাহী অফিস জানায়, রাজশাহীতে ওলামা পরিষদের ব্যানারে বিক্ষোভ মিছিল ও নাশকতার চেষ্টার অভিযোগে ছাত্রশিবির সন্দেহে পুলিশ ১১ জনকে আটক করেছে। গতকাল বিকালে মহানগরীর সাহেব বাজার মণিচত্বর ও লোকনাথ স্কুল মার্কেট এলাকা থেকে তাদের আটক করা হয়। বোয়ালিয়া থানার ওসি জিয়াউর রহমান বলেন, বিকাল ৫টার দিকে ৩০/৪০জন শিবিরকর্মী ওলামা পরিষদের ব্যানারে লোকনাথ স্কুল মার্কেট এলাকা থেকে বিক্ষোভ মিছিল ও নাশকতার চেষ্টা করে। ওই এলাকার মেসে ছাত্রশিবির সন্দেহে ১১ জনকে আটক করা হয়। বিকালে মহানগরীর মহিলা কলেজ এলাকায় ঝটিকা মিছিল করে শিবির।
নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, বন্দর উপজেলায় মঙ্গলবার রাত থেকে বুধবার পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকা থেকে জামায়াত ও শিবির সন্দেহে ৪০ জনকে আটক করেছে পুলিশ। পুলিশ বলেছে আটককৃতদের অনেকেই যানবাহনে চড়ে ঢাকায় যাচ্ছিল। পথে বিভিন্নস্থানে অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করা হয়েছে। আটককৃতদের মধ্যে বন্দর থানায় রয়েছে ১৫ জন। আর কামতল পুলিশ ফাঁড়ি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কসহ বিভিন্নস্থানে ২৫ জনকে আটক করে।
বরিশাল অফিস জানায়, গতকাল নগরীতে জামায়াত-শিবির কর্মীরা মিছিল বের করলে ৯ জন কর্মীকে গ্রেফতার করে পুলিশ। গতকাল দুপুর ২টার দিকে নগরীর পোর্টরোড জামে মসজিদ এলাকায় ‘সর্বস্তরের তৌহিদী জনতা ও জনতার মঞ্চ ব্যানারে মিছিল বের করে জামায়াত -শিবির কর্মীরা। মিছিল হেমায়েত উদ্দিন ঈদগাহ ময়দান এলাকায় আসলে যুবলীগ-ছাত্রলীগ কর্মীরা ধাওয়া করে এবং ৯জন কর্মীকে গ্রেফতার করে।
মিঠাপুকুর (রংপুর) সংবাদদাতা জানান, মিঠাপুকুরে ঢাকা-রংপুর মহাসড়ক অবরোধ করে সমাবেশ করার সময় জামায়াত-শিবিরের সাথে পুলিশের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়েছে। পুলিশ ১৫ রাউন্ড টিআর সেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। অন্তত ২০ জন আহত হয়েছে। ঘটনাস্থলে ১২জন জামায়াত- শিবির কর্মীকে আটক করেছে।
মাগুরা প্রতিনিধি জানান, দেড়শতাধিক জামায়াত-শিবির নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে সদর থানায় মামলা। পুলিশ ১১ জন নেতা-কর্মীকে গ্রেফতার করেছে। মঙ্গলবার রাতে সদর থানার এসআই আব্দুল মাজেদ বাদী হয়ে জামায়াত-শিবিরের ১৮ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত ১৫০ জন জামায়াত-শিবির নেতা-কর্মীর নামে এই মামলা দায়ের করেন।
কলারোয়া (সাতক্ষীরা) সংবাদদাতা জানান, গতকাল বুধবার ভোরে কলারোয়া পুলিশ জামায়াত-শিবিরের ১০জন নেতা-কর্মীকে আটক করেছে।
কয়রা (খুলনা) সংবাদদাতা জানান, খুলনার কয়রা উপজেলায় জামায়াত-শিবির নেতা-কর্মীদের গ্রেফতার অব্যাহত রয়েছে। রাতভর সাঁড়াশি অভিযানে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে দুইদিনে ৫১ জনকে আটক করেছে পুলিশ। বেশিরভাগ জামায়াত-শিবিরের কর্মী বলে জানা গেছে।
মিরসরাই (চট্টগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মিরসরাইয়ে দুটি কাভার্ডভ্যান ভাংচুর করেছে শিবির নেতা-কর্মীরা। বুধবার দুপুরে মহাসড়কের ধুমঘাট ব্রিজ এলাকায় এই হামলার ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দুপুর ১২টার দিকে শিবিরের ঝটিকা মিছিল ধুমঘাট ব্রিজের দক্ষিণ পাশে এসে জড়ো হয়। বিক্ষুব্ধরা মহাসড়কে দুটি কাভার্ডভ্যান ভাংচুর করে। একটি কাভার্ডভ্যানের টায়ার কেটে দিলে মহাসড়কে যানজটের সৃষ্টি হয়।
রংপুর প্রতিনিধি জানান, রংপুরে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষে জামায়াত-শিবিরের ১৫ কর্মী আহত হয়েছে। মিঠাপুকুরে ১৩ জন ও রংপুরে ১২ জামায়াত-শিবির ক্যাডারকে গ্রেফতার করে। পুলিশ সুপার জানান, জামায়াত-শিবির কর্মীরা নগরীর বাইরে বৈরাগীগঞ্জ এলাকায় রাস্তায় টায়ার জ্বালিয়ে ও মহাসড়কে গাছের গুঁড়ি ফেলে অবরোধের চেষ্টা চালায়। পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ঘটে। পুলিশ টিয়ারশেল ও ১২ রাউন্ড রাবার বুলেট ছোঁড়ে। মিঠাপুকুর উপজেলার রংপুর-ঢাকা মহাসড়কের বৈরাগীগঞ্জে মহাসড়ক অবরোধ করে। এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। অতিরিক্ত পুলিশ গিয়ে প্রায় ২৫ রাউন্ড টিয়ারশেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
দাউদকান্দি সংবাদদাতা জানান, ঢাকা যাওয়ার পথে বুধবার ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে দাউদকান্দি টোলপ্লাজায় পুলিশ জামায়াত-শিবিরের ৩৫ জন নেতাকর্মীকে আটক করেছে।
গৌরীপুর (ময়মনসিংহ) সংবাদদাতা জানান, গৌরীপুরের রামগোপালপুর ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য জামায়াত সন্দেহে মো. রহিমউদ্দিনকে মঙ্গলবার রাতে নিজ বাড়ি থেকে পুলিশ আটক করেছে। জামায়াতের আমীর মাওলানা আবু বক্কর সিদ্দিক জানান, আটক ইউপি সদস্য রহিমউদ্দিন তাদের সংগঠনের কেউ নন।
সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, সীতাকুণ্ডে জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা গতকাল ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বারবকুণ্ড এলাকায় চোরাগুপ্তা হামলা চালিয়ে ১৫টি গাড়ি ভাংচুর করেছে। ঝটিকা মিছিল করে রাস্তায় গাছ ফেলে টায়ার জ্বালিয়ে যান চলাচল বন্ধ করে দেয়। দুপুর ১২ থেকে শুরু তাণ্ডব প্রায় দেড় ঘন্টা স্থায়ী হয়। দূরপাল্লার যানবাহনের যাত্রীসাধারণ চরম আতঙ্কের মধ্যে পড়েন। দেড়টার দিকে পুলিশ আসলে কর্মীরা গা-ঢাকা দেয়।